আজকের কৃষ্ণনগরের সঙ্গে দশ বছর আগে প্রথমবার দুর্গা পুজোর সময়ে আসা কৃষ্ণনগর অনেকটাই  আলাদা। 

দশটা বছর পর দ্বিতীয় বারের জন্য এই শহরে পা দিতেই চোখে পড়ল রাস্তা জুড়ে বিদ্যুৎ-চালিত যানের (পড়ুন টোটোর) দাপট। সে সময়ে তো এ সব কিছুই ছিল না। সে বার এসেছিলাম গবেষণার জন্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে জানতে, তাঁর সম্বন্ধে নানান তথ্যের খোঁজে। আর এ বারের আসাটা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে একটা বই লেখার জন্য। এত বছরের গবেষণায় জানা সমস্ত তথ্যগুলো বর্তমান সময়ের সঙ্গে পরিমার্জিত করতে। এ ছাড়াও গোপাল ভাঁড়ের সম্বন্ধে আরও বেশি করে অনুসন্ধান, রানি ভবানী, প্রতাপাদিত্য আর কৃষ্ণচন্দ্রের পারস্পরিক সম্পর্ক, ১৯৫৩ সালে নির্মিত সুধীরবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রাজা কৃষ্ণচন্দ্র’ চলচ্চিত্র আর কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় কবি কাশীনাথ চক্রবর্তী র বাংলা হরফে  সংস্কৃত ভাষায় লেখা ‘তারা ভক্তি তরঙ্গিনী’ পুঁথিটার যদি কোনও কপি পাওয়া যায়, সেটার খোঁজেও এ বারের আসা। এর আগে বাংলাদেশের ঢাকা থেকে এই পুঁথির একটা কপির সন্ধান পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা এতটাই জরাজীর্ণ আর পোকায় কাটা অবস্থায় ছিল যে পড়তে পারিনি। তবে এখনও পর্যন্ত এখানে পুঁথিটা খুঁজে পাইনি। 

ভারত থেকে এত দূরে আমেরিকায় বসে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতি আমার এত আগ্রহ জন্মাবে আর তাঁর ঐতিহাসিক আর সামাজিক অবস্থান আমার গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবে তা প্রথম জীবনে ভাবিওনি। ১৯৭৮ সালে আমেরিকার টেক্সাসে জন্ম। বাবা, মা ছিলেন প্রোটেস্টান ধর্মযাজক। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য এক জায়গায় পড়াশোনা হয়নি আমার। দশম শ্রেণি পাস করি মিসিসিপি-তে, তার পর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি টেনেসি-তে। এর পর লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’বছরের জন্য মিউজিক নিয়ে পড়া শুরু করি। 

এই সময়ে একটা রক গানের দল তৈরি করে কয়েক জন বন্ধু মিলে পড়ার পাঠ চুকিয়ে নানা জায়গায় গান গাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই বুঝতে পারি গান গেয়ে পেট চালানো যাবে না। অগত্যা আবার পড়াশোনা শুরু করলাম গান ছেড়ে। এ বার জর্জাস্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ধর্ম (religion) বিষয়ে ২০০৩ সালে স্নাতক হয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় আর তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম নিয়ে স্নাতকোত্তর পঠনপাঠন শুরু করি। তখনও কৃষ্ণচন্দ্র আমার কোনও ভাবনাতেই ছিলেন না। প্রথম মাস্টার ডিগ্রি করার সময় চর্যাপদের কিছু কিছু সংস্কৃত অনুবাদ আর টিকা পড়তে গিয়ে মনে হল আসল চর্যাপদ পড়তে গেলে আমায় বাংলা ভাষাটাও জানতে হবে। শুরু করলাম বাংলা  শেখা। এর মধ্যে দেখি নরওয়ে-র এক গবেষক চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাই চর্যাপদ নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ হারাই। চর্যাপদের বিভিন্ন জায়গায় নাথপন্থীদের কথা লেখা আছে। এই নাথরা বৌদ্ধ, না শৈব বুঝতে পারছিলাম না। সেটা বুঝতে ২০০৫ সালে প্রথম ভারতে আসি পুনের মার্কিন ইউনিভার্সিটি অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিসে তিন মাসের জন্য সংস্কৃত পড়তে। তার পর ‘গোরক্ষবিজয়’, ‘মঙ্গলকাব্য’ পড়তে গিয়ে এর প্রেমে পড়ে যাই। 

বাংলা ভালো না জানায় পড়তে বেশ কষ্ট হত প্রথম প্রথম। ‘মঙ্গলকাব্য’ পড়তে গিয়ে মনে হল শ্রেষ্ঠ ‘মঙ্গলকাব্য’ ভারতচন্দ্রের লেখা ‘অন্নদামঙ্গল’ পড়তে হবে। সেটা পড়তে গিয়েই কৃষ্ণচন্দ্রের কথা পাই। আমার গাইডের শাক্ত পদাবলী নিয়ে লেখা বই (Mother of my heart, Daughter of my dreams : Kali and Uma in the devotional poetry of bengal), রামপ্রসাদ সম্পর্কে পড়তে গিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন সে ভাবে তাঁর প্রতি আকর্ষণ জন্মায়নি। ২০০৫ সালে প্রথম মাস্টার ডিগ্রি শেষ করার পর ‘অন্নদামঙ্গল’এ পড়া কৃষ্ণচন্দ্রের সম্বন্ধে মনে প্রশ্ন জাগে, কে ইনি যাঁর কথা বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি সব জায়গায় পাচ্ছি? 

তখন মনে হল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা করব। ২০০৭ সালে কলকাতায় আসি তিন মাসের জন্য বাংলা পড়তে। দ্বিতীয় মাস্টার ডিগ্রি শেষ করে ২০০৮ সালে কলকাতায় এসে এক বছর বাংলা শিখি। ২০০৯ সালে শুরু হল আসল গবেষণা। আস্তে আস্তে বুঝতে পারি, প্রমাণিত ইতিহাসে খুব বেশি কৃষ্ণচন্দ্রের কথা নেই। তখন ঐতিহাসিক দিকের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্রের সামাজিক দিক নিয়েও গবেষণার কাজ শুরু করি। এই সময়েই প্রথম দুর্গাপুজোয় কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে আসি। এর পর কৃষ্ণনগরের আশেপাশে কৃষ্ণচন্দ্রের স্মৃতিজড়িত সব জায়গায় যাই। যেমন, দিগনগর, আমঘাটা, শিবনিবাস। নদিয়ারাজদের আত্মীয় রায়বাড়ির অন্নপূর্ণা পুজোও সে বার দেখেছি।  জগদ্ধাত্রী পুজো, নবদ্বীপের রাস, বারোদোলও সে সময়ে দেখা। ২০১৫ সালে গবেষণাপত্রের কাজ শেষ করে পিএইচডি পাওয়ার পর নিউইয়র্কের কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রিলিজিয়ান বিষয়ে অধ্যাপনার কাজ করি। এর পর স্টোনিব্রোকের স্টেট ইউনিভার্সিটি গবেষক হিসাবে নিযুক্ত হই। 

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে লেখা বইটার জন্য কিছু খোঁজখবর নিতেই আমার এ বারের ভারতে আসা। এত দিন ধরে কৃষ্ণচন্দ্র নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বুঝেছি, তিনি হলেন একটা প্রতীক। আমার মনে হয়, অষ্টাদশ শতকের শেষ আর উনিশ শতকের প্রথম দিকে কৃষ্ণচন্দ্রের সম্বন্ধে বেশির ভাগ মানুষ ভাবতেন নবাবি আমলের পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রই লক্ষণ সেনের সময়ের মতো সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। তিনি সংস্কৃতচর্চার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন। পণ্ডিতদের জমি দান করেছিলেন। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যায় লাগাম দিতে তিনি শাক্ত পুজোর উপরে জোর দিয়েছিলেন। তাই সেই সময়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বল্লাল সেনের সমাজ-সংস্কৃতির প্রতীক ভাবা হত। 

উনিশ শতকের মাঝের দিকে যখন ভাষার পরিবর্তন হচ্ছে, বিধবা বিবাহের মতো সামাজিক সংস্কার তৈরি হচ্ছে, সে সময়ে কৃষ্ণচন্দ্রকে মনে করা হত মধ্যযুগীয় হিন্দু জমিদারদের প্রতীক। যিনি কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, আদিরসাত্বক কাব্যকে উৎসাহ দিয়েছেন। এর পর উনিশ শতকের শেষ ভাগে কৃষ্ণচন্দ্র-ভাবনা মোটামুটি সাহিত্য, রাজনীতি, আর ধর্মীয়— তিনটি ভাবনায় ভেঙে গেল। সেই ভাবনা এখনও চলছে। 

তা হলেও নদিয়াবাসীর কাছে আজও রাজপরিবারের প্রতীক হয়েই আছেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। আর তিনি এতটাই প্রতীক যে, অনেক মন্দির বা পুজো যা কৃষ্ণচন্দ্রের আগে বা পরের কোনও নদিয়ারাজের প্রতিষ্ঠিত, তা এলাকার সবাই কৃষ্ণচন্দ্রের তৈরি বলেই জানেন বা বলে থাকেন। 

এই বছর মাত্র তিন মাসের জন্য এসেছি। জানার অনেক কিছুই বাকি থেকে গেল। আগামীতে আবার হয়তো ফিরে আসতে হবে এই বাকি থাকা প্রশ্নগুলির খোঁজেই।

(সঙ্গের ছবি: কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে গবেষক জোয়েল)

ভিজিটিং স্কলার, ম্যাটো স্টেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজ়, স্টোনিব্রোক ইউনিভার্সিটি