E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: কৃত্রিম মেধা নতুন বিদ্যুৎ

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সভ্যতার রথচক্র যখনই বাঁক নিয়েছে, মানুষ তখনই শঙ্কিত হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনকে বরণ করে নিয়ে নিজেকেই উন্নীত করেছে ও উপকৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত, কম্পিউটার প্রবর্তনের দিনগুলির কথা স্মরণীয়।

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩০

অতনু বিশ্বাস-এর লেখা ‘মানুষের দিন কি শেষ?’ (রবিবাসরীয়, ৭-১২) প্রবন্ধটি পড়লাম। লেখক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান অবস্থান ও কিছু শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। এই প্রসঙ্গে কিছু কথা। সময়ের যাত্রাপথে মানবসভ্যতা বারংবার নতুন নতুন ভীতির সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ভীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’। মনে হতেই পারে, যন্ত্র বুঝি মানুষের অন্নসংস্থানে থাবা বসাচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যপটটি আপাতদৃষ্টিতে যত সরল মনে হয়, এর নেপথ্যের আখ্যানটি ততটাই গূঢ় এবং সম্ভাবনাময়। এআই মানবসত্তাকে মুছে দিচ্ছে না; বরং মানুষের কর্মপরিধিকে এক বিবর্তনের পথে নিয়ে চলেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সভ্যতার রথচক্র যখনই বাঁক নিয়েছে, মানুষ তখনই শঙ্কিত হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনকে বরণ করে নিয়ে নিজেকেই উন্নীত করেছে ও উপকৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত, কম্পিউটার প্রবর্তনের দিনগুলির কথা স্মরণীয়।

চিকিৎসাশাস্ত্রে এআই আজ চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং তাঁর ‘তৃতীয় নয়ন’। গুগল-এর ডিপমাইন্ড আজ বক্ষব্যাধি বা কর্কটরোগ শনাক্তকরণে যে ক্ষিপ্রতা ও নির্ভুলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চর্মচক্ষুকেও হার মানায়। এখানে এআই বিজ্ঞানীর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তাঁর গবেষণার শক্তিশালী হাতিয়ার। চিকিৎসকের মেধা আর যন্ত্রের নিশ্ছিদ্রতা মিলেমিশেই রচিত হচ্ছে আধুনিক চিকিৎসার মহাকাব্য। কৃষিক্ষেত্রে, যেখানে একদা কৃষকের সম্বল ছিল কেবলই লব্ধ অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির খেয়ালিপনা, সেখানে আজ ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা নিখুঁত কৃষিব্যবস্থা এক ধ্রুবতারা। মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা থেকে শুরু করে বারিধারার সুষম বণ্টন— সর্বত্রই আজ প্রযুক্তির ছোঁয়া। এতে সনাতন কৃষির বিনাশ হচ্ছে না; বরং বলা শ্রেয় কৃষি আরও উন্নত, লাভজনক হয়েছে। মনে রাখতে হবে, সুরকার আজ যন্ত্রের সহায়তায় সুরের নতুন ছন্দ খুঁজছেন, সাহিত্যিক একে ব্যবহার করছেন চিন্তার খোরাক বা ‘ব্রেনস্টর্মিং পার্টনার’ হিসেবে। তবে, সতর্কবার্তা ও করণীয় নিয়ে আলোচনার পরেও, বিষয়টির প্রবল অপকারী শক্তিকে উপেক্ষা করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ‘ডিপফেক’-এর মায়াজাল কিংবা কৃত্রিম প্রভাবশালীদের বিভ্রান্তিকর প্রচার— এ সবই প্রযুক্তির অন্ধকূপের বিষবাষ্প। এমতাবস্থায়, আমাদের তিনটি রক্ষাকবচ নির্মাণ আশু প্রয়োজন। প্রথমত, আইনের শাসন— রাষ্ট্রকে এমন এক কঠোর আইনি কাঠামো নির্মাণ করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তির অপব্যবহার কঠোর হস্তে দমন করা হবে। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতার দর্পণ। প্রযুক্তি ও মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা রাখা চলবে না। কোনটি মানুষের সৃষ্টি আর কোনটি যন্ত্রের— তা জানার পূর্ণ অধিকার নাগরিকের রয়েছে। তৃতীয়ত, মেধার নবায়ন। মানুষকে নিয়মিত নতুন দক্ষতা শিখতে হবে— আতঙ্কে নয়, অভ্যাস হিসাবে।

এআই জগতের অন্যতম পথিকৃৎ অ্যান্ড্রু এনজি যথার্থই বলেছেন— “এআই হল নতুন বিদ্যুৎ।” বিদ্যুৎ যেমন একদা অন্ধকার ঘুচিয়ে সভ্যতাকে আলোকিত করেছিল, এআই-ও আমাদের সক্ষমতাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এআই আমাদের চিন্তাশক্তিকে কেড়ে নেবে না, বরং একঘেয়ে ও যান্ত্রিক কাজগুলো নিজের কাঁধে নিয়ে মানুষকে আরও সৃষ্টিশীল কাজের সুযোগ করে দেবে। তাই ভয়ের চশমা খুলে সম্ভাবনার দৃষ্টিতে এই প্রযুক্তিকে মানুষের সহযোগী হিসাবে গ্রহণ করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

পার্থ মজুমদার, উত্তরপাড়া, হুগলি

মানুষই নিয়ন্তা

অতনু বিশ্বাসের ‘মানুষের দিন কি শেষ?’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কম্পিউটারের দ্বারা অনুকরণ করার চেষ্টা। এই ক্ষেত্রে ‘মেশিন লার্নিং’ ও ‘ডিপ লার্নিং’-এর মতো বিশেষ ধরনের ভাষাগুলি কম্পিউটারকে মানুষের মতো ভাবতে সাহায্য করে। এটি মানুষের যুক্তি, সমস্যা ও পরিকল্পনাগুলি বুঝে নিয়ে নিজের মতো করে তার সমাধান বাতলে দিতে পারে।

এআই-এর কেরামতি বিস্ময়কর। দাবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিয়েছে, চালক ছাড়া গাড়ি চালিয়েছে, রোগীর পুরনো ইতিহাস জেনে বর্তমানের রোগ সারিয়েছে। তাই আমাদের প্রতি দিনের জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্তে অনেক উন্নত দেশও প্রমাদ গুনছে। ভবিষ্যতে যাতে ক্ষতির প্রভাব সীমা না ছাড়ায়, তার জন্য বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই আইন বানাতে শুরু করেছে।

দেখা যাক, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, না আমাদের বুদ্ধিকেও ছাপিয়ে গিয়ে হয়ে উঠবে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য’। প্রসঙ্গত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌরাত্ম্য সংক্রান্ত আশঙ্কাগুলি আর্নল্ড শোয়াৎর্জ়েনেগার অভিনীত দ্য টার্মিনেটর ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রের ক্ষমতার এক ভয়ানক রূপ দেখানো হয়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে এমনই এক ধরনের আশঙ্কায় আজ ভুগছে মানুষ। অবশ্য স্বস্তি পাওয়ার মতো কারণও আছে। চ্যাটজিপিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট তো কাজ করছে মানুষের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত নিয়মাবলির উপর দাঁড়িয়ে। ঠাকুরমার ঝুলির সেই নীলকমল আর লালকমলের গল্পের মতো জিয়নকাঠি আর মরণকাঠি কিন্তু মানুষেরই হাতে— তা-ই না?

প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি

এতই ভঙ্গুর?

‘গলা না মেলানোর অধিকার’ (৪-১২) শীর্ষক আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অত্যন্ত সহজ ভাবে ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ প্রবন্ধে বলেছেন, “যাহা সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যাহা সকলের চেয়ে পূর্ণ, যাহা চরম সত্য, তাহা সকলকে লইয়া...”

কবির কথার প্রেক্ষিতে মনের সত্যটুকুই উঠে আসে। সেখানে আচারসর্বস্ব মন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা নেই। দৈনন্দিন জীবনে চরম দুর্নীতিপরায়ণ বা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকা ব্যক্তি যদি প্রতি দিন সকাল-সন্ধ্যায় জাতীয় পতাকার পদতলে মাথা ঠুকে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে নিজের সততা জাহির করে, তবে কি তার অপরাধমূলক আচরণকে লঘু করে দেখা হবে? কথাগুলি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ বর্তমান ভারতে ‘বন্দে মাতরম্’-এ গলা না মেলালেই মানুষ দেশদ্রোহী। আবার ‘আমার সোনার বাংলা...’ গাওয়ার অপরাধেও কেউ হয়ে যান দেশদ্রোহী! দেশমাতৃকার মন্ত্রটুকুতে গলা না মেলালেই যদি দেশবিরোধী আখ্যা পাওয়া যায়, তা হলে বলতেই হয় ‘দেশপ্রেম’ নামক ভাবাবেগটি বর্তমানে ভঙ্গুর বস্তুতে পরিণত। দেশে দেড়শো কোটির মাঝে চোর, ছ্যাঁচড়, ধান্দাবাজ, সন্ত্রাসবাদী— সকলেই যদি ‘জনগণমন’ আর ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন, তা হলে তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।

তাই এ কথা নিশ্চিত, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনেই শুধুমাত্র ‘দেশপ্রেম’ থমকে থাকে না।

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

ক্ষোভও জমছে

স্বাতী ভট্টাচার্যের প্রতিবেদন ‘ভান্ডারে নজর, মজুরি না পাওয়ার ক্ষোভে নজর কই’ (৮-১২) প্রসঙ্গে বলি, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই সম্মানজনক মজুরির দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই ন্যায্য ক্ষোভের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টি পড়ছে না। হরেক অনুদানকেই পাখির চোখ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এক জন কর্মঠ মহিলাকে উপযুক্ত কাজ দিলে যেখানে কুড়ি বা বাইশ হাজার টাকা মাইনে দেওয়া প্রয়োজন, সেখানে কত মানুষকে এক হাজার টাকা অনুদানেই সন্তুষ্ট থাকতে বলা হচ্ছে! কাজ চাওয়া এবং কাজ করেও ন্যায্য মজুরি না পাওয়া মহিলাদের ক্ষোভ ক্রমশ জমে উঠছে— আর সেই ক্ষোভ যে কোনও সময়েই উত্তাল হয়ে উঠতে পারে।

শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

AI Technology

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy