Advertisement
E-Paper

শিল্প আমরা করব না

দিল্লির প্রগতি ময়দানে তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা চলছে। মনমোহন সিংহর রাজত্ব। সে সময়কার কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে সে দিন বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে একটাই।

জয়ন্ত ঘোষাল

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০০:০০

দিল্লির প্রগতি ময়দানে তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা চলছে। মনমোহন সিংহর রাজত্ব। সে সময়কার কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে সে দিন বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে একটাই। ট্রাউজার্স পরিহিত ফিকি-র সচিব ডক্টর অমিত মিত্র হয়ে গেলেন ধুতিপরিহিত রাজনীতিক। ঠোঁটকাটা বুদ্ধিমান জয়রাম বলতে চেয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ ফিকির উন্নয়নের সংস্কারমুখী পথ পরিত্যাগ করে সেই সাবেকি বামপন্থাতেই হাঁটছে। অর্থাৎ, ভর্তুকি-দাতব্য।

শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে মমতা আবার ক্ষমতাসীন। কিন্তু দ্বিতীয়বারের অভিষেকের পরও সর্বভারতীয় শিল্পমহল পশ্চিমবঙ্গকে স্বতঃস্ফূর্ত গন্তব্য বলে মনে করছে না। দিল্লির পাঁচতারা তাজ মান সিংহ হোটেলে চেম্বার্স ক্লাবে গোটা দেশের শিল্পপতিদের অবাধ আনাগোনা। মুম্বই-চেন্নাই-বেঙ্গালুরু, এমনকী কলকাতারও বহু ব্যবসায়ী এখানে আসেন। শিল্পপতিদের আড্ডায় যখনই যাই, তখনই শুনতে হয়, ‘তুমহারা বঙ্গাল মে ইয়ে কো রাহা হ্যায় বাবুমশাই!’

এক জন গুজরাতি আগে গুজরাতি। তাঁর কাছে গুজরাতের স্বার্থ অগ্রাধিকার। তার পর সে বিজেপি বা কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম প্রশ্ন হল, আপনি তৃণমূল না কংগ্রেস? সিপিএম না বিজেপি?

নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘গুলি চলার পর কি আর রাজ্যে শিল্প হবে? মানুষ আপনাদের বিরুদ্ধে ভোট দেবে।’ বুদ্ধবাবু তখন সরকারের কান্ডারি, দলের প্রধান মুখ। বলেছিলেন, ‘মানুষ অত বোকা নয়। মানুষ বুঝবে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল।’ বুদ্ধবাবু রাজ্যে শিল্প করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিপিএমের দীর্ঘ শাসনে পাওয়া দলতন্ত্র যে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রস্তুত নয়, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।

মমতা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর শিল্পপতিদের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। প্রধান কারণ ছিল, আন্দোলনের নায়িকাই যখন ক্ষমতাসীন, তখন শিল্পায়নের কাজ হয়তো সহজ হবে। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে মুকেশ অম্বানীর সঙ্গে দেখা। লিফ্‌ট থেকে নামছি, দেখি লবি দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছেন মুকেশ। পাশে তাঁর দিল্লির পুরনো কর্মচারী বালু, বালাসুব্রহ্মণ্যম। মুকেশ বলেছিলেন, ‘দিদির কাছে অনেক প্রত্যাশা। আশা করি পশ্চিমবঙ্গ এ বার আমাদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠবে।’ ভোটের কিছুদিন আগে যখন আমরা সবাই প্রায় নিশ্চিত যে তিনি ক্ষমতায় আসছেন, তখন ‘দ্য টেলিগ্রাফ বিতর্ক’-এ অংশ নিয়ে তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন, ‘আমি জানি, সিঙ্গুরে কারখানা না হওয়ার আপনাদের অনেকের মনে দুঃখ রয়েছে। কিন্তু ওটা চাষিদের স্বার্থে আমি আপস করতে পারি না। কিন্তু এটাও বলছি, আমরা ক্ষমতায় আসছি এবং রাজ্যে শিল্প করব।’ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আমাকে এক সাক্ষাৎকারে মমতা বলেছিলেন, শিল্পায়ন এখন তাঁর অগ্রাধিকার। খবর পড়ে সাতসকালে ফোন করেন প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এ খবর যদি সত্যি হয় তা হলে খুশি হব। তুমি চেষ্টা চালিয়ে যাও। শুভেচ্ছা রইল।’

আজ এত দিন পর গুজরাত ও পশ্চিমবঙ্গ, দু’টি রাজ্যের পরিস্থিতি দেখে বিষাদ-যোগে আছি। সম্প্রতি ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাত’ মহাকুম্ভ দর্শনে গিয়েছিলাম। কয়েক দিন পরই গেলাম কলকাতার মিলনমেলায় বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে। ভাইব্র্যান্ট গুজরাত দেখে মনে হয়েছিল সে এক মহাকাব্য। জাঁকজমক, বর্ণাঢ্য বিশালতা। তবু সেখানেও ঘোষিত প্রত্যাশার ৩০ শতাংশ পূর্ণ হয়। দেশের আর্থসামাজিক সঙ্কটমোচনের রাস্তা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া যায় না। যত দেশের যত বিদেশমন্ত্রীই আসুন না কেন।

এ বার কলকাতা। বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনের প্রথম দিনে অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রীর অত্যাধুনিক অফিসঘর ও বিজনেস লবি-তে বসে মমতার সঙ্গে অনেক কথা হয়। উনি বলছিলেন, কীভাবে বন্‌ধ, অবরোধ, রেল রোকো— এ সব বন্ধ করে দিয়ে তিনি উন্নয়নের সংস্কৃতি নিয়ে আসতে চাইছেন। পড়ন্ত বিকেলে খবর এলো, মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মেলাপ্রাঙ্গণ থেকে বেরনোর সময় কতিপয় সিপিএম কর্মী তাঁর গাড়ির উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছে। এর পর অনেকগুলি দিন কেটে গিয়েছে। দিল্লি ফিরে এসেছি। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি, পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে ধারণা এখনও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ভয়ানক নেতিবাচক। কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিলেও সেটা হবে মরার গায়ে আতর ছেটানো। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিধানসভা ভোটের আগেও এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত এমন এক চরম জায়গায় এসেছে, যেখানে কার্ডে অরুণ জেটলির নাম ছাপানো হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত হাজির হন না। এই কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদে কে দায়ী, সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। রাজ্যের প্রতি মোদী সরকারের বঞ্চনা এবং প্রতিহিংসার মনোভাবের কথা আমি লিখেছি। কিন্তু এখন ভাঙড়ের সম্পর্কে অন্তর্তদন্ত রিপোর্ট পড়ে মন বিষাদগ্রস্ত। তৃণমূল বনাম তৃণমূল। প্রোমোটার এবং সিন্ডিকেটের লড়াই। মাওবাদীদের সুযোগসন্ধান। এ সব দেখে মনে হচ্ছে, সিপিএমের ৩৪ বছরেও হয়নি। মমতা রাজত্বেও আমরা বাঙালি ভাঙড়কে দ্বিতীয় নন্দীগ্রামে পরিণত করার চেষ্টা করব। আউশগ্রামে থানা জ্বালাব। কিন্তু আর যা-ই হোক, শিল্প করব না।

সাংবাদিকতাতে তো বটেই, মনুষ্য জাতিরই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হল, আমরা ব্যক্তির মূল্যায়ন করি সাদা-কালোয়। হয় মমতার সব ভাল, নয় বলতে হবে মমতা ধ্বংসের নায়িকা। আমি কিন্তু এ হেন অবস্থানের ঘোরতর বিরুদ্ধে। মোদীই হোক আর মমতা, আমি মনে করি, কোনও রাজনৈতিক নেতাই আসলে অবতার নন। অন্ধ সমর্থকরা পুজোর ছলে মানুষটাকেই ভুলে থাকে। মমতা ক্ষমতায় এসে অনেক কিছু করেছেন। সেটা মানতে হবে দ্বিধাহীন ভাবে। কলকাতা শহরটা আগের থেকে অনেক পরিষ্কার। আগে তো নেত্রী পাঁচতারা হোটেলেই যেতেন না। এখন সেই মনস্তাত্ত্বিক বাধা তিনি অতিক্রম করেছেন। লন্ডন, মিউনিখ, সিঙ্গাপুর, রোম, কালীঘাটের সাধারণ মেয়েটি যেখানে যা দেখেছেন, তা থেকে কিছু আহরণ করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য করতে চেয়েছেন। দার্জিলিং, জঙ্গলমহল ঠান্ডা করেছেন। আগে তো এ রাজ্যে বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনই হত না। আর কিছু না হোক, ২৯ দেশের প্রতিনিধি তো এসেছিলেন। মমতা লগ্নির আশ্বাসগুলিকে আলাদা ক্ষেত্রভিত্তিক সুনির্দিষ্ট করে ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেননা তৃণমূল নেত্রী জানেন, বহু শিল্পপতি মুখে মারিতং জগৎ। জ্যোতি বসু-সোমনাথের আমল থেকে লগ্নির পরিসংখ্যানের ফানুস ওড়ানো হচ্ছে।

শিল্পায়নকে এখন সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে। টাটার গাড়ি কারখানা হয়নি। কিন্তু অন্য কোনও গাড়ি কারখানা কি এল? মিউনিখে বিএমডব্লিউ-র কারখানা দেখতে নিরুপম সেনের সঙ্গেও গিয়েছিলাম। এ বার মমতার সফরে অমিত মিত্রের সঙ্গেও দেখে এলাম। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে যে ছিঁড়বে না, সেটা কিন্তু বিএমডব্লিউ-ই জানিয়ে দিয়েছে। একটা ভারী বড় শিল্প গড়ে উঠলে রাজ্যের চেহারাটা যে ঠিক কী ভাবে বদলে যেতে পারে, সেটা কিন্তু বিধান রায় বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন বলেই কত দিন আগে দুর্গাপুর, আসানসোল শিল্পাঞ্চলের কথা ভেবেছিলেন। ফরাক্কা ব্যারেজ, কলকাতার পর হলদিয়া নদীবন্দর, বহু বৃহৎ ভাবনার তিনি জন্মদাতা।

হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল ছাড়া এই মুহূর্তে কোনও বৃহৎ চালু কারখানা দেখছি না। নন্দীগ্রাম থেকে ভাঙর-দিল্লি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, এ রাজ্যে তবে শিল্পের বদলে গানের জলসা, সিন্ডিকেট আর তোলাবাজিই ভবিতব্য?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy