জন্মদিন মানেই উৎসব। আত্মীয় থেকে বন্ধুবান্ধব, জন্মদিন মানেই হুল্লোড়। সেখানে জন্মভূমি বাঁকুড়ার স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের দিন স্মরণ করব না, কী করে হয়? ঝুমুরের সুরে বলা যায়,—‘তাং কুড় কুড় হিস্-সা গিজা, ঝাঁ গেড়-গেড় ঝা/ এই বাঁকুড়ায় জনম হামার/ আমি বাঁকুড়ার ছা’।

বাঁকুড়া জেলা গঠনের সূচনা হয়েছিল ১৮৩৪ সালে। তবে আইনানুগ ভাবে স্বতন্ত্র বাঁকুড়া জেলার সৃষ্টি ১৮৮১ সালের ১৬ মার্চ (মতান্তরে ১৪ মার্চ)। ওই সময়ে বাঁকুড়ায় দু’টি মহকুমা ছিল—বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুর। মোট গ্রামের সংখ্যা ছিল ৩,৯৮৭টি। আর এলাকা ছিল ১,৩৪৬ বর্গমাইল। ১৮৭২ সালের হিসেবে লোকসংখ্যা ছিল ৫,২৬,৭৭২। থানা ছিল পাঁচটি।

বাঁকুড়ার উৎসভূমি রাঢ়ভূমি বা রাঢ়বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। সুকুমার সেনের মতে, ‘খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দু’শো বছর পূর্বে এখন যাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা যে সব এলাকায় বসবাস করতেন তা ছিল এখনকার তুলনায় অনেক বড়। বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কামরূপ ছাড়াও হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সে সময়ে যে প্রধান চারটি জাতি ছিল, তারা হল—পুন্ড, বঙ্গ, রাঢ় ও সুক্ষ্ম। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল কৈবর্ত বা কেবওরা, হাঁড়ি, ডোম, বাথুরিয়া বা বাউড়ি’। জৈন আচারঙ্গ সূত্রেও রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন সময় থেকেই রাঢ়ের দু’টি ভাগের উল্লেখ মেলে—বজ্জভূমি বা বজ্‌জভূমি এবং সুবভভূমি। বজ্জভূমি হল শক্ত পাথুরে মাটির দেশ আর সুবভভূমি বা শুভ্রভূমি হল খানাখন্দের দেশ (যদিও মতান্তর রয়েছে)।

নবম-দশম শতকে রাঢ়ের প্রধান নগর হিসেবে কর্ণসুবর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভিন্ন মতে, উত্তর রাঢ় বীরভূম, দক্ষিণ রাঢ় মেদিনীপুর, পশ্চিম রাঢ় ছোটনাগপুর লাগোয়া অরণ্য-পর্বত অঞ্চল ও ভাগীরথী সমভূমির পাশাপাশি, মধ্যরাঢ় হিসেবে বাঁকুড়ার উল্লেখ মেলে। মানিকলাল সিংহও বাঁকুড়াকে মধ্য রাঢ় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাঁকুড়ার নামকরণ নিয়েও নানা মত রয়েছে। কোল ও মুণ্ডাদের ব্যবহৃত ‘ওড়া’ বা ‘ড়া’ শব্দের অর্থ বাড়ি বা বসতি। সংস্কৃত ‘বক্র’ শব্দ থেকে বাঁকু পদান্তে ‘ড়া’ যোগে বাঁকুড়ার উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। পণ্ডিত যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, এক্তেশ্বরের মন্দিরের বাঁকা শিবলিঙ্গ থেকে বাঁকুড়া নামের উৎপত্তি হয়েছে। অনেকের মতে, আবার জেলার প্রসিদ্ধ ঠাকুর ধর্মঠাকুর যাঁর অপর নাম বাঁকুড়া রায়, তা থেকেও জেলার নামের উৎপত্তি হতে পারে। কারও অনুমান, মল্লরাজ বীর হাম্বিরের এক পুত্র ছিল, যাঁর নাম বীর বাঁকুড়া। তা থেকে এই নামের উৎপত্তি। কেউ কেউ আবার মনে করেন, বঙ্কু রায় নামে কোনও এক সর্দার পত্তন করেছিলেন বাঁকুড়ার। আবার গ্যাস্ট্রল সাহেব একে তাঁর রিপোর্টে ‘বানকুন্ডা’ বলে উল্লেখ করেছেন। 

ব্রিটিশ আমলের আগে বাঁকুড়া ছিল মল্লরাজাদের অধীনে, অর্থাৎ বিষ্ণুপুরের অন্তর্গত। ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিষ্ণুপুর এলাকা, যা বর্তমানে বাঁকুড়ার এক-তৃতীয়াংশ, মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত ছিল। আবার, ১৭৮৭ সালে তা চিহ্নিত হয় বর্ধমানের অংশ হিসেবে। ১৮০৫ সালে ২৩টি পরগনা নিয়ে সৃষ্টি হয় জঙ্গলমহল জেলার। ওই সময়ে বাঁকুড়ার ছাতনা, সিমলাপাল, ভালাইডিহা, সুপুর প্রভৃতি অঞ্চলগুলি জঙ্গলমহলের অন্তর্ভুক্ত হয়। 

১৮০৫ থেকে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাঁকুড়া ছিল জঙ্গলমহলের সদর দফতর। ১৮৩৩ সালে জঙ্গলমহল ভেঙে মানভূম জেলার সৃষ্টির পরে, ১৮৩৪ সালে বাঁকুড়া জেলা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই সালেই বাঁকুড়ার সদর দফতর বিষ্ণুপুর থেকে বাঁকুড়ায় স্থানান্তরিত হয়। পরে ১৮৮১ সালের ১৬ মার্চ আইনানুগ ভাবে স্বতন্ত্র বাঁকুড়া জেলা গঠিত হয়। ১৯২০-তে বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠনের পরে, বামাচরণ রায় প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। 

দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই জেলা। এক দিকে, যেমন গঙ্গানারায়ণের বিদ্রোহ, চুয়াড় বিদ্রোহের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে বাঁকুড়া, তেমনই ছিল শিক্ষাশ্রম, ছেন্দাপাথরে ক্ষুদিরামের গুপ্ত ঘাঁটি, ‘সিক্রেট সোসাইটি’, ‘রামদাসের আখড়া’, ‘সংগঠনী সমিতি’, ‘অভয়াশ্রম’, ‘অনুশীলন সমিতি’র মতো বিপ্লবীদের ঘাঁটি। আবার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, সুভাষচন্দ্র বসু, সরোজিনী নাইডুর মতো অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তির আগমনে, স্মরণে-বরণে ধন্য এই বাঁকুড়া।

শু‌ধু তা-ই নয়, সারদাদেবী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ, যামিনী রায়, যদুভট্ট, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমিত্রা দেবীর মতো কত শিল্পী, সাহিত্যিকের জন্ম এই বাঁকুড়ায়। গর্ব হয় যখন পাঁচমুড়ার ঘোড়া কিংবা বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা স্থান করে নেয় বিশ্বের কলামঞ্চে। 

২০১১ সালের আদমসুমারি অনুসারে বাঁকুড়ার জনসংখ্যা ৩৫,৯৬,২৯২ জন। এলাকা ৬,৮৮২ বর্গকিলোমিটার। রয়েছে তিনটি মহকুমা, ২১টি থানা, ২২টি ব্লক, ১৯০টি পঞ্চায়েত ও ৫,১৮৭টি গ্রাম। শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতির যে ঐতিহ্য এ জেলার প্রতিটি রন্ধ্রে, আগামী দিনেও তা একই ভাবে বজায় থাকবে, জন্মদিনে এই শুভেচ্ছা রইল।

 

লেখক আদ্রার প্রাক্তন রেলকর্মী