Advertisement
E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু

বিশ্ব জুড়ে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশের মতো আবেগে উদ্বেল না হলেও কলকাতাও নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে।

শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০১৭ ০০:০২

লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়

সংগ্রামী: বাংলা ভাষার দাবিতে রেল রোকো বিক্ষোভ, শিলচর, ১৯৬১

বিশ্ব জুড়ে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশের মতো আবেগে উদ্বেল না হলেও কলকাতাও নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে। কিন্তু এ বছর ১৯ মে শিলচরে বরাক উপত্যকার ভাষা শহিদ দিবস উদযাপনের যে ছবি দেখে এলাম, তা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে স্মৃতিতে সঞ্চিত হয়ে থাকবে।

Advertisement

গরিষ্ঠ বাংলাভাষী মানুষের মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিয়ে অসমিয়া ভাষা চালু করার প্রতিবাদে বরাক উপত্যকা উত্তাল হয়েছিল ভাষা আন্দোলনে। ১৯৬১-র ১৯ মে শিলচরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে ঝরে যায় কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য-সহ এগারোটি প্রাণ। ক্রমে বরাকে বাংলাভাষার স্বীকৃতি আসে।

বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার শিলচর তাই ১৯ মে পালন করে ভাষাশহিদ দিবস, ‘অমর উনিশ’। দেখে এলাম কী ভাবে শিলচরের নবীন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা স্মরণ করছে দিনটিকে। এই উপলব্ধিটাই আরও জোরালো হল যে, বাংলা ভাষাটা সত্যিই এই বঙ্গে বড় উপেক্ষিত। ভাষা নিয়ে আবেগ ও পার বাংলায় আছে, এটা জানা। কিন্তু মাতৃভাষা নিয়ে একই আবেগ শিলচরের মানুষও যে এই ভাবে ধারণ করে আছেন, ওখানে না গেলে বুঝতাম না। ভাষাশহিদদের স্মরণস্তম্ভ ঘিরে, গাঁধীবাগে ভস্মাধার-সংরক্ষিত স্মৃতিমন্দির প্রাঙ্গণে, শিলচর শ্মশানে ভাষাশহিদদের শেষকৃত্যের স্থানটি ঘিরে সবার, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের এই আবেগঘন শ্রদ্ধা অকল্পনীয়। উনিশের সন্ধ্যায় সব বাড়ি আর দোকানের সামনে এগারোটি করে মোমবাতি/দীপ জ্বালিয়ে একাদশ ভাষাশহিদকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে গোটা শহর, ভাবা যায়! শিলচরের ‘ভাষা শহিদ স্টেশন শহিদ স্মরণ সমিতি’র লড়াই আজও জারি। শিলচর স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহিদ স্টেশন, শিলচর’ নামকরণ অবশ্য এখনও ছাড়পত্র পায়নি।

পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে আমার প্রশ্ন, হিন্দি বা ইংরেজি প্রয়োজনের ভাষা, অস্বীকার করি না। কিন্তু তাদের পিছনে ছুটতে গিয়ে যখন এখানে মাতৃভাষার চরম দীনতা ডেকে আনতে দেখি, পশ্চিমবাংলার মানুষ হিসেবে মাথা হেঁট হয়। বাংলাদেশ বা শিলচরে ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে, লড়াই করে মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে হয়েছে। এই রক্তপথ আমাদের পেরোতে হয়নি, তাই কি নিজের ভাষাকে এমন অবজ্ঞা করার মানসিকতা আমাদের?

সুমন চক্রবর্তী মাহেশ, শ্রীরামপুর, হুগলি

মাতৃভাষা় রক্ষা

স্বাধীন ভারতে জাতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি ও কাজের ভাষা হিসাবে ইংরাজির প্রভাবে আঞ্চলিক ভাষাগুলির অস্তিত্ব সত্যিই বিপন্ন। আঞ্চলিক ভাষা ধ্বংসের পিছনে হিন্দি সিনেমার প্রভাবও মারাত্মক। ভাষার রাজনীতিতে অসাম্য দানা বাঁধছে। শিক্ষিত অতি-সচেতন স্বচ্ছল অভিভাবকেরা সন্তানদের ইংরাজি মাধ্যম স্কুলিং ব্যবহার করে নিরাপদ কেরিয়ার গড়ে দিতে চান। এবং এই লাভ-লোকসানের অঙ্কে তাঁরা সফলও। তাঁদের এই সফলতা জাতির পক্ষে চূড়ান্ত ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করে। কেননা একটা জাতির পরিচয় বুদ্ধিচর্চায়, সৃষ্টিতে, আবিষ্কারে, নিছক যন্ত্রবৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় কিংবা অর্থনৈতিক উপার্জনে নয়। যাঁদের অবদানে এই সভ্যতার সংস্কৃতি সমৃদ্ধ, সেই শিকড়কে না জেনে, উন্নত জ্ঞানচর্চার শরিক না হয়ে, জাতি হিসাবে বিশ্বে আলোকিত হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ, মাতৃভাষাকে বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে যে কোনও ভাষাতেই শ্রেষ্ঠ কিছু গড়ে উঠলে তার রসাস্বাদনে রসিকেরা ছুটে আসবেই। তাই সৈনিকেরা যেমন অতন্দ্র প্রহরায় দেশ রক্ষা করে, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে নাগরিকদের তেমনই সচেতন ভূমিকা থাকা উচিত। বর্তমান সরকার স্কুলশিক্ষায় বাংলাকে আবশ্যিক করে আমাদের ধন্যবাদার্হ।

দু-একটি কথা। প্রথমত, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভাষা-পাঠটা যাতে আনন্দদায়ক ও হৃদয়গ্রাহী হয়, সেটা দেখতে হবে। রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ কবির দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ের চর্চার ফসল। সহজ ভাষায় ও ছন্দে বাংলা ও ইংরাজি বইয়ের অভাব এখন খুব বেশি। দ্বিতীয়ত, ভাষা-শিক্ষায় উপযুক্ত যোগ্য শিক্ষকের অভাব। শিক্ষকের উপস্থিতিতে ক্লাস-রুমের পরিবেশ যাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে, শেখার পরিবেশা যাতে আরও মজাদার হয়ে ওঠে, তাও দেখতে হবে। তৃতীয়ত, ভাষার প্রয়োগের পরিসর বাড়াতে হবে। স্কুলের দেওয়াল-পত্রিকা, ম্যাগাজিনে শিশুরা নিজেদের লেখা দেখলে সব থেকে খুশি হয়। কিন্তু আজকাল শুধুই পড়ার চাপে ধ্বংস হচ্ছে নান্দনিক সংস্কৃতি। এই পরিবেশ শিশুর ভাষাচর্চায় সহায়ক নয়।

উত্তম ভৌমিক চন্দ্রামেড়, ধলহরা, তমলুক

শুধু চাকরির জন্য

বাংলা বলতে না পারা বা বাংলা না জানা সত্যিই আজকের দিনে একটা ফ্যাশন বা স্টাইল স্টেটমেন্ট! আসলে এর জন্য দায়ী একধরনের নব্য ইংরেজিনবীশ মানসিকতা, যা বিদেশি ‘গ্ল্যামার’-এর মোহে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে ভালবাসে। এটা একটা মানসিকতা। তাই বলতে হয়, ‘বঙ্কিম ইজ গুড, বাট আই ডোন্ট অ্যাকচুয়ালি প্রেফার বেঙ্গলি নভেলস দ্যাট মাচ!’ বাবা-মায়েরা আরও এক কাঠি চড়িয়ে বলেন, ‘বাংলা পড়ে কী হবে?’ ‘ইংরেজি আজকের দিনে বিশ্বভাষা, ইংরেজি না শিখলে চলবে কেন?’ বিশ্বভাষা শেখার সঙ্গে মাতৃভাষা শেখার বিরোধটা কোথায়, তা এখনও আমরা জানি না। তবু দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে তাঁরা ছেলেমেয়েদের হিন্দি নিতে উৎসাহিত করছেন, কারণ হিন্দি নাকি ‘রাষ্ট্রভাষা’। হিন্দি কবে কোন কালে ভারতের ‘রাষ্ট্রভাষা’ হল, তাও আমাদের জানা নেই। তবে কথাটা ধরতে আমাদের অসুবিধে হয় না। ইংরেজি-হিন্দি পড়লে চাকরি পেতে সুবিধে হবে! সেই উনিশ শতকের পুনরাবৃত্তি। ইংরেজরাও প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তৈরি করেছিল ইংরেজিনবীশ কেরানি তৈরির জন্যই, পরে বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায় হিন্দু কলেজ তৈরির কথা বিচারপতি হাইড ইস্টকে জানালে ইংরেজরা তাতে সায় দিয়েছিল, কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল ওই একটাই, কেরানি তৈরি করা। আজকেও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ভাষা-শিক্ষার উপযোগিতা আটকে আছে কেরানিগিরি করার মধ্যেই। ইংরেজিতে যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা রাজা উজির মারেন, তাঁরা ক’জন ডিকেন্স, ডি এইচ লরেন্স, হার্ডি, কিটস, ব্রন্তে বা মার্ক টোয়েন পড়েছেন? খেয়াল করে দেখেছি, তাঁদের ইংরেজি বলার মধ্যেও একটা খিচুড়িপনা থাকে।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ওড়িয়া ভাষা যে কারণে ‘ক্লাসিকাল’ বা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা পেল, সেই চর্যাপদের ভাষা যে মুখ্যত বাংলা, তা ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বহু আগেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া সুবোধবাবুর বক্তব্যের সঙ্গে অন্তত দুটো কথা যোগ করে যাই (‘বাংলার চাই ধ্রুপদী মর্যাদা’, ২১-৫)। প্রথমত, আজকে এই সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখার সুবাদেই সম্ভবত ইংরেজির তুলনায় বাংলার কদরও ঊর্ধ্বমুখী। বিভিন্ন সুলভ সফটওয়্যার দিয়ে বাংলা লেখার সুবিধে বহু ইংরেজিনবিশকেও বাংলা লিখতে উৎসাহিত করছে। ভুল বানান বা ব্যাকরণগত খামতি নিয়েও তাঁরা বাংলা লিখছেন বা লেখার চেষ্টাটুকু করছেন। দ্বিতীয়ত, শুধু ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা নিয়ে ‘টেগোর চেয়ার’ বসালেই হবে না, দৈনন্দিন কার্যে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তবেই সর্বস্তরে বাংলার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বাংলাকে স্কুল স্তরে বাধ্যতামূলক করে মুখ্যমন্ত্রী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছেন। তাঁর কাছে অনুরোধ, সম্ভব হলে মুখ্যমন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টগুলিও দ্বিভাষিক করা হোক। ইংরেজি থাকুক, সঙ্গে থাকুক বাংলাও।

সৌরদীপ চট্টোপাধ্যায় কলকাতা-৫৫

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy