এনআরসি এক কথায় কী? ‘অবৈধ বাংলাদেশি তাড়াও’ অভিযান, বিজেপির কল্যাণে যা পুরো স্বপনকুমারের রহস্যরোমাঞ্চ সিরিজ়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু সংসদে বলেছিলেন ভারতবর্ষে ২ কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছেন, তার মধ্যে ৫০ লক্ষই অসমে। আর এই ২০১৯ সালে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানালেন ২ কোটির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই ১ কোটি অনুপ্রবেশকারীর বাস। 

পরিষ্কার বলা যাক, সংখ্যাগুলি রোমহর্ষক হলেও নেহাতই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র গালগল্প। কারণ, প্রথমত ওঁরা কোনও সূত্র দেননি, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে পেয়েছেন হতেই পারে, কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজও কোনও স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় নয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি, তার মধ্যে ২ কোটি মানুষই ভারতে ঢুকে বসে আছেন, অতি উর্বর কোনও দ্রব্যের প্রভাব ছাড়া এ জাতীয় আকাশকুসুম কল্পনা সম্ভব নয়। এটা সত্যি হলে মেনে নিতে হয়, ভারতবর্ষ চুপিচুপি উন্নতিতে এমনকি আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে, আর বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত হন্ডুরাসেরও পিছনে। কারণ, হন্ডুরাস থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে যথেষ্ট হট্টগোল চলছে আমেরিকায়, কিন্তু সেখানে এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেননি হন্ডুরাসের জনসংখ্যার ১০ বা ১৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকায় ঢুকে বসে আছেন। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, বিজেপি সুকৌশলে চেপে গেলেও, অনুপ্রবেশ নিয়ে পুরোদস্তুর সরকারি তথ্য আছে, যা দিলীপবাবুদের দেওয়া আজগুবি গল্পকথার একেবারে উল্টো। অনেক টালবাহানার পর ২০১১ সালের জনগণনার সেই তথ্য অবশেষে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, দিকে দিকে ‘উইপোকা’ ছেয়ে যাচ্ছে, এই কাহিনি নেহাতই ‘হ্যারি পটার’ জাতীয় রূপকথা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আগত মানুষের সংখ্যা আসলে কমছে, বাড়ছে না। ২০০১ সালে সংখ্যাটা ছিল ৩০ লক্ষ। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ লক্ষে। কোনওটাই ২ কোটির ধারেকাছে নয়। (জনগণনার হিসেব নিশ্চয়ই পাথরে খোদাই করা অভ্রান্ত কিছু নয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র চেয়ে বাস্তবের কাছাকাছি)।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল যে, এমনকি এই ২৩ লক্ষ মানুষই ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ নয়। ভারতবর্ষের দায়িত্বশীল নেতারা জেনেবুঝে কথা বলেন, এ অপবাদ তাঁদের শত্রুরাও দেবেন না, কিন্তু তার পরেও এটুকু অন্তত তাঁদের জানার কথা যে, এটা স্রেফ ‘অবৈধ’দের তালিকা নয়। বৈধ উদ্বাস্তুরাও এর মধ্যে আছেন। সম্ভবত সিংহভাগই। বাংলা দু’টুকরো হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে দশকের পর দশক ধরে এ-পারে এসেছেন। তাঁদের সংখ্যা সুবিপুল। কালের নিয়মে এই উদ্বাস্তুদের অনেকেই মারাও গিয়েছেন। বাকি যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁরাও আছেন জনগণনার এই সংখ্যার মধ্যে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ হয় না তা নয়, নিশ্চয়ই হয়, কিন্তু সেই সংখ্যাটা ২ কোটি তো নয় বটেই, এমনকি ২৩ লক্ষও নয়, তার অনেক কম। 

ফলে এর পরে যে প্রশ্নটা আসা স্বাভাবিক, অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা এত কম হলে তাড়ানো হবে কাকে? এ তো সত্যিই ‘ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’ নয় যে, দেশে ২ জন অনুপ্রবেশকারী থাকলেও ১০০ জনকে ধরেবেঁধে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে। এ প্রশ্নের উত্তর অসমের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, এই অসম্ভবকেই ওখানে সম্ভব করা হয়েছে রীতিমতো ঐন্দ্রজালিক কায়দায়। পদ্ধতিটা খুবই সহজ। প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ৫০ লক্ষের একটা মনগড়া সংখ্যা বললেন। সরকারি যন্ত্র সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে কাছাকাছি গেল। এনআরসির খসড়া তালিকা থেকে ৪০ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়া হল। তার পর অতটা রাখা অসম্ভব হওয়ায় চূড়ান্ত তালিকায় সংখ্যাটা কমে এল ১৯ লক্ষে। সেখানেও অজস্র ভুল, কেউ-ই সন্তুষ্ট নন। ফলে, আন্দাজ করাই যায় যে, পুরোটাই সংখ্যার খেলা, লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে নিয়ে তার পর সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা। এবং মর্মান্তিক যেটা, এই চেষ্টাটা করা হচ্ছে জ্যান্ত মানুষের জীবন নিয়ে। অঙ্কে গোঁজামিল দেওয়া যায়, পরিসংখ্যানে জল মেশানোও হয়েই থাকে, কিন্তু এই সরকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, সরকারের অঙ্কে ভুল হলে, সেটা ইচ্ছাকৃতই হোক বা অনিচ্ছাকৃত, তার মাসুল দিতে হয় মানুষকে রাষ্ট্রহীন হয়ে, ডিটেনশন ক্যাম্পে আস্তানা গেড়ে।  

উদ্বেগের বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গেও যদি ১ কোটির লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়ে থাকে, এবং অসম-পদ্ধতিই যদি অবলম্বন করা হয়, তবে হযবরলর জগৎ এখানেও কঠোর বাস্তবতা হয়েই নেমে আসবে। ১ কোটির কোটা পূরণের আপ্রাণ চেষ্টা করা হলে প্রাথমিক ভাবে সন্দেহের তির কাদের দিকে থাকবে? যাঁরা বা যাঁদের পূর্বপুরুষরা পূর্ববঙ্গ থেকে এ দিকে এসেছেন। ১৯৪৭, বা ১৯৭১, যখনই এসে থাকুন, কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। তাতেও এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছানো অসম্ভব। ফলে বাদবাকি জনগোষ্ঠীর উপরে হাত পড়বেই। কেউই বিপদের বাইরে নন। এখানে হিন্দু-মুসলমানও কোনও ব্যাপার নয়। অসমে সেটাই ঘটেছে। সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও, উত্তর-পূর্বের একাধিক সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী এনআরসি-খারিজ বাঙালি হিন্দুরা বাঙালি মুসলমানের চেয়ে সংখ্যায় বেশিই। এমনকি, খোদ বিজেপি নেতা বা নেত্রীরা, যাঁরা ‘হিন্দুদের কোনও বিপদ নেই’ বলে এনআরসির পক্ষে প্রচার করে বিজেপিকে ভোটে জিতিয়েছিলেন, তাঁদেরও কেউ কেউ তালিকা থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছেন। এই ব্যাপারে বলতেই হবে, সাম্প্রদায়িক বা দলগত কোনও বাছবিচার হয়নি। মেক-ইন-ইন্ডিয়ার স্লোগানকে বাস্তবায়িত করে উদ্ভাবিত হয়েছে পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য, এনআরসি নামক এক অপূর্ব যন্ত্র, কোটা পূরণ করার জন্য যা সকলকেই সমানাধিকার দিয়েছে। যাঁরা উদ্বাস্তু, যাঁরা দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা, যাঁরা ইস্টবেঙ্গলের, যাঁরা মোহনবাগানি, এমনকি যাঁরা তথাগত রায় কিংবা অমিত শাহের কথায় একদা উদ্বাহু হয়ে নেচেছেন, বাছবিচার ছাড়াই সব গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাই বাদ গিয়েছেন এই গুপিযন্ত্র-প্রস্তুত তালিকা থেকে। পশ্চিমবঙ্গেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করলে অন্য রকম হওয়ার বিশেষ কারণ নেই। 

অবশ্যই তালিকা হলেই সমস্ত মানুষই বাদ চলে যাবেন তা নয়। অসমের ৯০ লক্ষ বাঙালির মধ্যে অন্তত ১২ লক্ষ (একটি সংবাদপত্র সূত্রানুযায়ী) বাদ গিয়েছেন। প্রতি ৯ জনে ১ জনের একটু বেশি। বাকি ৮ জন যাননি। পশ্চিমবঙ্গেও সেই একই অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছে, অর্থাৎ ৯ কোটির মধ্যে ১ কোটিকেই অভারতীয় বানিয়ে দেওয়া হবে। আশ্চর্যের কিছু নেই, শিবঠাকুরের আপন দেশে লক্ষ্যমাত্রা এ ভাবেই ঠিক হয়। একই পদ্ধতি অনুযায়ী চললে এখানেও অবশ্য ৯ জনের মধ্যে ৮ জনই তালিকার বাইরে থাকবেন। 

কিন্তু তাতে তাঁদের আনন্দের কিছু নেই, তাঁরা মোটেই বেঁচে যাবেন এমন নয়, কারণ অসমের ক্ষেত্রে, নির্বিচারে সকলকেই হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ‘রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপ’-এর একটি সমীক্ষা দেখাচ্ছে, রাষ্ট্রহীনের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে অসমে শুনানি, যাতায়াত, সব মিলিয়ে প্রতি মানুষের খরচ হয়েছে গড়ে ১৯,০০০ টাকা। সব মিলিয়ে আনুমানিক ৭৮৩৬ কোটি টাকা। শুধু টাকাই নয়, সঙ্গে উপরি পাওনা লাঞ্ছনা, হয়রানি, অপমান। এক রাতের নোটিসে দুরুদুরু বুকে ৩০০ বা ৪০০ কিলোমিটার দৌড়ানো, দারুণ রোদে লাইন দিয়ে এনআরসি কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, এবং সরকারি আধিকারিকদের ধাতানি মুখ বুজে সহ্য করা, এক কথায় অমানবিক আচরণ বলতে যা যা বোঝায়, সবই সহ্য করতেই হয়েছে স্রেফ নিজভূমে নিজেকে পরবাসী নয় প্রমাণ করার জন্য। কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করেই খালাস, তাঁদের কিছু প্রমাণ করার নেই। নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করার দায়িত্ব নাগরিকেরই। এটাই এনআরসির ঘোষিত পদ্ধতি। অতএব এই লাঞ্ছনা সহ্য করতে, বিপুল অর্থব্যয় করতে বাধ্য হয়েছেন ভারতবর্ষের একটি দরিদ্রতম রাজ্যের মূলত দরিদ্রতম মানুষরা। আশ্চর্যের কিছু নেই, দলে-দলে বাঙালি আত্মহত্যা করেছেন এই প্রক্রিয়া চলাকালীন। এবং শেষ তালিকা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই আসছে আরও আত্মহত্যার খবর।

কেন এই অপমান? কারণ তাঁরা বাংলাভাষী, তাই সন্দেহের কেন্দ্রে। ভারতবর্ষের অন্যত্র প্রচুর উদ্বাস্তু আছেন। পঞ্জাবে দেশভাগের সময় আসা পঞ্জাবিরা আছেন, তামিলনাড়ুতে শ্রীলঙ্কার তামিলরা। এ ছাড়াও আছেন নেপালিরা, তাঁরা উদ্বাস্তু নন, কিন্তু তাঁদের সংখ্যা, জনগণনানুযায়ী ১০ বছরে বেড়েছে ২ লক্ষ। কিন্তু এ সব নিয়ে কোনও হইচই শোনা যায় না। কারণ, এনআরসির কেন্দ্রীয় থিমই হল বাংলাদেশি বিতাড়ন। সেটাই জোর দিয়ে হয়েছে অসমে, পরবর্তী লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ। দেশভাগ থেকে শুরু করে দশকের পর দশক ধরে বাঙালিরা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছেন এ-পারে। কে বৈধ আর কে অবৈধ চিনতে গেলে সবাইকেই সন্দেহ করা দরকার। সব মিলিয়ে এ এক অপূর্ব রাষ্ট্রীয় কারবার। বাংলা দু’টুকরো হওয়ার সিদ্ধান্তের ফলেই সম্ভবত কোটিখানেক মানুষ জীবন দিয়ে জেনেছেন এক দিন হঠাৎ কী করে নিজভূমে পরবাসী হয়ে যেতে হয়। কী ভাবে একটি কল্পিত রেখা টপকালেই তা হয়ে যায় অনুপ্রবেশ। 

সত্তর বছর পরে, আবার আর এক দফা গণবিতাড়নের ডাক উঠেছে। আবার আর এক দফায় মানুষকে ঘরহীন করার রাষ্ট্রীয় প্রকল্প শুরু হয়েছে। তার নামই এনআরসি।