কর্নাটক বিধানসভার ঘটনা ইতিমধ্যে একটু পিছনে চলে গিয়েছে। কিন্তু তাই বলে সে ঘটনার গুরুত্ব ভুলে যাওয়া যাবে না। কংগ্রেস আর জেডি(এস)-এর বিধায়করা একসঙ্গে দল ছাড়লেন, ফলে এইচ ডি কুমারস্বামীর জোট সরকার ভূপতিত হল। চতুর্থ বারের জন্য ক্ষমতায় এলেন বি এস ইয়েদুরাপ্পা। রিসর্ট রাজনীতি, ঘোর সন্দেহজনক অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া— যে অস্বাভাবিকতাগুলো এখন ভারতীয় রাজনীতির ‘স্বাভাবিক’ অঙ্গ হয়ে উঠেছে, সবই দেখা গেল কর্নাটকে। সেই ‘স্বাভাবিকতা’র পাশাপাশি বিধানসভার স্পিকার কে আর রমেশ কুমারের ভূমিকার কথাও মাথায় রাখা দরকার। তিনি যে সংবিধানের কিছু বিশেষ ফাঁককে ব্যবহার করে বিদ্রোহী বিধায়কদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে ইচ্ছে করেই দেরি করছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। শেষ অবধি সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হল। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এটা শুধু কর্নাটক বিধানসভার কোনও এক জন বিশেষ স্পিকারের প্রশ্ন নয়— স্পিকার পদটির এমন কিছু ক্ষমতা আছে যে দেশের যে কোনও রাজ্যে এ হেন কুনাট্যের মূল কুশীলব হয়ে উঠতে পারেন স্পিকাররা।  

প্রথম কথা হল, স্পিকার এক জন আদ্যন্ত রাজনৈতিক মানুষ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শাসক দলের নির্বাচিত বিধায়ক। কাজেই, সংবিধান তাঁর কাছে যে নিরপেক্ষতাই দাবি করুক না কেন, বহু ক্ষেত্রেই স্পিকাররা দলীয় আনুগত্যের প্রশ্নটিকে তার ওপরে ঠাঁই দেন। কারণ সহজ— অন্যদের মতোই তাঁকেও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে হবে। কাজেই, দলের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার ঝুঁকি নেওয়া স্পিকারের পক্ষে কঠিন।  

সংবিধান বিধানসভার স্পিকারের ওপর প্রচুর দায়িত্ব দিয়েছে। যেমন, সংবিধানের ১৯০(৩)(খ) ধারায় স্পিকারকে অধিকার দেওয়া হয়েছে, যদি মনে করেন যে পদত্যাগী বিধায়কের সিদ্ধান্তটি স্বতঃপ্রণোদিত বা আন্তরিক, একমাত্র তখনই তিনি পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করবেন। আবার, যথেচ্ছ দলত্যাগ, ঘোড়া কেনাবেচার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালে সংবিধানে দশম তফসিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়— যা দলত্যাগবিরোধী আইন হিসেবে পরিচিত। তাতে বলা হয়েছে, দু’ধরনের পরিস্থিতিতে দলত্যাগের কারণে কোনও বিধায়কের সদস্যপদ খারিজ হতে পারে— এক, যদি তিনি স্বেচ্ছায় নিজের দলের সদস্যপদ ছেড়ে দেন; দুই, যদি তিনি দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করেন। ১৯৯৪ সালের রবি নায়েক মামলা ও তার পরে একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ‘স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ’ ছেড়ে দেওয়ার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা করেছে। শীর্ষ আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু দলে পদত্যাগপত্র পাঠানোই নয়, কোনও বিধায়কের আচরণ যদি দলবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তাকেও স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ ছাড়ার সমতুল বলেই বিবেচনা করা হবে। 

দ্বিতীয় ক্ষেত্র, অর্থাৎ দলের নির্দেশ অমান্য করার ব্যাখ্যাও স্পষ্ট— দলের জারি করা হুইপ অমান্য করলে তা বিধায়কপদ খারিজ হওয়ার যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংবিধানের দশম তফসিল অনুসারে, কোনও বিধায়ক দলবিরোধী আচরণ করছেন কি না, এবং সেই কারণে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হবে কি না, তা নির্ধারণের চরম অধিকার স্পিকারের। কাজেই, কোনও বিধায়কের কার্যকলাপ ‘স্বেচ্ছায় দলত্যাগ’-এর সমতুল হবে কি না, তা স্থির করবেন স্পিকার। আবার, কোনও বিধায়ক যদি দ্ব্যর্থহীন ভাবে দলের হুইপ অমান্য করেন, বিধানসভায় দলের লাইনের বিপ্রতীপে গিয়ে ভোট দেন, তবে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজ করার অধিকারও স্পিকারেরই হাতে। 

এই প্রশ্নগুলিতে স্পিকারের ক্ষমতা কোয়েজ়াই-জুডিশিয়াল ট্রাইবুনালের সমতুল। সংবিধানের দশম তফসিলে প্রাথমিক ভাবে বলা হয়েছিল, এই ক্ষেত্রগুলিতে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা যদি স্পিকারের সিদ্ধান্তের বিপরীতে যায়, তবুও স্পিকারের সিদ্ধান্তই চরম বলে গণ্য হবে, এবং তার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট, এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করা যাবে না। ১৯৯২ সালের কিহোতো হোলোহান মামলার রায়ে এই অবস্থানটি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু, তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, স্পিকার সিদ্ধান্ত করতে কত দিন সময় নিতে পারেন, সংবিধানে তার কোনও সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। এখানেই শুরু হয় আসল খেলা। 

বিরোধী বিধায়করা দল পাল্টে শাসক দলে যোগ দিচ্ছেন— হয় দলের ঘোষিত নীতির তোয়াক্কাই করছেন না, বা দলের অবস্থানের বিপ্রতীপে ভোট দিচ্ছেন— এবং, সেই অপরাধে তাঁদের বিধায়ক পদ খারিজ হবে কি না, তা স্থির করতে অনন্তকাল সময় নিচ্ছেন স্পিকার, এমন ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কাজটা দলত্যাগ হিসেবে শাস্তিযোগ্য কি না, সংশ্লিষ্ট বিধায়কের সদস্যপদ খারিজ হবে কি না, তা স্থির করতে স্পিকার কোনও কোনও ক্ষেত্রে এতই সময় নিচ্ছেন যে বিপাকে পড়া সরকার বেঁচে যাচ্ছে। কখনও নিতান্তই কান ঘেঁষে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার স্পিকার বিদ্যুৎগতিতে খারিজ করে দিচ্ছেন বিধায়কের পদ— যখন সংশ্লিষ্ট বিধায়ক শাসক পক্ষ থেকে সরে এসে হাত মেলাচ্ছেন বিরোধী দলের সঙ্গে। একই ঘটনায় স্পিকারের দু’রকম অবস্থানের ব্যাখ্যা কোথায়? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সংবিধানে থেকে যাওয়া কিছু ফাঁক ব্যবহার করছেন স্পিকাররা। এবং, সেটা করছেন দলনির্বিশেষেই।

পশ্চিমবঙ্গের কথাই ধরি। তৃণমূল জমানায় কংগ্রেস এবং সিপিআইএম থেকে বেশ কিছু বিধায়ক বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের পূর্বতন দল থেকে ইস্তফা দিয়ে তৃণমূলে শামিল হয়েছেন, আর কেউ বা পূর্বতন দলে থাকাকালীনই ২১ জুলাই বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। কাকতালীয় ভাবে, এঁদের কারও বিরুদ্ধে এত বছরে দলত্যাগবিরোধী আইন অনুসারে পদক্ষেপ করা হয়নি। মানস ভুঁইয়া যেমন। একদা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এই প্রবীণ নেতা যখন ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের পতাকা তুলে নিলেন, তখন কিন্তু তিনি কংগ্রেসের বিধায়ক। যখন কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা আব্দুল মান্নান তাঁর বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে দলত্যাগবিরোধী আইনে পদক্ষেপ করার আর্জি জানান, তখন ভুঁইয়া দাবি করেন যে তিনি কংগ্রেসেই আছেন। সেই তিনিই ২০১৭ সালে সবংয়ের বিধায়ক পদ ত্যাগ করে তৃণমূলের মনোনয়নে রাজ্যসভার সাংসদ হলেন। স্পিকারের রুলিং কিন্তু শেষ অবধি এসে পৌঁছয়নি। 

কর্নাটকের প্রসঙ্গে ফিরি। স্পিকার গোড়ায় বিদ্রোহী বিধায়কদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে গড়িমসি করছিলেন। সম্ভবত তাঁর আশা ছিল যে সংশ্লিষ্ট দলগুলি হুইপ জারি করবে, এবং তার ফলে এই বিধায়করা দলবিরোধী কার্যকলাপের জেরে বিধানসভা থেকে বহিষ্কৃত হবেন। সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তে জল গড়াল অন্য দিকে। শীর্ষ আদালত জানাল, কোনও বিধায়ক চাইলে আস্থাভোটে ভোট না-ও দিতে পারেন। বলা যেতে পারে, শীর্ষ আদালতের এই অবস্থান এইচ ডি কুমারস্বামী সরকারের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল। শেষ অবধি সরকার পড়ে গেল। কিন্তু, স্পিকার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে রমেশ কুমার জানালেন, তিনি বিদ্রোহী বিধায়কদের বহিষ্কার করছেন, এবং চলতি বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অবধি তাঁরা বহিষ্কৃতই থাকবেন। অর্থাৎ, তাঁদের বিধায়ক পদ খারিজ হওয়ার ফলে বিধানসভায় তাঁদের যে আসনগুলি খালি হল, তার উপনির্বাচনেও এই বিধায়করা প্রার্থী হতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তের ঔচিত্য নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন আছে। শীর্ষ আদালতকে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। 

কিন্তু, এই কুনাট্য আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বিধানসভায় নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে থেকেই স্পিকারকে বেছে নিতে হবে। এবং, শাসক দল বা জোট যে হেতু সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে সেই দল বা জোট থেকেই স্পিকার নির্বাচিত হবেন, সেটাও সংশয়াতীত। কিন্তু প্রশ্ন হল, স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি এ রকম হলে কি স্পিকারকে এমন পক্ষপাতপূর্ণ আচরণ করতেই হবে? স্পিকার কোনও বিধায়কের সদস্যপদ খারিজ করলে বা সুনির্দিষ্ট সময়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করলে দেশের শীর্ষ আদালতের কি সেই সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা করে দেখা উচিত? যদি দেখা যায় স্পিকারের সিদ্ধান্তটি নিরপেক্ষ ছিল না, অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দুষ্ট ছিল, সিদ্ধান্তটির পিছনে কোনও অসদুদ্দেশ্য ছিল, তবে কি আদালতের সেই সিদ্ধান্তটি নাকচ করে দেওয়াই উচিত? না কি, এই ক্ষেত্রে বিধায়ক পদ খারিজ করা না-করার সিদ্ধান্তটি স্পিকারের পরিবর্তে কোনও নিরপেক্ষ ট্রাইবুনালের ওপর ন্যস্ত হওয়া বিধেয়? এমন ট্রাইবুনাল, যার কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ নেই, এবং যাবতীয় প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যাচাই করে তা দ্রুত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছবে। ভারতে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মডেলটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর নির্ভর করছে।

লেখক ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস-এ আইনবিদ্যার শিক্ষক