সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সচেতনতার অভাব, দুর্বল নীতির ফলে উত্তরে বাড়ছে বন্যপ্রাণ নিধন

অরণ্যভূমি লুণ্ঠনের মতোই সাধারণ ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে বন্যপ্রাণ হত্যা। মানুষের সচেতনতা ও কড়া আইনি পদক্ষেপই পারে এটা থামাতে। লিখছেন শৌভিক রায়

Wildlife
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ধুপগুড়ির মরাঘাট ও হলদিবাড়ি চা-বাগানের সংযোগস্থলে খুন হওয়া চিতাবাঘটির নিথর দেহ আবার প্রমাণ করল যে, নিত্যদিন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কতটা বেড়ে চলেছে। শুধু চিতাবাঘ নয়, একই ভাবে মারা হচ্ছে অন্য বন্যপ্রাণীদেও। আজ থেকে কয়েকদশক আগেও উত্তরের অরণ্যঘেঁষা জনপদগুলিতে বন্যপ্রাণীদের অবাঞ্ছিত প্রবেশ ছিল না। পথ হারিয়ে কালেভদ্রে কোনও প্রাণী চলে এলেও তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু ইদানীং বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশ অত্যন্ত সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। 

এ ক্ষেত্রে চিতাবাঘটি সে অর্থে লোকালয়ে প্রবেশ না করলেও তাকে খুন হতে হয়েছে। কারণ, দুই চা-বাগানের সংযোগস্থল থেকে জনপদের দূরত্ব খুব একটা নয়। আর চিতাবাঘ গভীর জঙ্গলের বদলে চা-বাগানের হালকা গাছপালা, নির্জন পরিবেশ পছন্দ করে। কিন্তু আশ্রয় নিলেও সে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে কিছুদিন আগে ফালাকাটা-বীরপাড়া সড়কের ধারে গাড়ির ধাক্কায় আহত চিতাবাঘের কথা। যত দূর মনে পড়ছে, বন দফতর চিতাবাঘটিকে উদ্ধার না করলে সেটিও হয়তো ওখানেই নিহত হত। কারণ, তার সঙ্গে সেলফি তুলতে অতি-উৎসাহী এক যুবককে সে আহত অবস্থাতেও আক্রমণ করেছিল এবং তাকে ঘিরে থাকা জনতা ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছিল। 

কিন্তু বন্যপ্রাণীরা নিজেদের স্বাভাবিক আশ্রয় ছেড়ে বারবার জনপদে চলে আসছে কেন? উত্তর অত্যন্ত সহজ। যত দিন যাচ্ছে, উত্তরে বনভূমির পরিমাণ কমছে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্যের অভাব। এক সময় উত্তরের মোট সমভূমির অধিকাংশই ছিল বনভূমি। আজ তার পরিমাণ বহুলাংশে কমেছে। বক্সা, লাটাগুড়ি, চাপড়ামারি বা বৈকুণ্ঠপুরের মতো অরণ্যভূমি লুণ্ঠন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমল থেকেই। নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরুর দিকটায় ব্রিটিশদের চোখ সে ভাবে উত্তরের দিকে পড়েনি। ফলে, দীর্ঘদিন এই অঞ্চলগুলি বন্যপ্রাণীদের জন্য ছিল একান্ত নিরাপদ। কিন্তু অশান্তির জেরে ভুটানকে পর্যদুস্ত করতে উত্তরে এসে ব্রিটিশরা অনুভব করেছিল, এখানকার সমৃদ্ধ বনভূমি এক বিপুল ভাণ্ডার। এরপরই শুরু হয়েছিল অবাধ লুণ্ঠন। শাল, সেগুন, শিরীষ, মাদার, চিকরাশির মতো দামি কাঠ, হাতির দাঁত, গন্ডারের শিং, ব্যাঘ্রচর্ম ইত্যাদি ছিল সেই তালিকায়। ফলে, যেমন কমছিল অরণ্যের পরিমাণ, তেমনই মারা যাচ্ছিল বন্যপ্রাণী। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এরপর যোগ হয় চা-চাষ। মাইলের পর মাইল জুড়ে এক একটি চা-বাগান তৈরি করতে একরের পর একর বনভূমি কাটা হয়েছিল সেই আমলেই। ১৮৭৪ সালে জলপাইগুড়ির গজলডোবায় হাউটনের চা-বাগান দিয়ে শুরু হওয়া নিধনযজ্ঞের পরম্পরা আজও বিদ্যমান উত্তরের নানা স্থানে ছোট ছোট চা-বাগিচা নির্মাণের মধ্যে। যাঁরা চা-চাষের দিকে ঝুঁকে অরণ্যভূমি ধ্বংস করে বাগিচা নির্মাণ করছেন, তাঁদের সে ভাবে দোষারোপ করা যাচ্ছে না। কারণ, উত্তরে বিকল্প আয়ের উৎস সে ভাবে নেই বললেই চলে। আবার দেশভাগের ফলে বনভূমির অনেকটা চলে গিয়েছিল ওপার থেকে আসা শরণার্থীদের দখলে। ডুয়ার্স-সহ উত্তরের নানা জায়গায় বন কেটে বসত গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পর নানা ভাবে বনভূমি সংরক্ষণের চেষ্টা চললেও তা যথেষ্ট ছিল না। ফলে, একটা সময় পর্যন্ত কাঠমাফিয়া, চোরাশিকারীদের অবাধ দৌরাত্ম্য চলেছে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। হু-হু করে কমেছে বনভূমি-সহ বন্যজীবের খাদ্যের পরিমাণ।

আজও অবস্থাটা পাল্টায়নি। বনজ সম্পদের লোভে চোরাগোপ্তা আক্রমণ এখনও চলছে। উত্তরের বনভূমির আশেপাশের জনপদগুলিতে একটু চোখ-কান খোলা রেখে চললে বন্যপ্রাণীর টাটকা মাংস পাওয়াটা এখনও দুষ্কর নয়। কয়েকদিন আগে চিতাবাঘ মেরে মাংস খাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করেছিল যে, আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই রয়েছি। খাতায়-কলমে সাক্ষরতার হার বাড়লেও সচেতনতার দিক থেকে আমরা আজও অনেক পিছিয়ে। জঙ্গল সাফারিতে গিয়ে হইচই, ডিজে বাজিয়ে জঙ্গলের ধারে পিকনিক, নদীর পাড়ে অবাধে আবর্জনা ফেলা এবং সর্বোপরি বৃক্ষনিধন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, বন্যপ্রাণীদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অরণ্যে খাদ্যের যে আকাল সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে রক্ষা পেতে তারা লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। শিলিগুড়ির মতো জনবহুল শহরেও হাতি প্রবেশ করছে। বনভূমি লাগোয়া জনপদ বা উত্তরের ছোট ছোট শহরগুলিও রক্ষা পাচ্ছে না। আর কোনও কারণে বন্যপ্রাণের প্রবেশ ঘটলে বন দফতর ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। পিটিয়ে মারা হচ্ছে প্রাণীটিকে। 

বনভূমি ও বন্যপ্রাণ নিধন ঠেকাতে নানা আইন রয়েছে। সচেতনতার পাশাপাশি সেই সব আইনের উপযুক্ত প্রয়োগের অভাব এই জাতীয় ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। আজ অবধি বন্যভূমি ও বন্যপ্রাণ নিধনের জন্য দোষী ব্যক্তিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়নি। আইনের ফাঁক গলে রেহাই পেয়ে গিয়েছে অন্যায়কারীরা। বন দফতরের অবস্থাটা কার্যত ঢালহীন নিধিরাম সর্দারের মতো। বন পাহারার জন্য প্রহরীদের হাতে যে অস্ত্র দেওয়া হয়, তা মান্ধাতার আমলের। তা ছাড়াও সামান্য সংখ্যক প্রহরীর পক্ষে সম্ভব হয় না ঠিক ভাবে জঙ্গল সামলানো। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্যপ্রাণীটিকে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচানোও তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে, দৈবাৎ লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্যপ্রাণীটি প্রাণ হারাচ্ছে। হয়তো তার আগে আত্মরক্ষার্থে সে কারও প্রাণ নিচ্ছেও। সংঘাত চলছেই।

আইনের ঠিকঠাক প্রয়োগ, সচেতনতা, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। বনভূমি ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য শুধু আলোচনা সভার আয়োজনকরা নয়,  দরকার হাতেকলমে কাজ করা। তা না হলে এই সংঘাত বাড়তেই থাকবে আর তার ফল ভুগতে হবে সকলকেই।

(লেখক কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন