ভারত অহরহ নিজেকে আধুনিক বলিয়া ঘোষণা করিতে যত উৎসাহী, প্রকৃত আধুনিক মানসিকতা সম্পর্কে ততোধিক নিরৎসুক। এই রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিগণ অসহিষ্ণুতা বিষয়ে যথেষ্ট সহিষ্ণু। সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিলম সার্টিফিকেশন যখন বাক্‌স্বাধীনতাকে কতিপয় ঘা মারিতে উদ্যত, তখন তাহার প্রশ্রয়ের বায়ু ক্ষমতার অলিন্দে বহমান। যে চরিত্র আদৌ ইতিহাসে নাই, তাহার চলচ্চিত্রচিত্রণ লইয়া মারামারি চলিতেছে, সম্ভবত আরও চলিবে। সর্বত্রই ব্যক্তির চিন্তা প্রকাশ ও তদনুযায়ী কার্য করিবার স্বাধীনতা সম্পর্কে একটি রক্তচক্ষুর আবহ। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট যখন সমকাম বিষয়ে তাহার পূর্বের রায়ের পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত লইল, তাহা ব্যতিক্রমী সুঘটনা। প্রাচীন আইনে সমকামকে অপরাধ গণ্য করা হইত। ২০০৯ সালে দিল্লি হাই কোর্ট রায় দিয়া সেই ধারাকে মৌলিক অধিকারের বিরোধী আখ্যা দেয়, কিন্তু ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় খারিজ করিয়া দেওয়ায়, সমকাম অপরাধের তালিকাতেই ফিরিয়া যায়। এই বার, পরিবর্তমান নীতিবোধ অনুযায়ী, আইন বদলাইবার প্রয়োজন অনুভূত হইয়াছে।

ইদানীং বিবিধ প্রান্তবর্তী গোষ্ঠীর স্বার্থ লইয়া যে আন্দোলনগুলি সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন ফেলিয়াছে, সমকামী আন্দোলন তাহার মধ্যে অগ্রগণ্য। সমকামীদের অধিকারের পক্ষে বহু সংগ্রামের ফলে, আজ বহু দেশ সমকামকে অ-স্বাভাবিকতার তকমা হইতে রেহাই তো দিয়াছেই, সমকামী বিবাহকেও আইনি মান্যতা দিয়াছে। বিবাহ অবধি মানিতে না পারিলেও, বহু দেশ সমকামী যুগল-যাপনকে আইনসংগত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। দুইটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পরস্পরের সম্মতিক্রমে কেমন যৌনাচার করিবেন, সে বিষয়ে রাষ্ট্র বা অন্য কাহারও নাক গলাইবার বা অনুশাসন জারি করিবার কোনও অধিকারই থাকিতে পারে না— ব্যক্তির মৌলিক অধিকার বিষয়ে সামান্য জ্ঞান থাকিলেই এই সিদ্ধান্ত প্রায় গাণিতিক সমীকরণের ন্যায় অবধারিত হইয়া দেখা দেয়। কিন্তু ভারত এখনও তাহা লইয়া ভাবিয়া চলিতেছে। সুপ্রিম কোর্ট এই দোলাচল কাটাইয়া স্পষ্ট সিদ্ধান্ত লইবার ভিত্তি প্রস্তুত করিতেছে ও কেন্দ্রীয় সরকারকে অবস্থান জানাইতে বলিয়াছে।

সরকার কী বলিবে, যে দল সরকার চালায় তাহার ‘হিন্দুত্ব’ সম্পর্কিত ধারণার সহিত সমকামিতা সমঞ্জস কি না, তাহার ভোটাকাঙ্ক্ষা তাহাকে নীতিবিমুখ করিবে কি না, সময় বলিবে। কিন্তু এই প্রশ্নে কেবল সরকার নহে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সরব সমর্থন প্রয়োজন। ভারতীয় ‘সংস্কৃতি’ বা ‘ঐতিহ্য’-র অজুহাত না দিয়া, প্রথা ও অভ্যাসের শৃঙ্খল ভাঙিয়া, সহ-মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরকে মর্যাদার অঙ্গীকারকে আলিঙ্গন করিতেই হইবে। একটি রাজনৈতিক দলও যদি সমকামকে মানুষের অধিকার না বলিয়া অপরাধ বলিয়া অভিহিত করে, তাহা হইবে ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জাকর। গণতন্ত্র মানুষের অশিক্ষিত ধারণাকে হল্লা করিয়া জেতাইবার পদ্ধতি নহে। অনেকে হয়তো বলিবেন, ভারতীয় সমাজ এইগুলি ভাল চক্ষে দেখে না। সে ক্ষেত্রে সমাজের চক্ষু উন্মীলন করিতে হইবে। সমাজ কোনটা চাহিতেছে, তাহা বিবেচনার পাশাপাশি সমাজ-নিয়ন্তাগণকে বুঝিতে হইবে, সমাজের কী চাওয়া উচিত। রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের পালন-পোষণ নহে, বরং জনগণকে প্রগতিশীল চিন্তার শিবিরে আনয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি। ভারতীয় সমাজ পিছাইয়া থাকিলে, রাজনীতিকদের কর্তব্য, অগ্রসর হইবার পথ প্রদর্শন। বহু নিগ্রহ, অপমান, আত্মগোপনের গ্লানি লইয়া ভারতীয় সমকামীরা বহু দিন যাপন করিয়াছেন। আশা করা যায় ভারত তাহার পূর্ব-অন্ধতার প্রায়শ্চিত্ত করিয়া, উদ্ভট আইন বদলাইয়া, ‘ডিজিটাল’ মুক্তচিন্তার পরিচয় দিবে।