‘ছবি লেখার কারিগর’ (পত্রিকা, ১-১২) নিবন্ধটিতে অবনীন্দ্রনাথের ব্যক্তিসত্তা ও শিল্পীসত্তা নানা মাত্রায় ধরা পড়েছে। পরিসরের সীমাবদ্ধতায় তাঁর ছবির ধারাবাহিক বিবর্তন নিয়ে হয়তো বিস্তৃত আলোচনা করতে পারেননি লেখক। সে সম্পর্কে দু’একটি কথা যোগ করার জন্য এই চিঠি।

অবনীন্দ্রনাথই ছিলেন সেই প্রথম পথিকৃৎ শিল্পী, ভারতের চিত্রকলায় যিনি নবজাগরণ এনেছিলেন। দেশীয় ও প্রাচ্য ঐতিহ্যের বিস্তারে গড়ে তুলেছিলেন নব্য-বঙ্গীয় বা নব্য-ভারতীয় ধারা। এই প্রাচ্য-চেতনার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ইংরেজ শিল্পী ও তাত্ত্বিক ই বি হ্যাভেলের। হ্যাভেল কলকাতায় গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট হয়ে এসেছিলেন ১৮৯৬ সালে। ১৮৯৭-তে অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এর আগেই অবশ্য অবনীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাধাকৃষ্ণ’ চিত্রমালা শেষ করেন, যা থেকে, বলা যেতে পারে নবজাগরণের সূচনা। হ্যাভেলের অনুরোধেই অবনীন্দ্রনাথ আর্ট স্কুলের উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেন ১৯০৫-এ।  তাঁদের যৌথ উদ্যোগ নব্য-ভারতীয় ঘরানার উন্মেষে সহায়ক হয়েছিল।

‘ভারতমাতা’ ছবিটির কথা এ লেখায় এসেছে। কিন্তু তারিখটি অনুল্লিখিত। ছবিটি প্রথম এঁকেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ১৯০২ সালে। তখন নাম ছিল ‘বঙ্গমাতা’। ১৯০৫-এ স্বাদেশিকতার আবহমণ্ডলে এই ছবির নতুন নাম হয় ‘ভারতমাতা’। এই ছবির যে প্রকরণ, জাপানি ওয়াশ পদ্ধতি, তার সঙ্গে যোগ আছে প্রখ্যাত জাপানি মনীষী ওকাকুরা-র কলকাতায় আসার। তিনি প্রথম বার এসেছিলেন ১৯০২ সালে। জাপানের সঙ্গে সেই সংযোগ অবনীন্দ্রনাথের ছবিকেও প্রভাবিত করেছিল। ১৯০৬ থেকে ১৯১০-এর মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন ‘রুবাইত-ই-ওমর-খৈয়াম’ চিত্রমালা। এতেই তিনি প্রথম তাঁর নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। তাঁর ওয়াশ পদ্ধতিও অনেক সুস্থিত হয়েছিল। এ কথা বলেছেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও কে জি সুব্রহ্মণ্যন।

১৯৩০-এ ‘আরব্য রজনী’র কাহিনি অবলম্বনে ৪৫টি ছবি এঁকেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিভার শ্রেষ্ঠ স্ফুরণ ঘটেছে এই চিত্রমালায়। ‘আরব্য রজনী’র পুরাণকল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন নিজস্ব দেশ-কালের বাস্তবতাকে। এর পর ১৯৩৮-এর আগে পর্যন্ত তিনি ছবি এঁকেছেন খুবই কম। নিবন্ধে লেখক বলেছেন, ‘‘তাই হয়তো জীবনের প্রান্তভাগে পৌঁছে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আঁকার কাজ এক রকম ছেড়েই দিয়েছিলেন।’’ কিন্তু আজ আমরা জানি, এই সময়েই তিনি করেছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। খেলাচ্ছলেই ছোটদের জন্য লিখেছিলেন যাত্রাপালা। ‘খুদ্দুর যাত্রা’ বা ‘ক্ষুদি রামলীলা’ যার অন্যতম। এর ভাষা ও কোলাজধর্মী অলঙ্করণের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছিলেন এমন এক দৃশ্যভাষা, যার মধ্যে ছিল আজকের ‘কনসেপচুয়াল আর্ট’-এর প্রথম পদক্ষেপ।

১৯৩০ থেকে ’৩৮ বিশেষ ছবি যে আঁকেননি অবনীন্দ্রনাথ, এর কারণ হিসেবে নানা জনকে নানা কথা বলেছেন তিনি। তবে প্রধান কারণটি বোধ হয়— তাঁর দাদা গগনেন্দ্রনাথের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে কাজের ক্ষমতা হারানো। দুই ভাই একসঙ্গে ছবি আঁকতেন দক্ষিণের বারান্দায় বসে। গগনেন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি অবনীন্দ্রনাথকে খুবই ভারাক্রান্ত করেছিল। ১৯৩৮-এ গগনেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। সে বছরই অবনীন্দ্রনাথ আবার নতুন করে তুলি ধরলেন। আঁকলেন ‘কৃষ্ণ মঙ্গল’ ও ‘কবি কঙ্কন চণ্ডী’ চিত্রমালা। লৌকিক জীবনের গভীরে প্রবেশ করলেন তিনি, যে বিষয়ে তাঁর ছিল দীর্ঘ দিনের গভীর গবেষণা। ১৯১৯ সালে প্রকাশ করেছিলেন ‘বাংলার ব্রত’। তার পর তো এসেছে ‘কুটুম কাটাম’-এর ভাস্কর্যধর্মী খেলা।

এই দীর্ঘ পরিক্রমায় অবনীন্দ্রনাথ ভারতের আধুনিক চিত্রকলাকে প্রভাত থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন।

মৃণাল ঘোষ

কলকাতা-১১০

 

নবযুগের দায়

‘কমরেড, নবযুগ আনলে না?’ (১-১২) শীর্ষক নিবন্ধ ও কিছু জবাবি চিঠি পড়লাম। প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে গণ-বৈজ্ঞানিক চেতনার উন্মেষ ঘটানোর দায় কি শুধুমাত্র বামফ্রন্ট সরকার বা বিজ্ঞান মঞ্চের ছিল? গণমাধ্যম (যেখানে আজও বশীকরণ ও অন্যান্য অতিপ্রাকৃত পদ্ধতির বিজ্ঞাপন অপ্রতুল নয়) ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক মাধ্যমের কি কোনও ভূমিকা থাকার কথা ছিল না? বৈজ্ঞানিক ‘নবযুগ’ আনার দায় শুধুমাত্র একটি সরকারের বা একটি রাজনৈতিক পার্টির গণসংগঠনের উপরেই যদি বর্তায়, তা হলে বঙ্গীয় সমাজের প্রকৃতি ও চরিত্র নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ থেকে যায়।

সুচিন্তন দাশ

সেন্ট স্টিফেন’স কলেজ, নয়াদিল্লি

 

বহু সংগঠন

‘কমরেড, নবযুগ আনলে না?’ (১-১২) লেখাটিতে প. ব. বিজ্ঞান মঞ্চের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনা হল, রাজ্যে বিজ্ঞান চেতনা বাড়ানোর কাজে ছোটবড় কমবেশি ৫০টি বিজ্ঞান সংস্থা দীর্ঘ ৪০-৫০ বছর ধরে বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় রয়েছে।

পত্রিকা প্রকাশ, বই-পুস্তিকা প্রকাশ-সহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে সারা বছর ধরে এই সংগঠনগুলি নিরলস প্রয়াস করে থাকে। শুধুমাত্র সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যে ক্যানিং যুক্তিবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয় স্তরে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারের জন্য ২৫ বছর ধরে বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য স্মৃতি বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসার কর্মসূচি বিজ্ঞান দরবার চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে বিজ্ঞান চেতনা প্রসারের জন্য বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ রাজ্যের ১০০-র বেশি স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আলোকচিত্র-সহ সেমিনার আয়োজন করেছে। প্রতি দিনই রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিজ্ঞানচেতনা বাড়ানোর কাজে অনেকে এগিয়ে আসছে।

প্রশ্ন হল, বিজ্ঞান চেতনা কি বাড়ছে? এক কথায়, না। না বাড়ার কারণ বিভিন্ন ধরনের বাধা। যেমন:

১) গণমাধ্যম, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলের বেশির ভাগ সিরিয়াল সিনেমাগুলি মানুষের মধ্যে অলৌকিক, অপবিজ্ঞান বা অবিজ্ঞান ধ্যানধারণার প্রচার করে।

২) স্বাধীনতার ৭২ বছর পর আজও সরকারি ভাবে কোনও বিজ্ঞানের চ্যানেল চালু হয়নি।

৩) খবরের কাগজে প্রতিনিয়ত অবৈজ্ঞানিক বিজ্ঞাপন মানুষের মধ্যে ছাপ ফেলে। যেমন ধরুন, রুটির চেয়ে হেলথ ড্রিঙ্ক-এর পুষ্টিমূল্য আদৌ বেশি নয়, বিজ্ঞাপনেরই দৌলতে মানুষ এটি কিনে খায়। এ রকম আরও প্রচুর বিজ্ঞাপন হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আইন থাকা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা করা হয় না। এর ফলে মানুষের মধ্যে অবৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা বৃদ্ধি পায়। সরকারের পক্ষ থেকে পুজো কমিটিগুলিকে প্রচুর টাকা অনুদান দেওয়া হয়। অথচ বিজ্ঞানমেলা বা বিজ্ঞান প্রদর্শনী আয়োজন করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান পাওয়া খুবই কষ্টকর। তা ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ রাজ্য স্তরে যে বিজ্ঞান কংগ্রেসের আয়োজন করে সেটা বর্তমানে ক’জন জানেন? গণমাধ্যমের কোনও প্রচার নেই। সরকারের এই বিজ্ঞান কংগ্রেসে যে গবেষণাপত্রগুলি প্রকাশিত হয় সেই সমস্ত গবেষকদের নিয়ে কর্মশালা করা প্রয়োজন।

জয়দেব দে

কলকাতা-৭৩

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

 

ভ্রম সংশোধন 

‘থেমে গেল কবিতার ক্লাস’ শীর্ষক সংবাদ প্রতিবেদনে (২৬-১২, পৃ ১) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে ‘আনন্দমেলা-র প্রথম সম্পাদক’ লেখা হয়েছে। তা ঠিক নয়। ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন অশোককুমার সরকার (১৬ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে এপ্রিল ১৯৭৬ পর্যন্ত)। সম্পাদনার ভারপ্রাপ্ত ছিলেন রমাপদ চৌধুরী। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন আনন্দমেলা-র দ্বিতীয় সম্পাদক, ১৯৭৬ সালের মে মাস থেকে ১৯৮৭ সালের ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।