×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

গৃহসহায়িকাদের কাছে নারীদিবস অচেনা শব্দ

স্বাতী চট্টোপাধ্যায়
০৮ মার্চ ২০২০ ০১:২২

মালতী মাসির আর্জি, ‘সামনের বোরবারটা ছুটি নেব কিন্তু দিদি। আগে থেকে বলে রাখছি।’ শুনে প্রথমে একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। সপ্তাহান্তের পরম আকাঙ্ক্ষিত এই দিনটিতে মালতী মাসিদের অনুপস্থিতি প্রায় প্রত্যেক পরিবারই ঘটায় ছন্দপতন। কিন্তু ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতেই নজরে এল রবিবার ৮ মার্চ তারিখটা। দিনটি পালিত হয় নারীদিবস হিসাবে।

১৯১০ সালে ডেনমার্কে ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারীদিবস উদ্‌যাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালিত হয়।

যদিও সলতে পাকানোর কাজটি শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে থেকেই। ১৭৯২ সালে মেরি উলস্টেনক্রাফটের ‘A Vindication of the Rights of Women’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যেটি পরবর্তী সময়ে নারী আন্দোলনের আকর গ্রন্থ হিসাবে পরিগণিত হয়েছিল। ব্যক্তি হিসাবে নারীদের আত্মপরিচয়ের এই দীর্ঘ সংগ্রামের ফল হল বিশ্ব নারীদিবস।

Advertisement

আরও পড়ুন: আমার ভেতরের নারীকে গড়া আজও শেষ হয়নি

আমাদের দেশে বা রাজ্যে প্রতি বছরই নানা সংকল্প, নারীবাদী বুদ্ধিজীবীদের মূল্যবান বক্তৃতা প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে দিনটি প্রতিপালিত হয়। কিন্তু সমাজ মানুষের মানসিকতার অদৌ কোনও পরিবর্তন হয় কি? বিশেষত মালতী মাসিদের মতো অসংগঠিত নারী শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা আজও দূর অস্ত্।

আরও পড়ুন:

ওরা তোমার লোক? অ মা, আমরা কার লোক তবে?

নারী-পুরুষ এবং বিভাজনের বোধ রোজ ভাঙছে-গড়ছে বলিউড

শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে অস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের ছোট্ট আশিয়ানা গড়ে তোলে এই গৃহসহায়িকাগণ, রাজধানী দিল্লির যমুনাতীরবর্তী অঞ্চলই হোক, অথবা মুম্বাইয়ের বিশ্বখ্যাত ধারাভি বস্তি, কলকাতার শহরতলি অথবা জেলাশহরগুলির প্রান্তভাগ, অবহেলিত মানুষগুলি মূলত ঠিকে কাজ, রান্নার কাজ অথবা সব সময়ের আয়ার কাজ করে নিজেদের ও পরিবারের জঠরজ্বালা নিবারণের চেষ্টা করেন। সুখ-দুঃখের বারমাস্যার ঝুলি নিয়ে তাঁরা প্রত্যহ বেরিয়ে পড়েন নিজেদের কর্মস্থলের উদ্দেশে। ভোরের প্রথম লোকাল ট্রেন বা বাসগুলি তাদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাবুদের বাড়ির একটানা একেঘেয়ে খাটুনি হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের রোজনামচা। অন্য সংগঠিত শ্রেণির মতো এদের না আছে কোনও আর্ন লিভ, ক্যাজুয়াল লিভ বা মেডিক্যাল লিভ। কাজের ক্ষেত্রেও নেই কোনও নিশ্চয়তা। বার্ধক্যে নেই কোনও পেনশন, গ্র্যাচুইটির মতো সামাজিক নিরাপত্তা। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর পরিবারে সকলের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে ভবিষ্যতের সঞ্চয় বলে কিছুই থাকে না এই হতভাগ্য নারীদের হাতে।

অন্তেবাসী এই নারীদের একটি বড় অংশ স্বামী পরিত্যক্তা, অনেকে আবার দৈনিক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে কোনও মতে সংসারী, কেউ বিধবা, কেউ বা অবিবাহিতা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ভ্যান চালিয়ে, আনাজ বিক্রি করে কলের মিস্ত্রি বা রাজমিস্ত্রি প্রভৃতি অস্থায়ী কাজ করে যা রোজগার করে, তা সংসার প্রতিপালনের পক্ষে অপ্রতুল। উপরন্তু তাদের উপার্জনের সিংহভাগই চলে যায় মদ-জুয়ার মারণ নেশায়। ফলে পরিবারের মেয়ে বউদের বেড়োতে হয় কাজের সন্ধানে। অনেক ক্ষেত্রেই কাজের বাড়ির পরিবেশ এই গৃহসহায়িকাদের নিরাপত্তার পক্ষে অনুকূল হয় না। ২০০৬ এর ডিসেম্বরে দিল্লির কাছে নয়ডায় ১৯টি মেয়ের নৃশংস হত্যার ঘটনায় সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। হতভাগ্য এই কন্যাদের মধ্যে বহরমপুরের গাঁধী কলোনির রিম্পা হালদারেরও স্থান হয়েছিল। এই ঘটনায় ব্যবসায়ী গৃহকর্তা এমএস পান্ধে এবং তাঁর পরিচারক এম এস কোহলিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যদিও উপযুক্ত প্রমাণাভাবে পান্ধে পরে বেকসুর খালাস পেয়ে যান।

আবার ২০১২ সালের অগস্ট মাসে নদিয়ার কৃষ্ণনগরে এক গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণ করে তাঁর দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও নাবালিকা পরিচারিকা বা পরিচারকদের সামান্য অপরাধে খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া, মাথার চুল কেটে দেওয়া, ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে দেওয়ার মত জঘন্য অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের সভ্য শিক্ষিত সমাজে।

গৃহ পরিচারক, পরিচারিকা, রন্ধনকর্মী প্রমুখদের জন্য কাজের ক্ষেত্রে মানবিক শর্তের বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (ILO) জাতিপুঞ্জের সদস্য রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করে ১৯৬৫ সাল থেকে। প্রথম দিকে ভাল সাড়া না পাওয়া গেলেও ২০১১ এর ১৬ই জুন একটি ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র বা কনভেনশন গৃহীত হয়। এই প্রথম অবহেলিত মানুষগুলির জন্য বিশ্বমানের চাকুরির শর্ত তৈরি হয়। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস এমনই যে এই চুক্তিপত্র গৃহীত হওয়ার অব্যবহিত পরেই আরবে এক ইন্দোনেশীয় গৃহ পরিচারিকার মাথা কেটে ফেলা হয়। কারণ সে তার বিকৃতকাম মনিবকে হত্যা করেছিল।

ভারতে ২০১১ সালে ILO গৃহীত কনভেনশনের অনুসরণে উপযুক্ত আইন আজও প্রণীত হয়নি। ১৯৮৬ সালের ২০ দফা কর্মসূচিতেও অসংগঠিত গোষ্ঠী হিসাবে গৃহপরিচারক, পরিচারিকাদের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার উদ্যোগী হয়নি। অথচ কর্নাটক, কেরল প্রভৃতি রাজ্য পরিচারকদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম পারিশ্রমিক ঘোষণা করেছে। তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্রে গৃহসহায়কদের অবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এ ব্যাপারে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

Men, Women and Domestics, Articulating Middle Class—Identity in Colonial Bengal গ্রন্থে শ্রীমতী স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মনোজ্ঞ গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সব সময়ের কাজের মহিলাগণ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির (মিথ্যা চুরির অপবাদ, অধিক ভোজনের খোঁটা প্রভৃতি) শিকার হন, প্রাধান্যকামী মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকীর্ণ রুচিবোধের দ্বারা। বর্ণ ও শ্রেণিগত ছুঁৎমার্গ গ্রামাঞ্চলে এখনও যথেষ্ট রয়েছে। পাঞ্জাবে কিন্তু এর ব্যতিক্রম নজরে আসে। সেখানে লঙ্গরে সব শ্রেণির মানুষ একত্রে আহার গ্রহণ করেন পরমানন্দে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধনের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, আমেরিকার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান MIT-তে কর্মরত সাফাইকর্মীরা নিজেদের কাজ সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপকদের সঙ্গে নানা আলোচনায় যোগ দেন। নিউইয়র্ক কোর্ট ২০১২ সালে ভারতীয় দূতাবাসের এক উচ্চপদস্থ যোগেশ মালহোত্রাকে পরিচালিকা নিগ্রহের জন্য ১৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিল। বৃটেন, আমেরিকায় এ বিষয়ে দ্রুতবিচার ও উপযুক্ত দণ্ড প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। গোটা বিশ্বজুড়ে এই প্রান্তিক মানুষদের শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে জোরদার। এদের প্রতি সদর্থক আইন প্রণয়ন করেছে সিঙ্গাপুর, জর্ডন, নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, হংকং প্রভৃতি দেশ। জাপান, ভূটান প্রভৃতি স্থানেও গৃহ পরিচারক পরিচারিকা, রন্ধনকর্মীরা তাঁদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে খাবার টেবিলে বা বসার চেয়ারে একই সঙ্গে আসন গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু ভারতে এই দৃশ্য বিরল।

রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস অবলম্বনে মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ চলচ্চিত্রে পালানের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘উপহার’, বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের ‘পুণ্যি’ গল্পেও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতার উপর গুরুত্ব রয়েছে। মালতী মাসিদের কাছে ‘নারীদিবস’ তাই অচেনা শব্দ। সামনের বছর যেন তা আর না থাকে, সেটা দেখাই আমাদের কর্তব্য।

শিক্ষিকা

Advertisement