‘অন্ধকূপ’ (৬-৩) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তার সামাজিক গুরুত্ব নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মানসিকতার অধিকারী নাগরিকদের কাছে খুবই বেশি হওয়ার কথা। গুজরাতে বিবাহ-নথিভুক্তি আইনের সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী দিনে বিবাহ করতে গেলে পূর্ণবয়স্ক যুগলকে মাতা-পিতার অনুমতির হলফনামা দাখিল করতে হবে। এই ধরনের অযৌক্তিক নিয়ম দেশের যে-কোনও অংশে প্রবর্তিত হলে নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘিত হবে। কে কাকে বিয়ে করবে, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ-মানুষী বাবা-মায়ের অনুমতি ব্যতিরেকে বিয়ে করতে পারবে না— এমন অদ্ভুত আইন আজকের যুগে কোনও সভ্য দেশে ও আধুনিক সমাজে বলবৎ হতে পারে— এ-কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু মনে হচ্ছে, আজকের ভারতীয় সমাজের একাংশ পিছন ফিরে অতীতের অন্ধকারের দিকে দৌড়তে চাইছে।
অথচ, এটা একবিংশ শতাব্দী। রাষ্ট্র যদি সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে আইনের মাধ্যমে খর্ব করতে চায়, তা হলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইন— উভয়ের প্রতিই নাগরিকদের শ্রদ্ধা দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। নাগরিক স্ব-সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়ে করার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেললে দেশে গণতন্ত্রের আর কতটুকু বাকি থাকবে? সংবিধানে ভারতের ব্যক্তি-নাগরিককে যে মর্যাদা ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, তাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনও আইন বা নিয়ম প্রচলিত করার চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এমন নিয়ম আসলে দেশের মেয়েদের চিরকালের জন্য শিশু বানিয়ে অন্যের অধীন রাখার পক্ষেই কথা বলে। প্রাচীনপন্থা কখনও নারীকে নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে চায়নি, আজও চায় না। আশা, দেশের স্বচ্ছ চিন্তার মানুষজন কূপমণ্ডূক হয়ে থাকার দুর্ভাগ্যকে নতুন করে বরণ করে নিতে সম্মত হবেন না। বিশ্বের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির সঙ্গে সমান তালে ভারতকেও এগোতে হবে।
শতদল ভট্টাচার্য, কলকাতা-১৬৩
সমানাধিকার
‘অন্ধকূপ’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। সব রকম বাধার প্রাচীর ভেঙে এগিয়ে চলাই যেন নারীর ভবিতব্য। আজও নারী স্বাধীনতার পথে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, কঠোর অনুশাসনের প্রাচীর গড়ে নারীর অধিকার ও মর্যাদাকে খর্ব করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা অব্যাহত। গুজরাত সরকারের বিবাহ নথিভুক্তিকরণ আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রস্তাব তার অন্যতম উদাহরণ। এমন প্রস্তাব নারী-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, প্রাপ্তবয়স্কদের অধিকার হনন ছাড়া অন্য কিছুই নয়। আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালনের মাসে পিতৃতান্ত্রিকতার অন্ধকূপে নারীদের আবদ্ধ করার যে কৌশল গুজরাত সরকার গ্রহণ করতে চলেছে, তার তীব্র নিন্দা করি। নারীমাত্রেই ‘পুত্রের জননী’ এবং তাকে ‘ভোগ্যবস্তু’ করে রাখার সুচারু প্রয়াস থেকে সরে আসুক সমগ্র দেশ। কন্যাভ্রূণ হত্যা, বধূহত্যা, বধূনির্যাতন, ধর্ষণের অজস্র দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট হয় যে, নারী-স্বাধীনতা আজও প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পারিবারিক অনুশাসনের নামে ও শৃঙ্খলা শেখানোর নামে পরিবার যেন কারাগার হয়ে না ওঠে নারীর কাছে। নিশ্চিন্ত আশ্রয়টিও যদি একটি মেয়ের জীবনে মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে, তা হলে মেয়েরা কোথায়, কার উপর ভরসা রাখবে?
বহু পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম দিলে মায়ের উপর আজও চলে অকথ্য অত্যাচার, ধর্ষিতা হলে মেয়েটির চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তবুও আজ নানা বাধাবিঘ্ন, ভয়ভীতির তোয়াক্কা না করে নারী কিন্তু আপন ভাগ্য জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন। আমাদের সবার কাম্য— সুস্থ, সুন্দর, সবল সমাজ গঠনের স্বার্থে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক নারী-পুরুষের সমান অধিকার।
সত্যকিঙ্কর প্রতিহার, দেশড়া, বাঁকুড়া
শিল্পে বাঙালি
সুব্রত দত্ত লিখিত ‘বিনিয়োগে আত্মঘাতী বাঙালি’ (৫-৩) প্রসঙ্গে কিছু কথা। প্রবন্ধকার শিল্পোদ্যোগ প্রচেষ্টায় দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামদুলাল দে সরকারের কথা লিখেছেন। কিন্তু আর এক জন বিশিষ্ট বাঙালির নাম না করলেই নয়। তিনি রসায়ন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বাঙালিকে শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি বার বার উৎসাহ দিয়েছেন এবং অনেক মানুষকে তিনি অর্থ সাহায্যও করেছেন। নিজে হাতেকলমে শিল্প প্রতিষ্ঠার উদাহরণ তৈরি করতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরে ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র, ছাত্র কেমিস্ট রাজশেখর বসু, যিনি পরে সাহিত্য জগতে ‘পরশুরাম’ নামে পরিচিত হবেন, আরও কয়েক জন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুললেন বিখ্যাত কোম্পানি, ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড’ (পরবর্তী কালে ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিটিউক্যালস লিমিটেড’)। এখানে তৈরি সালফিউরিক অ্যাসিড ছিল কলকাতার বৃহত্তম সরবরাহকারী। ক্যান্থারাইডিন তেল ও ন্যাপথলিনও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ফার্মাসিউটিক্যালস বিভাগে নানা প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি হত। কোম্পানি লাভজনক হওয়ার পর মানিকতলার কারখানা সম্প্রসারিত হয়। এর পর সোদপুর পানিহাটিতে আচার্যদেব আর একটি কারখানা তৈরি করেন। পরে কানপুরেও একটি কারখানা তৈরি হয়।
১৯৪৪ সালের ১৬ জুন প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পরে, এমনকি স্বাধীনতার বহু বছর পরেও ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিটিউক্যালস লিমিটেড’ বাঙালির লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম করেছিল। কিন্তু পরে ম্যানেজমেন্ট-এর সঠিক পরিচালনার অভাবে এবং ঠিকমতো মার্কেটিং পলিসি না নেওয়ায় কোম্পানিটি লোকসানে চলে যায়। অনেক আশা নিয়ে কর্মচারীদের দাবি মেনে কেন্দ্রীয় সরকার বেঙ্গল কেমিক্যালস অধিগ্রহণ করে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এই বাঙালি প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য সরকার কোনও পদক্ষেপ করেনি।
শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
প্রকৃত সম্মান
প্রমা রায়চৌধুরীর ‘গুরুত্ব বাড়ছে, সম্ভ্রম?’ (৬-৩) প্রবন্ধটি তথ্যসমৃদ্ধ। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। বর্তমান ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের সরকারি ভাতার প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবশ্রী ভাতা, বার্ধক্য ভাতা— এই সব প্রকল্প আজ শুধু সামাজিক সুরক্ষার উপায় নয়, অনেক সময় নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ভাতাগুলি কি সত্যিই মানুষের কল্যাণে, না কি শুধুই ভোট বৈতরণি পার হওয়ার কড়ি? লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বহু নারী প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অর্থসাহায্য পান। গরিব বা নিম্নবিত্ত পরিবারে এই অর্থ সংসারের খরচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক মেয়েই প্রথম বার নিজের হাতে কিছু অর্থ পাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এই দিক থেকে, লক্ষ্মীর ভান্ডার মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক ভাবে সামান্য হলেও স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছে। কিন্তু অবশ্যই এই ধরনের প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। প্রকৃত স্বাধীনতা আসে শিক্ষা, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে।
একই ভাবে, বেকার যুবকদের জন্য যুবশ্রী ভাতার সামান্য অর্থসাহায্য কিছুটা সহায়ক হলেও তা স্থায়ী কর্মসংস্থানের বিকল্প নয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, যদি সরকারের মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি না-হয়ে ভাতা বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় সমাজে হতাশা ও নির্ভরশীলতার প্রবণতা বাড়ছে। তাই মনে রাখতে হবে, ভাতা যেন উন্নয়নের বিকল্প না-হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের বিস্তার। কারণ শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক কাজই মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতা ও মর্যাদা এনে দেয়।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)