সন্তোষ রাণার ‘আসল প্রতিপক্ষ কে’ (২৮-৮) শীর্ষক লেখাটি প্রসঙ্গে কিছু কথা।

লেখক তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত করেছেন। 

ক) ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে বামপন্থীদের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। ২০১৬-র বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে নির্বাচনী জোট সঠিক ছিল, মানুষকে বোঝানোর দরকার ছিল যে, এই জোট ক্ষমতা দখলের জোট নয়, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য এক আন্দোলনের সূচনা। সন্তোষবাবুর যুক্তিতে, কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দল এবং বামপন্থী সিপিএমের তদানীন্তন কেন্দ্রীয় কমিটি এই জোটের নিন্দা করায় বৃহত্তর জোট গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। 

খ) কংগ্রেস ও বিজেপিকে 

একই মাপের শত্রু ভাবাটা মতাদর্শগত পঙ্গুত্ব। ‘বস্তুকে তার নির্দিষ্ট অবস্থানে’ দেখতে হবে। এটাই মার্ক্সবাদের শিক্ষা। 

গ) ভাঙড়ের আন্দোলন 

একটা মডেল, যেখানে অলীক চক্রবর্তীরা বামপন্থী আন্দোলনকে সংহত করেছেন।

এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে আমার বক্তব্য হল: ১) কংগ্রেস এবং সিপিএম দল দু’টি কতটা গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ তার কিছু নমুনা মানুষের সামনে আছে, খুব সহজে সেটা ভুলে যাওয়ার নয়। বামপন্থী মানুষদের কাছে তেলঙ্গানা, তেভাগার স্মৃতি কিছুটা পুরনো হলেও উজ্জ্বল। ১৯৫৯ এবং ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনে কংগ্রেসের দেওয়া গণতন্ত্রের স্বাদ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভুলে যাননি।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতি ও জাতিসত্তার মানুষেরা, কাশ্মীর থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির প্রবঞ্চিত জনগণ, তাঁদের আন্দোলনে বুঝেছেন কংগ্রেসি গণতন্ত্রের স্বরূপ। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই সময় থেকে সময়ান্তরে চালু হয়েছে পিডি অ্যাক্ট, মিসা, ইউএপিএ থেকে আফস্পা। জরুরি অবস্থা, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭, বরানগর, বেলেঘাটা, বারাসত। চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত থেকে দ্রোণাচার্য ঘোষ— কত শত নাম শহিদদের তালিকায়। জেলের অন্ধকারে বছরের পর বছর বন্দিজীবন— প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদীপ সিংহ ঠাকুর থেকে দেবাশিস গুপ্ত। অর্চনা গুহ থেকে মলিনা ঢক। এক বহমান গণতন্ত্রের উজ্জ্বল চালচিত্রে সাম্প্রতিক সংযোজন অপারেশন গ্রিন হান্ট। অন্য দিকে সিপিএম মানুষকে কতটা গণতন্ত্র দিয়েছে, নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছরকে সামনে রেখে সে আলোচনা সত্যিই জরুরি।

নকশালবাড়ি থেকে লালগড়, মুলুক থেকে নন্দীগ্রাম, করন্দা থেকে সিঙ্গুর, কত জনপদ তার স্মৃতিতে ধরে রেখেছে সিপিএম জমানার গণতন্ত্রের স্মৃতি। বিদ্যুৎ পর্ষদ শ্রমিকদের আন্দোলন ভাঙতে পি/৪৫৭ সার্কুলার, যে সার্কুলার ছিল এসমার সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে এক। শ্রমিক আন্দোলন পুলিশ দিয়ে ভেঙে দেওয়া, বিদ্যুৎ শ্রমিক আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতা পীযূষ দেব, কুমুদ রায়কে মেরে পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া, কত শত ঘটনার ঐতিহাসিক সাক্ষী এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলাগুলি। শান্তিপুরের কৃষকের বুকে গুলির দাগ আজও অমলিন। 

সন্তোষবাবু চাইছেন, কংগ্রেস এবং সিপিএম জমানার গণতন্ত্রের এই ছবিটা মুছে দিতে। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে এই কংগ্রেস-সিপিএম জোটই গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে, এটাই তাঁর দৃঢ় অভিমত। সন্তোষবাবু আশা করছেন, বিজেপি জমানার তুলনায় এই জোট ক্ষমতায় এলে মানুষ কিছুটা গণতান্ত্রিক পরিসর পাবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা কিছু ভিন্ন কথা বলে। ১৯৭৭-৭৮ সালে আজকের মতোই ফ্যাসিস্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বাজপেয়ী, আডবাণীদের সঙ্গে জোটের মুখ্য প্রবক্তা ছিলেন আর কেউ নয়, এই সন্তোষবাবু। তাঁর নির্দেশিত পথে ভারতবর্ষের মানুষ এক বার ফ্যাসিস্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপি, আবার ফ্যাসিস্ত বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের জোটকে সমর্থন করে চলবেন, এ খেলা চলবে নিরন্তর।

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেসের ভূমিকা কতটা সদর্থক সেটা মানুষ দেখেছে ভাগলপুর দাঙ্গা, শিখ-বিরোধী দাঙ্গা, শাহবানু মামলা, বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে।

এই প্রশ্নে সিপিএমের ভূমিকা কিছুটা পরিচ্ছন্ন মনে হলেও পশ্চিমবঙ্গে সুভাষ চক্রবর্তী এবং তসলিমা নাসরিন এই মুখোশের আড়ালে আসল মুখটার ছবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সন্তোষবাবুর কাছে সুখের কথা, বিগত ২৯-৮-২০১৮ তারিখে সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, পার্টির সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই প্রসঙ্গে বলার কথা এটাই, বিজেপির সাম্প্রদায়িক এবং অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিপরীতে কংগ্রেস এবং সিপিএম জোট ভারতবর্ষের মানুষকে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারত উপহার দেবে এ কথা ভাবা মতাদর্শগত পঙ্গুত্ব না দাসত্ব, সেটা সত্যিই একটি বিতর্কের বিষয়।

২) সন্তোষবাবু তাঁর বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য মার্ক্সবাদী দর্শনকে উপস্থিত করার এক প্রচেষ্টা করেছেন, যা প্রকৃত অর্থে মার্ক্সবাদ-সম্মত নয়। তিনি বলেছেন ‘‘বস্তুকে তার নির্দিষ্ট অবস্থানে’’ দেখতে হবে, এটাই মার্ক্সবাদের শিক্ষা। এর মধ্য দিয়ে আসলে তিনি বলতে চাইছেন, আজকে কংগ্রেস বা সিপিএম যে অবস্থায় আছে, তার ভিত্তিতেই তাকে বিচার করতে হবে। অতীত ইতিহাস ভুলতে হবে। এটা এখন সকলেই জানেন, বস্তুবাদী দর্শন এবং মার্ক্সবাদী দর্শনের তফাতের জায়গাটা হল, বস্তুবাদী দর্শন, বস্তুকে তার গতির থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আলাদা ভাবে বিচার করে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, বস্তুকে তার গতিধারায় বিচার করে। মার্ক্সবাদের নাম করে, বস্তুকে তার গতিধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আজকের নির্দিষ্ট অবস্থায় তার অবস্থানের ভিত্তিতে বিচার করার যে পদ্ধতি এই ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে, সেটা কোনও ভাবেই মার্ক্সবাদী বিচারধারা নয়। 

কংগ্রেস এবং সিপিএমকে বিচার করতে হবে তাদের অতীত ইতিহাস, বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যতের গতির ধারণার ভিত্তিতে। অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র আজকে তার অবস্থানের ভিত্তিতে বিচার করার পদ্ধতি আবারও এক ঐতিহাসিক ভুলের জন্ম দেবে। প্রতিটি রাজনৈতিক পার্টিই শ্রেণি পার্টি, 

তাই আসল প্রতিপক্ষ কে, সেটা বিচারের সময়, কোন শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে মিত্রপক্ষ কোন কোন শ্রেণি, এবং সেই সূত্রে কোন রাজনৈতিক দল, সেটা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

৩) সন্তোষবাবু ভাঙড়ের আন্দোলনকে একটা মডেল হিসাবে দেখেছেন, কিন্তু আজকের বাস্তবতা এটাই যে, ভাঙড় সংহতি কমিটি বিবৃতি দিয়েছে ‘‘ভাঙড়ের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হল। সরকারের সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক কেরিয়ারের লালসার কাছে জমি, জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ কমিটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করে ভাঙড়ের গ্রামবাসীদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করলেন।’’

সুতরাং, অলীক চক্রবর্তীরা বামপন্থী আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন এই ধারণার বোধ হয় কোনও ভিত্তি নেই।

বিশ্বজিৎ হালদার

চুঁচুড়া, হুগলি

খেলার আকাল

আকৈশোর ক্রীড়াপ্রেমী হওয়ার এবং এক কালে রাজ্য সরকারের ক্রীড়া দফতরের কনিষ্ঠ আধিকারিক পদে থাকার সুবাদে, আমি নিশ্চিত যে এ রাজ্যের রাজনৈতিক প্রভুরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ক্রীড়াক্ষেত্রে বঞ্চনা করেছেন। 

বহুনিন্দিত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নিজে খেলাধুলা করেছিলেন বলেই বিশ্ব টেবিলটেনিস অনুষ্ঠানের জন্যে পড়িমরি করে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম বানিয়েছিলেন— সুভাষ চক্রবর্তী সেখানে নাচগানের আসর বসাতেন আর বর্তমান সরকারের আমলে সেখানে রাজনৈতিক অনুষ্ঠান চলে। মনে পড়ে, প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের কনিষ্ঠ মন্ত্রী নিরুপমা চট্টোপাধ্যায় ইনডোর স্টেডিয়ামে জলসার খবর শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘‘সে কী, ওটা তো খেলার জায়গা...!’’ 

আজ বৃদ্ধ বয়সে হতাশ হয়ে দেখি, শহর-গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন স্মার্টফোন নিয়েই খেলে।

বলাইচন্দ্র চক্রবর্তী

কলকাতা-৬৪

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।