কার্ল মার্ক্স বলেছেন?
জয়ন্ত ঘোষাল (‘বিরোধীরা দেখে শিখুন’, ২৪-৫) অমিত শাহের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থনে কার্ল মার্ক্সের ‘বলা’ বক্তব্যটির যে প্রয়োগ করেছেন, তা দেখে হতভম্ব হলাম। যেমন, ‘প্রেম ও যুদ্ধে নৈতিকতার প্রশ্ন তো অপ্রাসঙ্গিক। কার্ল মার্ক্সও তো বলেছেন, উচিত লক্ষ্যের জন্য রক্তক্ষয়ী হিংসার উপায়ও গ্রহণীয়।’ উচিত লক্ষ্য ও যেন-তেন উপায়ে সেই লক্ষ্য সাধনের ধাঁচায় মার্ক্স-এর উপযুক্ত বক্তব্যটি মার্ক্স-এঙ্গেলস’এর ৫০ খণ্ডের রচনাবলির ঠিক কোন লেখাটিতে পাব, সেটি জানতে পারলে বাধিত হব।
সরাসরি পঠনীয় বাক্যবিন্যাসের পরিবর্তে এই মার্ক্সীয় ঘোষণাটি লেখকের নিজের পাঠসিদ্ধান্তও হতে পারে, তবে সিদ্ধান্তটি একেবারে ভ্রমাত্মক। মার্ক্সের বক্তব্যে, হিংসার চরিত্র সার্বিক রাজনৈতিক কাঠামোগত, নিছক আদর্শ ও কৌশলী উপায়ের সাধ্যসাধনের উপর নির্ভরশীল নয়। যে কোনও রাষ্ট্রই সামগ্রিক ভাবে ‘এক শ্রেণি দ্বারা অন্য শ্রেণিকে দমিয়ে রাখার সংগঠিত ক্ষমতাতন্ত্র মাত্র (অর্গানাইজড ইউজ অব ফোর্স)’, তাই রাষ্ট্রের সার্বিক উচ্ছেদ ছাড়া বিপ্লব সম্ভব নয়। (দ্রষ্টব্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো)। এই বৈপ্লবিক উচ্ছেদের আকারপ্রকার প্রসঙ্গে স্বচ্ছ ধারণা পারি কমিউন-এর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে মার্ক্স-এঙ্গেলস তৈরি করেন, সার্বিক গণঅভ্যুত্থানের অবয়বে ও উপাদানে সেই হিংসাত্মক উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রচিন্তা নির্ধারিত। ‘গডফাদারি’ স্টাইল বা প্ররোচনার কাঠি দেওয়া দাঙ্গা বাঁধানোর হিংসার কোনও স্থানই মার্ক্সীয় তত্ত্বে নেই। নিছক সন্ত্রাসবাদী সুপ্ত কৌশলকে মার্ক্স নিজে আদ্যন্ত অপছন্দ করতেন। এই চিঠিতে মার্ক্সের রাজনৈতিক তত্ত্বের যাথার্থ্য বিচার আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু বক্তব্য এই যে, রাষ্ট্র ও ইতিহাসের বিবর্তনের মার্ক্সীয় আখ্যানে হিংসার ভূমিকার মাত্রা একেবারে স্বতন্ত্র, কৌশলী প্রকরণমাত্র নয়।
যত দূর পড়েছি, ‘বাস্তববাদী’ অমিত শাহ মহাশয়ের নিজস্ব লক্ষ্য সীমিত। কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ারও কোনও এক সময়ে আমার মতো ছাপোষা লোকেদের হাতে ‘অচ্ছে দিন’-এর লবেনচুস ধরানোর উদ্দেশ্যে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। তাই তাঁর ‘গদ্যময় রাজনীতি’র প্রশংসায় গাঁধী বা মার্ক্সের মতো আদর্শবাদীদের তুলনা না টানাই ভাল।
গৌতম ভদ্র কলকাতা-৩২
আবার মেয়ে!
আমি ডাক্তারির ছাত্র। গত সপ্তাহে একটা কাজে আমি তখন সবে লেবার রুমে ঢুকছি। এক ভদ্রলোক লেবার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় বললেন, ‘আমার বউ ভেতরে, মেয়ে হয়েছে না ছেলে হয়েছে যদি একটু জানতে পারতাম...’ ঠিক তখনই দেখি সিস্টার-দিদি এক সদ্যোজাতকে নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। ভদ্রলোককে দেখে বললেন, ‘আপনার মেয়ে হয়েছে, আর আপনার স্ত্রী ঠিক আছেন।’ লক্ষ করলাম ভদ্রলোকের মুখটা পাংশুবর্ণ হয়ে গেল আর পাশের ভদ্রমহিলা তত ক্ষণে মাটিতে বসে পড়ে বলছেন, ‘এ বারেরটাও মেয়ে হল রে সনাতন! আমার ভাগ্যে বোধ হয় আর নাতির মুখ দেখা লেখা নেই। এমন বউ আনলি, একটা ছেলের জন্ম দিতে পারল না মুখপুড়ি!’
ঋতুচক্র একটি নারীদেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। অথচ অশিক্ষা আর কুশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা ভারতে এই স্বাভাবিক এবং অনিবার্য নিয়ম এক অস্বাভাবিক ট্যাবুতে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে কন্ডোম ট্যাক্স-ফ্রি কিন্তু স্যানিটারি ন্যাপকিনে ট্যাক্স দিতে হচ্ছে ১৪.৫%। একে মেয়ে হয়ে জন্মানোর বিড়ম্বনা ছাড়া আর কী-ই বা বলব!
প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস ক্যামেরন ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডে ট্যাম্পন ট্যাক্স-ফ্রি করে দেন। কিন্তু ব্রেক্সিট সমস্যার জন্য সেটার বাস্তব রূপায়ণ এখনও হয়নি। রূপায়িত না হলেও, অন্তত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এ হেন পদক্ষেপকে কুর্নিশ করি। ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হয়েছে অনেক আগে, কিন্তু আজও এ দেশে এক জন নারীকে তার নারীত্বের জন্য ট্যাক্স দিতে হত না।
লেবার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ওই ভদ্রমহিলা ঠিকই বলেছিলেন বোধ হয়। যেখানে নারীত্বকে পয়সা দিয়ে কিনতে হয় সে দেশে মেয়ে হয়ে না জন্মানোই ভাল।
প্রীতম মণ্ডল কলকাতা-১৪
গিনিপিগ
কেন্দ্রীয় স্কুল শিক্ষা সচিব অনিল স্বরূপ জানিয়েছেন, কোনও রাজ্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল প্রথা পুনরায় চালু করতে চাইলে কেন্দ্র আপত্তি করবে না।
আমাদের রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দিয়ে শিক্ষার যে অন্তর্জলি যাত্রার সূচনা করেছিল আজ তা আরও প্রসারিত হয়েছে। কেন্দ্রে বিগত ইউপিএ সরকার রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট ২০০৯-এর মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পর্যন্ত পাশফেল প্রথা তুলে দিয়ে শিক্ষার নিচুতলার ভিত আরও নড়বড়ে করে দিয়েছিল।
শিক্ষার এই অবনমন নিয়ে দেশ ও রাজ্যগুলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন প্রতিবাদের ঝড় উঠল তখন নানান কমিশন ও পর্যালোচনা শুরু হল। ঘোষণা করা হল পাশফেল প্রথা ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু কথাই সার। বাস্তবে তার জন্য কোনও কার্যকর পদক্ষেপ দীর্ঘদিন গ্রহণ করা হয়নি। আজ কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব যে কথাটি মুখে বললেন তা কবে বাস্তবায়িত হয় সেটাই দেখার।
একটার পর একটা প্রজন্ম কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই রকম খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের বলি হচ্ছে কেন? ১৯ বছর পর বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিকে ইংরাজি ফিরিয়ে দিয়ে তাদের ভুল স্বীকার করেছিল। কেন এ ভাবে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বার বার গিনিপিগ করা হচ্ছে? কথার কথা নয়, আইন দিয়েই গোটা দেশের সঙ্গে আমাদের রাজ্যে এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে শিক্ষার ভিত মজবুত করা হোক।
তবে শিক্ষায় আজ শুধু পাশফেল প্রথা চালু হয়ে গেলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটে যাবে— এ কথা মনে করার কোনও কারণ নেই। কেন না, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রক্রিয়াতেই ফেল না করানোর প্রক্রিয়া আদতে শুরুই হয়ে গিয়েছে। পাশফেল প্রথা পুনরায় চালু হলেও তার কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে তা সন্দেহের। এখন যেভাবে নতুন সিলেবাস এবং প্রশ্নপত্রের ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে না বুঝেই এক জন পরীক্ষার্থী হেলায় পাশ নম্বর পেয়ে যাবে। কারণ, নতুন নিয়মে বিদ্যালয়গুলিতে বর্তমানে ফর্মেটিভ বা প্রোজেক্ট ওয়ার্কের নামে ১০ নম্বর পাইয়ে দেওয়ার রীতি চালু হয়ে গিয়েছে।
এ ছাড়া শুধু মাধ্যমিকেও প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১০ নম্বর প্রোজেক্ট ওয়ার্ক। বাকি ৯০ নম্বরের মধ্যে কয়েক নম্বর বাদ দিলে বাকি নম্বরের বিরাট অংশ ঠিক দাগ অথবা এক কথার উত্তর দিলেই পুরো নম্বর। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশ নম্বর তোলার জন্য বিশেষ পড়াশোনার কোনও প্রয়োজন নেই। তার উপর ছোট প্রশ্নের আধিক্য বাড়ার ফলে ‘হল ম্যানেজ’ বা টোকাটুকির প্রবণতাও বাড়ছে। এখন ফেল করাটাই কষ্টের! তেমন কিছু না জানলেও সবাই পাশ করে যাবে। ঘুরিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশফেল প্রথা তো তুলেই দেওয়া হল।
আসলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারগুলি শুধু সার্টিফিকেট দিতে চায়। প্রকৃত শিক্ষার গুরুত্বকে একটু একটু করে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা কতটা পেল তা জরুরি নয়, পাশ করানোটাই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোয়ালিটি নয়, কোয়ানটিটিটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ে যায় সাহিত্যিক লিয়ো তলস্তয়ের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের অজ্ঞতাই সরকারের শক্তির প্রধান উৎস। সরকারও এটা জানে বলেই সে সর্বদাই যথার্থ শিক্ষা বিস্তারের বিরোধিতা করে। আজ এই সত্যটা বুঝতে হবে। সরকার অজ্ঞতার অন্ধকারও সৃষ্টি করবে, আবার একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ঘটাতে সচেষ্ট এমন ভাব দেখাবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।’ তাই পাশফেল প্রথা চালুর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নটাও জরুরি।
কিংকর অধিকারী বালিচক, পশ্চিম মেদিনীপুর
চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।
ই-মেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়