জঙ্গলমহলে ত্রাসের অন্য নাম হাতি। গোটা দক্ষিণবঙ্গেরই সমস্যা। এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? একটু পিছনে ফেরা যাক। ১৯৮৬ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ ভারতীয় হাতিকে (এলিফাস মাঙ্কিমাগ ইনডিবাস) ‘এনডেঞ্জার স্পিসিস’ ঘোষণা করে। কারণ হাতির সংখ্যা তখন প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে অনেক পর্যালোচনার পরে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার নিয়ে  আসে ‘প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট’। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে শুরু হয় হাতি সংরক্ষণ ও তার মানোন্নয়ন। ২৩ কোটি টাকা দিয়ে শুরু করে দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ কোটিতে। 

‘প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট’ এর লক্ষ্য কী— ১। হাতির প্রাথমিক বাসস্থান এবং তাদের স্বাভাবিক হাঁটাচলার পথ ও অঞ্চলকে সুনির্দিষ্ট করা এবং সংরক্ষণ ২। হাতির বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধি ৩। মানুষ ও হাতির সংঘাত কমিয়ে আনা ৪। চোরাশিকারি ও অন্যান্য দুর্ঘটনাজনিত (ট্রেনের ধাক্কা) মৃত্যু প্রতিরোধ করা ৫। হাতির পরিচর্যা ও সংরক্ষণে গবেষণা ৬। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। ৭। হাতির বাসভূমির জৈবিক উন্নতিসাধন ৮। আধুনিক প্রাণী চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া ৯। পর্যাপ্ত দাঁতাল হাতি সংরক্ষণ করা। 

পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালের ২৪ অক্টোবর রাজ্যপালের তরফে বন বিভাগের যুগ্ম সচিব একটি আদেশনামা প্রকাশ করেন। ঘোষণা করা হয়, দক্ষিণবঙ্গে প্রাথমিক ভাবে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও অবিভক্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের অংশ বিশেষ নিয়ে মোট ৪১৪ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ময়ূরঝর্নায় তৈরি হবে ‘এলিফ্যান্ট রিজার্ভ’। সীমানা নির্ধারিত হয় পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড় ও শালবনি ব্লক, ঝাড়খণ্ডের দলমা হাতি সংরক্ষণ কেন্দ্র, পুরুলিয়ার মানবাজার, বাঁকুড়ার সিমলিপাল তালডাংরা ও খাতড়া ব্লক এবং ঝাড়গ্রামের বিনপুর ব্লক, বাঁকুড়ার রাইপুর ব্লক। বর্ধিত এলাকা হিসেবে ১৪৩৬ বর্গ কিলোমিটার যুক্ত হয়। ময়ূরঝর্না এলিফ্যান্ট রিজার্ভ গঠনের মূল কারণ বলা হয়, সামাজিক পরিকাঠামো উন্নয়ন। যাতে স্থায়ী বসবাসকারী এবং পরিযায়ী হাতির দলকে ভাল ভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সেই সঙ্গে মানুষ-হাতি সংঘাত কমানো যায়। এই সংঘাতে হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল নষ্ট, বাড়িঘর ভাঙা, শয়ে শয়ে মানুষের আহত হওয়া এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যু। কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের সর্বেশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০১৫-১৮ সালের মধ্যে দেশে ১৭১৩ জনের মৃত্যু হয় হাতি-মানুষের সংঘাতে। সবচেয়ে বেশি মারা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে, ৩০৭ জন। ওড়িশায় ৩০৫ জন। 

বছর বছর বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সংঘাতের অন্যতম কারণ, হাতিরা বাসভূমি হারাচ্ছে উন্নয়ন ও মানুষের বসতির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল, হাতি মানুষের বসতিতে এসে যত না হানা দিয়েছে তার থেকেও বেশি মানুষ হাতির বাসভূমিতে ঢুকে গিয়েছে। নতুন বসতি বা চাষযোগ্য জমির জন্য। দক্ষিণবঙ্গে এখন ভয়ানক ছবি। ২০১৫ সালেই বাঁকুড়ায় নষ্ট হয় ১৫৯৮ হেক্টর জমির ফসল। ভাঙা পড়ে ১৬৭৭টি বাড়ি। মেদিনীপুরে নষ্ট হয় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতিপূরণ বাবদ খরচ হয় এক কোটি ২১ লক্ষ টাকা। দক্ষিণবঙ্গে ওই বছরে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের পরিসংখ্যানে রাজ্যে হাতির সংখ্যা ৭৫১ জন। এর মধ্যে দক্ষিণবঙ্গে ১২২টি। রাজ্যে প্রতি বছর গড়ে ৭০ জনের মৃত্যু হয় হাতির কারণে। কর্নাটকেও বছরে গড়ে ৭০ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু কর্নাটকে হাতির সংখ্যা ৬১৭৯। অর্থাৎ কর্নাটকে গড়ে ১০০টি হাতি পিছু একজনের মৃত্যু হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যু হয় ১০ জনের। 

উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের ছবিটাও পুরো উল্টো। ২০১০ সালের হিসেবে, উত্তরবঙ্গে হাতির সংখ্যা ৬২৯টি। অথচ হাতির কারণে মানুষের মৃত্যু দুই বঙ্গে প্রায় সমান। ক্ষয়ক্ষতিও বেশি। এর কারণ, ১) উত্তরের তুলনায় দক্ষিণবঙ্গে হাতির মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ অনেক কম। ২) উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে গাছ ও লতাগুল্মের ঘনত্ব ও প্রকারভেদ দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় বেশি ৩) দক্ষিণবঙ্গে বনভূমি ও কৃষিজমির অবস্থান কাছাকাছি ৪) উত্তরের তুলনায় দক্ষিণের বনভূমি ঋতুভেদে একেবারেই শুষ্ক হয়ে পড়ে। ফলে সমস্যা বাড়ে। দক্ষিণবঙ্গে হাতির সংখ্যাও বেড়েছে প্রতি বছর।

এই সংখ্যাবৃদ্ধিতে কিন্তু দেশের হাতির বংশবৃদ্ধি হয় না। মূলত বিহার-ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে হাতি এসে সংখ্যা বাড়ায়। সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ তিনটি। প্রথমত, আগে এই তিন রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী হাতির ‘মরসুমি বাসভূমি’ ছিল দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গল। সেই জন্য এদের নাম ছিল ‘দলমার হাতি’। কিন্তু এখন হাতিদের আদি বাসস্থান বদলাচ্ছে। নয়ের দশকে অল্প সংখ্যক হাতি অল্প সময়ের জন্য দলমা থেকে দক্ষিণবঙ্গে ঢুকত। কংসাবতী নদীর পাড় পর্যন্ত ছিল তাদের গতিবিধি। কিন্তু পরের বছরগুলিতে হাতি বাড়তে থাকে। এলাকা বাড়িয়ে কংসাবতী পেরিয়ে হুগলি, হাওড়া অন্যদিকে সুবর্ণরেখা পেরিয়ে নয়াগ্রাম পর্যন্ত ঢুকে পড়তে থাকে। কিছু হাতি সারা বছরই থাকে দক্ষিণবঙ্গে। এদের আর দলমার হাতি বলা যায় না। ওই তিন রাজ্যে তাদের আদি বাসস্থান নষ্ট হয়েছে খনির কারণে। তার সঙ্গে নগরায়ন এবং রেললাইন। খনির বিস্ফোরণে ও খননে তাদের পানীয় জলের উৎসগুলি হয়েছে দূষিত। ওড়িশা সীমানা বরাবর কিছু জায়গায় বৈদ্যুতিন বেড়া দেওয়া হয়েছে। খোঁড়া হয়েছে পরিখা। হাতির স্বাভাবিক চলার পথের মাঝে হয়েছে বসতি, চাষের জমি, রাস্তা। সবচেয়ে বেশি হাতি করিডর নষ্ট হয়েছে কংসাবতী ক্যানেল প্রকল্পের জন্য। ফলে দক্ষিণবঙ্গে হাতির সংখ্যা বাড়ছে। 

দ্বিতীয়ত, ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দলমা থেকে হাতির পাকাপাকি থেকে যাওয়ার সংখ্যা ছিল নগন্য। পরের বছর থেকে সংখ্যা বাড়তে থাকে। কারণ দক্ষিণবঙ্গে বনভূমির ঘনত্ব এবং পরিমাণও বাড়তে থাকে। ১৯৮৮-৯১ সালের মধ্যে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলায় নতুন বনভূমির পরিমাণও বেড়েছে ৩১৫ বর্গ কিলোমিটার। ফলে হাতিরা আকৃষ্ট হচ্ছে। 

তৃতীয়ত, বনভূমি লাগোয়া কৃষিজমির আকর্ষণ। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জমিগুলো ছিল অনাবাদী। খাস জমির বড় অংশ পাট্টা দিয়ে বিলি করা হয়। বৃষ্টি নির্ভর চাষ শুরু হয়। পরে কংসাবতী প্রকল্প ব্যাপক চাষ শুরু হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালের মধ্যে ধান, আলু, গম, তৈলবীজ ও আলুর উৎপাদন বেড়েছে ১৪০ শতাংশের বেশি। দানা জাতীয় এবং রসাল খাবারের টানে হাতি হাজির। হাতি প্রকল্পের বাধা হয়েছে আরও কিছু কারণ। দক্ষিণবঙ্গে বনভূমি খণ্ড খণ্ড। একটানা স্বাভাবিক হাতি করিডরে অভাব। ফলে হাতি ঢুকছে জনবসতিতে। এই এলাকার ল্যাটেরাইট মাটির জলধারণ ক্ষমতা কম। পানীয় জলের জন্য তাদের প্রায়ই আসতে হয় কৃত্রিম জলাশয়ে। পূর্ণাঙ্গ হাতির গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কেজি ঘাস-পাতার দরকার হয়। কিন্তু এখানকার বনভূমি চিরহরিৎ নয়। খাদ্যের খোঁজেই হাতি লোকালয়ে। হাতি ‘বিপন্ন প্রজাতি’ এবং তফসিল-১ এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে এর জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। 

এছাড়াও হাতি প্রকল্পের দক্ষিণবঙ্গে প্রায়োগিক দুর্বলতাও কিছু রয়ে গিয়েছে। এর খামতি দূর করতে হাতির প্রাথমিক বাসস্থান ও তাদের করিডর সংরক্ষণ প্রশ্নে বনভূমিকে আরও খাদ্য সমৃদ্ধ করতে হবে। কৃত্রিম বনসৃজন করে নিরবচ্ছিন্ন করিডর তৈরি করা দরকার। গাছের প্রকারভেদ ঘটিয়ে খাদ্যে বৈচিত্র আনতে হবে। বনভূমির কাছের জমিতে চাষ করতে হবে হাতির অপছন্দের ফসল। প্রতি বছর বহু হাতি দলছুট হয়। এদের চিকিৎসা ও মৃত্যুহার কমাতে দক্ষিণবঙ্গে আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। হাতি বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ দল তৈরি, রেডিয়ো কলার, ড্রোন ব্যবহার করে হাতির দলের অবস্থান নিশ্চিত করা দরকার। বৈদ্যুতিন বেড়া ও পরিখা তৈরি করে হাতির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই সঙ্গেই দরকার জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, বনবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলিকে সুসংহত ঐক্য গড়ে জনমানসে হাতি সংরক্ষণকে সামাজিক চাহিদা এবং গণ সচেতনতা আন্দোলনের রূপ দিতে হবে। 

প্রকল্প রূপায়ণ করলে হাতি এবং মানুষ, উভয়ই রক্ষা পাবে। 

লেখক সহ অধিকর্তা, প্রাণিসম্পদ বিকাশ বিভাগ