Advertisement
E-Paper

সন্তানস্নেহে প্রতিটি ভক্তকে আপন করে নিতেন

জ য়রামবাটির মা সারদার ব্যবহৃত রান্নাঘরের টুকিটাকি আসবাবপত্র দেখে সাধারণ মানুষের ব্যস্ততা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছিল সম্প্রতি। শিশু থেকে বৃদ্ধ এক পর্যটক দলের সবার সে কী আবেগ।

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:৪৭

জ য়রামবাটির মা সারদার ব্যবহৃত রান্নাঘরের টুকিটাকি আসবাবপত্র দেখে সাধারণ মানুষের ব্যস্ততা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছিল সম্প্রতি। শিশু থেকে বৃদ্ধ এক পর্যটক দলের সবার সে কী আবেগ।

‘এই ঘরটিতে মা রান্না করতেন,’ ‘ওই পাত্রগুলিতে তাঁর স্পর্শ রয়েছে...’, এ সব নানা অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল দর্শনার্থীদের মধ্যে। তাঁর প্রয়াণের এত বছর পরেও তাঁকে ঘিরে এমন বাঁধনছাড়া উচ্ছ্বাস বুঝিয়ে দিল, যত দিন যাচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর প্রভাব যেন আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত যে কোনও শাখাতে মায়ের জন্মতিথির পবিত্র দিনটিতে গেলে বোঝা যাবে সত্যিই তিনি ‘সত্যিকারের মা, গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়— সত্য জননী।’

তাঁর কী এমন শক্তি ছিল, যার জন্য তাঁর এই প্রভাব প্রতিপত্তি? এর উত্তর একটাই: অপার মাতৃস্নেহ। এ এক শাশ্বত মাতৃপ্রেম। তিনি সকলেরই মা। এক বার জয়রামবাটিতে দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার্তদের গরম খিচুড়ি বিতরণ করার সময় (তখন মা সারদার অল্প বয়স) তাঁর মধ্যে প্রকৃত জনসেবা করার রূপটি ফুটে উঠেছিল। ওই গরিব মানুষদের পাশে বসে হাতপাখায় তাদের বাতাস করে দিয়েছেন। ওই মানুষগুলো তখন মায়ের পরম স্নেহ পেয়ে আনন্দে মত্ত হয়ে উঠেছিল। অভাব, জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলে সকলেই একাত্ম হয়েছিল সে দিন। আর মা সারদার এমন আচরণের নজির নানা উপলক্ষে রয়েছে একাধিক।

আমরা মায়ের এক ভক্ত আমজাদের কথা স্মরণ করতে পারি। নিজের হাতে তাকে খেতে দিয়েছিলেন, এমনকী খাওয়া শেষে এঁটো থালা পরিষ্কার করতেও তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। আমজাদের পরিচয় সম্পর্কে মাকে মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শরৎ যেমন ছেলে, ওই আমজাদও তেমন ছেলে’। শরৎ, অর্থাৎ পরবর্তী কালে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ। এই সামান্য ঘটনাটির তাৎপর্য মোটেও সাধারণ নয়। আজকের এই জটিল আর্থ-সামাজিক দুনিয়ায়, যেখানে অসহিষ্ণুতার একটা বিষময় বাতাবরণ, সেখানে মা সারদার এই সহজ অভিব্যক্তিটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। আজও আমরা সর্বস্তরে জাতপাতের সীমানা লঙ্ঘন করতে পারছি না। আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন, এই শাশ্বত বোধ আমাদের সবার মধ্যে আসছে না। অথচ কত বছর আগে প্রকৃত সমাজসেবী হিসেবে শ্রীশ্রীমা এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, ‘আমরা ওরা’র বন্ধন।

মায়ের অপার মাতৃস্নেহে কত জন কত ভাবে ধন্য হয়েছিলেন তার অজস্র ঘটনা ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা স্মরণ করতে পারি বিপথগামী সেই ভয়ঙ্কর ডাকাতের কথা। অন্ধকার বিপদসঙ্কুল পথে মা হেঁটে চলেছেন হঠাৎ সেই ডাকাত তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘কে তুমি’? প্রচণ্ড সাহসিনী মা সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘আমি তোমার মেয়ে সারদা’। এর পরের কাহিনি সবার জানা। এ রকম শুধু একজন বা দু’জন ডাকাত বা বিপথগামী মানুষ নয়, আরও কত শত মানুষকে তিনি জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন। এ কারণেই তিনি বিশ্বজননী।

