বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যে কয়টি কারণে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে থাকিয়া যাইবেন, তাহার অন্যতম এই উক্তিটি— ‘দে হ্যাভ বিন পেড (ব্যাক) ইন দেয়ার ওন কয়েন’। তিনি আজ রাজনীতি হইতে অবসৃত, অন্যরাও কথাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফের স্মরণ করাইয়া দেন নাই। তবে, তৃণমূল হইতে ঝাঁক বাঁধিয়া বিধায়ক-পুরপ্রতিনিধিদের বিজেপিতে যাওয়া দেখিয়া তাঁহার নিশ্চয় কিছু মনে পড়িতেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে কোন বদল আসিলে এমন যূথবদ্ধ দলত্যাগ ঘটে, তাঁহারা বিলক্ষণ জানেন। হয়তো আজ তাঁহারা বুঝিতেছেন— অথবা, কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের কথা সত্য হইলে আগামী এক মাসে বুঝিবেন, দল ভাঙাইবার এই রাজনীতি তাঁহাদেরও মঙ্গল করে নাই। বস্তুত, গত আট বৎসরে তাঁহারা যতগুলি কাজ করিয়াছেন, কোনটি আত্মঘাতী নহে, তাহা ভাবিয়া দেখিবার মতো।

হাওয়ায় রসিকতা ভাসিতেছে, বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব নাকি এখন কোনও বিরোধী নেতার নামে নিন্দামন্দ করিতে ভয় পাইতেছেন— বলা যায় না, কাল কে কোন দলে যোগ দেন! তবে, বিজেপি তৃণমূল-প্রদর্শিত পথে হাঁটিতেছে, বলিবার উপায়মাত্র নাই। অসমে সর্বানন্দ সোনওয়াল বা হিমন্ত বিশ্বশর্মা হইতে কর্নাটকে এস এম কৃষ্ণ, উত্তরপ্রদেশে রীতা বহুগুণা জোশী, অথবা এই বঙ্গেই মুকুল রায়, বিজেপির অন্দরমহলে ‘বহিরাগত’ প্রচুর। গত কয়েক বৎসরে বিজেপি দল ভাঙাইবার রাজনীতিকে একেবারে কেন্দ্রস্থলে লইয়া আসিয়াছে। তাঁহাদের কেহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, কেহ নহেন। কাজেই, পশ্চিমবঙ্গেও ভিন দল হইতে বিধায়ক বা পুরপ্রতিনিধিদের দলে টানিয়া লইতে বিজেপির আপত্তি না থাকাই স্বাভাবিক। তাহাতে গণতন্ত্রের ক্ষতি হইবে কি না, পশ্চিমবঙ্গের যুদ্ধক্ষেত্রে সেই বিবেচনা করিবার মানসিকতা বিজেপির নাই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দলত্যাগের মধ্যে একটি বিশ্বাসভঙ্গ রহিয়াছে। মানুষ যখন কোনও প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুধু সেই ব্যক্তিবিশেষকে ভোট দেন না, ভোট দেন তাঁহার দলকেও। দলের নীতিকে, অবস্থানকে। দলত্যাগীরা নূতন দলের ধর্ম মানিবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু, তাঁহারা যে ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন, এই নূতন ধর্মে তাঁহাদের সায় থাকিবে কি না, তাহা জানিবার কোনও উপায় নাই। এইখানেই দলত্যাগ গণতন্ত্রকে অপমান করে। দুঃখের কথা, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সেই দলত্যাগ এখন ‘স্বাভাবিক’ হইয়া গিয়াছে।

এই কথাটি বর্তমানে আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিপিআইএম বা তৃণমূল কংগ্রেস দলের সহিত বিজেপির একটি চরিত্রগত পার্থক্য রহিয়াছে। তাহাদের রাজনীতির কেন্দ্রে রহিয়াছে ধর্মীয় পরিচিতিভিত্তিক বিশ্বাস। এই রাজ্যে বিজেপি চল্লিশ শতাংশ ভোট পাইয়াছে বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি এখনও ‘বহিরাগত’, নূতন। তাহাকে প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে পূর্বের সত্তাগুলিকে মুছিয়া ফেলা প্রয়োজন। রাজ্যে ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘর্ষগুলির মধ্যে এই মুছিয়া ফেলিবার প্রবণতাটি স্পষ্ট। অভিযোগ, ক্ষমতাসীন হইবার পূর্বেই একাধিক কারণে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সেই দাপট অর্জন করিতে পারিয়াছে, যাহার জোরে শাসকদের সহিত টক্কর লওয়া যায়। ফলে, পরিচিত কর্মীদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য জোরজুলুম করিবার অভিযোগ উঠিতে আরম্ভ করিয়াছে। আশঙ্কা— রাজ্য রাজনীতিতে শুধু পটপরিবর্তন নহে, পর্বান্তর আসন্ন। তাহার দায় বহুলাংশে তৃণমূল কংগ্রেসের বটে, রাজনৈতিক হিংসা হইতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ‘কিনিয়া লওয়া’, কোনও অভিযোগ হইতেই তাহাদের অব্যাহতি দেওয়া যায় না। কিন্তু, যে পরিবর্তন তৃণমূলও করে নাই— যাহা করা সম্ভব ছিল না— বিজেপির অভ্যুদয়ের মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ তাহারও সাক্ষী থাকিতেছে বলিয়াই সন্দেহ হয়।