জয়ন্ত সেনগুপ্তের ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম’ (রবিবাসরীয়, ৬-১) লেখাটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। সেখানে বাংলাদেশের দামুকদিয়া স্টেশনটার উল্লেখ আছে। তার একটা ছোট ইতিহাসের কথা বলি। বাবার মুখে শোনা। তাঁর ঠাকুরদা আর ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটা চুক্তির মাধ্যমে, তিনি রেলের জন্য জমি দিতে রাজি হন, যার ফলস্বরূপ আমাদের বাড়ি যে সব অতিথিরা আসতেন, তাঁদের ট্রেন ধরার কোনও তাড়া ছিল না। দুপুরের খাওয়া খেয়ে, পান চিবোতে চিবোতে তাঁরা ট্রেনে গিয়ে বসতেন এবং ঠাকুরদার অনুমতি পাওয়ার পরেই স্টেশনমাস্টার ট্রেন ছাড়ার সঙ্কেত দিতেন। এমনটা অবশ্য রোজ হত না কিন্তু যে দিন আত্মীয়রা আসতেন সে দিন এর একটুও ব্যতিক্রম হত না। ভেড়ামারা থেকে রায়টার মাঝখানে ওই একটি মাত্র স্টেশন ছিল দামুকদিয়া, যার জন্য বিনামূল্যে জমি দিয়েছিলেন ঠাকুরদা। 

আমার বাবা সারা জীবন দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ের সেবা করে ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে বাবা আর আমি যখন বাংলাদেশ রওনা হলাম— উদ্দেশ্য ছিল, সেই দামুকদিয়া স্টেশনটা এক বার স্বচক্ষে দেখা। কিন্তু হায়, এ কী হল! গেদে বর্ডার পার হয়ে দর্শনা থেকে পার্বতীপুর (রকেট) লোকালে করে ভেড়ামারা যাচ্ছিলাম। ট্রেনের মধ্যে অনেককে বাবা সেই রায়টা লোকালের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু রায়টা নাম শুনে যেন সবাই গাছ থেকে পড়ছে। অবশেষে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বাবাকে বললেন, হ্যাঁ স্টেশনটা ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন আর নেই। দেশভাগ হওয়ার পরে পরেই সরকার প্রথমে রায়টা লোকাল ট্রেন বাতিল করে। এর পরে লাইনের লোহা সব চুরি যায়। তার পর রেলপথ তুলে দিয়ে সড়কপথ তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় হয়তো এই দুটো স্টেশনকে খুঁজলে পাওয়া যাবে, কিন্তু ভূগোলে তাদের লেশমাত্র নেই।

পিনাকি চরণ বিশ্বাস

হাটবাজার, ওড়িশা

 

বাঙালির দশা

‘যেমন কলি তেমন চলি’ (১৯-১) শিরোনামের পত্রলেখক দেখছি ‘নতুন বাঙালি’ (রবিবাসরীয়, ৩০-১২) প্রবন্ধের লেখক জহর সরকারের ওপর খুব রেগে গিয়েছেন। পত্রলেখক লিখেছেন “ইংরেজ আমলেও যা ছিল সত্য, এখনও তাই। তখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজি শিখে নিত, ইংরেজদের অধীনে কেরানিবৃত্তি করার দুর্মর তাগিদে।’’ ‘তখন’ বাঙালি শুধু ইংরেজি শিখে নেয়নি, নিজস্ব সংস্কৃতি বিসর্জন না দিয়েও বহু ক্ষেত্রে ইংরেজদের পর্যুদস্ত করেছে। এখন বাংলা থেকে একটা আইএএস নেই। 

আমার এক দাদু হাইকোর্টে স্টেনোগ্রাফার ছিলেন। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক। তাঁর কাছে শোনা এই ঘটনা। প্রিভি কাউন্সিলের একটি মামলা লড়ছেন আদ্যন্ত বাঙালি, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ এবং গ্ল্যাডস্টোন লওয়াল। মামলার রায় কী হয়েছিল তা দাদুর ব্রিটিশ বস বলেননি। দু’জনের বক্তব্য শোনার পর ব্রিটিশ বিচারক বলেছিলেন, I can at least tell, "Better English is spoken in the side of Ganges than in the side of Thames".

বেঁচে থাকার তাগিদ তখনও ছিল, এখনও আছে, চির কাল থাকবে। অক্ষয় দত্ত, মাইকেল থেকে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ কাউকেই ইংরেজি পড়েও বাংলা সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে বাঁচতে হয়নি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বা সত্যেন বসুকেও না। সত্যেন বসু তো বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বই লেখকদের প্রচণ্ড ভাবে উৎসাহিত করতেন। বিমল রায়-কানন দেবী থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক কাউকে এক ঘণ্টার জন্যও বাংলার সংস্কৃতি বিসর্জন দিতে হয়নি। হেমন্ত-মান্না-সলিলকেও না।

পত্রলেখক লিখেছেন, “এরা মল কালচার, স্মার্টফোন... ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত।” এ তো আন্তর্জাতিক চাহিদা! কে এই যুগান্তকারী ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিবাদ করেছে? জহরবাবুর অভিযোগ ছিল, নতুন প্রজন্মের বাঙালি তার ভাষা ও সংস্কৃতির কদর করে না। পত্রলেখকের প্রবল প্রতিবাদ, “কথাটা সত্য না অসত্য, এই সময় দাঁড়িয়ে বলা যাবে না।’’ তবে আর কবে বলা যাবে?  যখন বাঙালির মৃতদেহ বহনের সময়ে ধীর পায়ে নিঃশব্দে চলা আর মাঝে মাঝে গুরুগম্ভীর গলায় “বল হরি হরি বল” উচ্চারণের বদলে ঢাকঢোল, ব্যান্ডপার্টি বাজবে? 

পত্রলেখক এক বার লিখছেন, “এদের সব পেতে হবে”, আর এক জায়গায় লিখছেন, “সব দিক বজায় রাখা সম্ভব নয়।” তবে কোনটা বজায় রাখব? বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে অবাঙালিত্ব গ্রহণ করে নেব আর সাফল্য না থাকলেও, সাফল্যের ভান করে সোডা-জল খেয়ে রাতভর ‘খেলা’ করব? 

সর্বভারতীয় রাজনীতি, খেলাধুলা, নাচগান, নাটক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, শিক্ষা, শিল্প, সঙ্গীত— প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব থেকে নিম্নগামী হতে হতে শুধুই প্রতিনিধিত্ব আর তার পর শূন্য। এ কথা অস্বীকার করি না, গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বাঙালির এই শূন্যতাই হয়তো এই প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতিবিমুখ করে থাকবে। কিছু অপদার্থ রাজনীতিবিদের ভুল সিদ্ধান্ত সমাজকে এক ধাক্কায় উল্টো মুখে যাত্রা করিয়েছে, যার ফলে অভিভাবকরা পদে পদে বিভ্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তার 

ফলে বাংলা সংস্কৃতির এবং মাতৃভাষার এই অবক্ষয় কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। ‘বাংলায় এমএ করছি’ বলতে ছাত্রছাত্রী লজ্জা পাবে, এ কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।

আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটাও বাঙালি নাম নেই। খুন, জখম, ধর্ষণ, কথায় কথায় গুরুজনদের অপমান, চূড়ান্ত নোংরা ভাষায় রাজনৈতিক তর্জা— এ সব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পশ্চিমবঙ্গের নিত্য দিনের ঘটনা। এটাই এখনকার বাংলার সংস্কৃতি। জহর সরকারের মতো কৃতী বঙ্গসন্তান যদি বাংলা সংস্কৃতির এই অবক্ষয় নিয়ে খেদ প্রকাশ করে অনুশোচনা করেন, বাংলা সংস্কৃতির এখনকার ধারক ও বাহকরা তাঁকেও রেহাই দেবেন না, এটাই তো স্বাভাবিক।

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

কলকাতা-৫৭

 

পোস্টার!

পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্কুলে পড়ুয়া তার ক্লাসে ন্যূনতম কতটা শিখবে, তা পোস্টারে লিখে শ্রেণিকক্ষ এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে নোটিস বোর্ডের কাছে সেঁটে দিতে হবে। (‘কী শিখতে হবে, ক্লাসে পোস্টার’, ১৮-১২) পড়ুয়া ক্লাসে কী শিখবে কতটা শিখবে এ বিষয়ে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, শুধু তা-ই নয়, প্রত্যেকটি সরকারি বইতে ‘পাঠ পরিকল্পনা’য় জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শ্রেণিতে কী কী পড়াতে হবে এবং কতটা পড়াতে হবে তার নির্দেশ দেওয়া থাকে। শিক্ষকেরা সেই নির্দেশ মেনেই পড়ান। তার পরেও পোস্টার। পোস্টার সাঁটলে অভিভাবকরাও নাকি জানতে পারবেন তাঁর ছেলেমেয়ের একটি ক্লাসে কতটা শেখা জরুরি। এ বিষয়ে অভিভাবকরাও সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে প্রশ্ন করে জানতে চাইতে পারবেন ক্লাসে কতটা কী শেখানো হল। এই কতটা কী শেখানো হল— এই অজুহাতে অভিভাবকরা যখন তখন স্কুলে ঢুকে অরাজকতা বাধাতে পারে। গ্রাম বাংলা এবং মফস্সলের স্কুলগুলিতে ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং রাজনীতিও চলে আসা অস্বাভাবিক নয়। নতুন এক বিশৃঙ্খলা স্কুলগুলিতে মাথা চাড়া দিতে পারে।

রতন চক্রবর্তী

উত্তর হাবরা, উত্তর ২৪ পরগনা

 

দিঘায়

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে দিঘার সৈকত এখন খুবই সুন্দর, ভাল হয় যদি অথর্ব বা বৃদ্ধবৃদ্ধাদের জন্য সৈকতে হুইলচেয়ার ভাড়া দেওয়া হয়, আর সৈকত সরণিতে সন্ধের পর নজরদারি বাড়ানো হয় (প্রায়ই মাতালের উপদ্রব দেখলাম), আর দলালদের উপদ্রব বন্ধ করা দরকার, বুকিং সত্ত্বেও যে ভাবে তারা ঘিরে ধরে বিরক্ত করে, তা ভীতিজনক।

অরিত্র মুখোপাধ্যায়

শ্রীরামপুর, হুগলি

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।