শ্রীশ্রীমায়ের মধ্যে যে নম্রতার পরিচয় আমরা জেনেছি সেটাও কম নয়। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে ঘোষণা করতে হয়নি, তাঁর আচার-আচরণেই সেটা ফুটে উঠেছে বার বার। তিনি তাঁর সহজ সরল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, এক কথায় সবার কাছেই হয়ে উঠেছেন একান্ত আপনজন। সকলের উদ্দেশেই তিনি বলতেন, ‘পরের দোষ দেখো না, দোষ দেখবে নিজের’। সমাজের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলের জন্য মায়ের এই শাশ্বত কথাটি বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের কথা, এখানেও আমরা ঠিক উল্টো পথে হাঁটছি। কারণে অকারণে আমরা কমবেশি সকলেই নিজের দোষ ভাবার চেয়ে অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই বেশি। আজকের দিনে দেশে, সমাজে এবং নিজের নিজের পরিবারে প্রতিনিয়ত যে সব সঙ্কট দেখা দিচ্ছে, সেখানে ওই প্রবণতা বিশেষ কার্যকর হচ্ছে। এর ফলে পরিবারের সমাজের সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক অস্থিরতা বাড়ছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাসঙ্গিনী হিসাবে সারদা দেবীর বিশেষ পরিচয় আমরা কমবেশি সকলেই জানি। ঠাকুর বলেছেন, তাঁর সাধনপথে যথাযথ সহযোগিতা করেছেন মা সারদা। সংসারের মধ্যে তাঁকে (রামকৃষ্ণদেবকে) আবদ্ধ করে রাখতে তিনি আসেননি, বরং ‘যত মত তত পথ’-এর প্রবক্তা ঠাকুরকে সাধনভজনের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মা সারদা ছিলেন সদা নিবেদিতপ্রাণ। ভক্তদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, ‘আমি আর কী উপদেশ দেব। ঠাকুরের কথা সব বইয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। তাঁর একটা কথা ধারণা করে যদি চলতে পার, তো সব হয়ে যাবে।’

কিন্তু ঠাকুরের প্রতি তাঁর অসীম শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ভালবাসা থাকলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে, অবশ্যই বৃহত্তর স্বার্থে, মা প্রতিবাদও করেছেন। ঠাকুরকে রাতের বেলায় খাবার মা সারদা নিজের হাতেই দিতেন। এক দিন জনৈক স্বভাবচরিত্রে দুষ্ট মহিলা ঠাকুরের পবিত্র সংস্পর্শে আসার বাসনায় মাকে বললেন, ‘মা, দিন, আজ আমি ঠাকুরকে খাবার থালাটা পৌঁছে দিয়ে আসি।’ মা সারদা সবই জানতেন তবু সেই মহিলার হাতেই হাসিমুখে ঠাকুরের খাবার থালাটা তুলে দিলেন। এই ঘটনায় ঠাকুর সামান্য অসন্তুষ্ট হন। পরে তিনি মাকে বলেন, ‘জান, ওই মেয়েটার স্বভাব চরিত্রে দোষ আছে। ওর হাতে আমাকে খেতে দিলে?’ এ কথা শুনে মা সারদা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘তোমার খাবার আমি নিজেই নিয়ে আসব, কিন্তু আমায় মা বলে চাইলে আমি থাকতে পারব না।’

এমনই ছিলেন মা। ভক্তের ডাকে কখনওই সাড়া না দিয়ে থাকেননি। সন্তানস্নেহে ভক্তদের আপন করে নিতেন। প্রতিটি মানুষকে নিজের মধ্যে দেবতাজ্ঞানে গ্রহণ করতেন। সাড়া দিয়েছেন সবার ডাকে, এমনকী পশুপাখিদেরও সন্তানস্নেহে আপ্লুত করেছেন। সারদার কৃপালাভের জন্য মানুষ যখন ব্যাকুল, তাঁকে দেবী ভাবে পুজো দিতে আকুল, তিনি তখনও আর পাঁচ জন সাধারণের মতো নিজেকে ভাবতেন। সব সময় নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। যেন অতি সাধারণ এক পল্লিবালা। এক বার এক সহজ সরল ভক্ত নিজেকে সংযত করে রাখতে না পেরে মাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, মা, আপনি কি সাক্ষাৎ মা কালী? একেবারে চমকে উঠলেন মা। এটা ওটা নানা কথা বলে প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলেন। ও দিকে ভক্ত নাছোড়। অনেকের মুখে এ প্রসঙ্গটি তিনি শুনেছেন, তাই এ বার সরাসরি মাকে বলেই জানতে চান তার সত্যাসত্য। মা শেষ পর্যন্ত ধরা দিলেন। তবে সেখানেও নিজেকে একটু রহস্যে ঢাকলেন। ভক্তের ডাকে, সন্তানের প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিরুত্তর থাকবেন, তা কী হয়? অবশেষে বললেন, ‘ওই, লোকে বলে কালী’! এ কথা বলেই দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলেন।

আমার শ্রদ্ধেয় পিতামহ, যিনি আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, তিনি মা সারদার কাছে মন্ত্রদীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকেও আমি মা সারদার অপার বিস্ময়ভরা মাতৃপ্রেমের অনেক ঘটনা শুনেছিলাম। তিনি কথা প্রসঙ্গে আমায় এক দিন বললেন, ‘অনেকটা পথ অতিক্রম করে আমরা যখন জয়রামবাটি আসতাম, মা প্রথমেই আমাদের কুশল সংবাদ নিতেন। এর পর নিজের হাতে ফল ছাড়িয়ে আমাদের খেতে দিতেন।’ আমার ওই পিতামহ আরও বলেছিলেন, ‘পুজো, ধ্যান, গুরুমন্ত্র জপ, এ সব প্রসঙ্গ পরে তুলতেন। আগে একেবারে সাধারণ মা যে ভাবে সন্তানের খোঁজ নেয় সে ভাবে, বরং আরও সহজ ভাবে আমাদের সবার সঙ্গে মিশতেন। আমরাও তখন তাঁর ওই অপার মাতৃপ্রেমে বিভোর হয়ে যেতাম। তখন মনে হত— আমরা তাঁর শুধু মন্ত্রশিষ্যই নয়, তাঁর আপন সন্তান। সত্যিই তিনি মা।’

Holy Mother, Sri Sarada Devi
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy