মানুষের ইতিহাসে ইহাই গভীরতম সঙ্কট। আমাদের শিশুরা যখন প্রশ্ন করিবে, ‘সময় থাকিতে তোমরা এই সঙ্কট নিবারণের জন্য কিছু করো নাই কেন’, তখন আমরা তাহাদের কী উত্তর দিব?— গত রবিবার নিউ ইয়র্ক শহরের রাজপথে চিৎকার করিয়া এই কথাগুলি বলিতেছিলেন এক নারী। তাঁহার হাতে পুলিশের হাতকড়া। তিনি একা নহেন, একটি সংবাদপত্রের অফিসের সম্মুখে আইন ভাঙিয়া প্রতিবাদী জমায়েত করিবার দায়ে গ্রেফতার হইয়াছিলেন অনেকেই। আইন আইনের পথে চলিবে, পুলিশ পুলিশের কাজ করিবে, স্বাভাবিক। তবে কিনা, পৃথিবী না বাঁচিলে কিসের আইন, কিসেরই বা পুলিশ? ওই প্রতিবাদীরা পৃথিবীকে বাঁচাইবার তাগিদে সমবেত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের অভিযোগ: বিশ্ব পরিবেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জনসমক্ষে তুলিয়া ধরিতে এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অন্যান্য ক্ষমতাবানের উপর চাপ সৃষ্টি করিতে সংবাদমাধ্যম যথেষ্ট তৎপর নহে, তাহাদের আরও অনেক বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত, এবং অবিলম্বে। বিক্ষোভটি প্রতীকী। এক বিপুল এবং বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের প্রতীক। পরিবেশ দূষণের মাত্রা এবং তাহার পরিণামে বিশ্বপ্রকৃতির বিপন্নতা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাইয়াছে। উত্তর মেরুর দ্রুত ক্ষীয়মাণ হিমশৈল হইতে দেশে দেশে ‘চরম আবহাওয়া’র প্রাবল্য, এই গ্রীষ্মে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অগ্নিপ্রবাহ হইতে ইউরোপের বহু দেশে অকল্পনীয় উত্তাপ— বিপদের মোকাবিলায় সমবেত উদ্যমে ঝাঁপাইয়া না পড়িলে সর্ব-নাশ সমাগত। এই কারণেই প্রতিবাদীদের ক্ষুব্ধ বিস্ময়: যে সঙ্কট কার্যত মানবজাতির জীবনমরণের প্রশ্ন, সংবাদমাধ্যম তাহাকেই অবহেলা করিতেছে?

প্রশ্নটি অযৌক্তিক নহে। কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশ তথা জীবনসঙ্কটের প্রতি এই অবহেলার জন্য একা সংবাদমাধ্যমকে দোষ দিয়া লাভ নাই। রাষ্ট্রের শাসক, অর্থনীতির চালক, রাজনীতির নায়ক, সমাজের নাগরিক, সকলেই এই অপরাধে অপরাধী। সংবাদমাধ্যমে পরিবেশের সমস্যা ও তাহার প্রতিকারের দাবি যথেষ্ট স্থান পায় না, এ কথা সত্য। কিন্তু ইহাও কম সত্য নহে যে, সেই ঘাটতি সম্পর্কে সংবাদের উপভোক্তাদের অধিকাংশের কিছুমাত্র মাথাব্যথা নাই। সমাজ উদাসীন বলিয়াই নির্বাচনী মরসুমে গগনভেদী অনন্ত বক্তৃতায় স্লোগানে তর্কবিতর্কে পরিবেশ সম্পর্কে অতলান্ত নৈঃশব্দ্য।

আপন বাসগ্রহের স্বাস্থ্যের প্রতি গ্রহবাসী মানুষের সমবেত ঔদাসীন্য তাহাদের এক সামূহিক বিলয়ের পথে লইয়া চলিয়াছে। এই ঔদাসীন্যের পিছনে একটি কারণ অবশ্যই নীতিভ্রষ্ট বাজারসর্বস্ব অর্থনীতি। নদী, পর্বত, অরণ্য, মৃত্তিকা— সকলই সেই বাজারের দৃষ্টিতে আয়বৃদ্ধির উপকরণ, তাহাদের অন্য কোনও মূল্য মাপিবার কোনও উপায়ই বাজারের হাতে নাই। রাষ্ট্রও বহুলাংশে বাজারের চালকদের বশীভূত, সুতরাং পরিবেশের স্বার্থে প্রকৃতির ক্ষয় ও দূষণ রোধ করিতে রাষ্ট্রের চালকরা প্রায়শই অনিচ্ছুক বা অপারগ।

কিন্তু ইহার পিছনে রহিয়াছে আরও এক নির্মম সত্য। মানুষের চিন্তা ও বিবেচনার সীমাবদ্ধতার সত্য। মানুষ স্বভাবত অ-দূরদর্শী। আজ পরিবেশ বিনষ্ট হইলে কাল কী বিপদ হইবে, সেই চিন্তা তাহাকে কিছুতেই যথেষ্ট চিন্তিত করিতে পারে না। আপন সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তাহার ভাবনা বাঁধা গতের বাহিরে যাইতে অপারগ। সন্তান পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাইয়া ভাল কেরিয়ার গড়িতে পারিবে কি না তাহা লইয়া অভিভাবকের চিন্তার শেষ নাই, কিন্তু সন্তান যখন বড় হইবে, তখন পৃথিবী তাহার বাঁচিবার উপযোগী থাকিবে কি না, সেই অবধি ভাবিবার সামর্থ্য মানুষের নাই। পরিবেশের বিপদঘণ্টা আর্তনাদ করিতে থাকিলেও তাহার মন তাই বধির থাকে। হয়তো ভাবে— ভবিষ্যৎ আমাদের অগম্য, সুতরাং তাহা লইয়া অধিক ভাবিয়া কাজ নাই। অতএব পরিবেশ সংহার করিয়া সমৃদ্ধির শবসাধনা চলিতে থাকে। লক্ষণীয়, নিউ ইয়র্কের ওই প্রতিবাদীরা ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’ (বিলয় বিদ্রোহ) আন্দোলনের যোদ্ধা। গত বছর ব্রিটেনে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের বক্তব্য: পৃথিবী বিলয়ের পথে চলিতেছে, এই সর্বনাশ রোধ করিতে হইবে। ইহাও লক্ষণীয় যে, দেশে দেশে শিশু, কিশোর, তরুণরাই এই আন্দোলনে অগ্রণী, সুইডেনের পরিবেশ-নায়িকা গ্রেটা থানবার্গ তাহাদের বড় অনুপ্রেরণা। ছোটরা যদি আপন ভবিষ্যতের তাগিদে বড়দের অমার্জনীয় ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে সমবেত ও সক্রিয় হয়, হয়তো তাহারা এখনও পৃথিবীকে বাঁচাইতে পারে। তাহাদের আপন পৃথিবীকে।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।