সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বাড়ি বসে থাকতে থাকতে রবিঠাকুরের অমলের কথা খুব মনে পড়ে

এই লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের থেকে তাঁদের অবস্থার কথা, তাঁদের চারপাশের অবস্থার কথা জানতে চাইছি আমরা। সেই সূত্রেই নানান ধরনের সমস্যা পাঠকরা লিখে জানাচ্ছেন। পাঠাচ্ছেন অন্যান্য খবরাখবরও। সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন, এবং অবশ্যই আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা ম‌‌নোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি।

corona
আপাত শান্ত পিটসবার্গ এখন আরও শান্ত।

আজ প্রায় এক বছর হল আমি আমেরিকার পিটসবার্গের বাসিন্দা। যখন আগের এপ্রিলে এসেছিলাম এই শহরে, তখন বসন্ত। বসন্ত এখানে বড় রঙিন। আসমানি নীল ক্যানভাসে ফুলের রামধনু, ডালে ডালে কচি পাতাদের কলরব, পাখিদের কুহুতান। প্রকৃতির সে এক অনিন্দ্য রূপ। পাঁচ মাস সোয়েটার-জ্যাকেটে ঢেকে থাকার পর মানুষ এই সময় প্ল্যান করে কে কোন বিচে রোদ মাখতে যাবে। ফ্লোরিডা নাকি নিউ জার্সি? ক্যালিফোর্নিয়া নাকি নর্থ ক্যারোলিনা? ম্যাসাচুসেটস নাকি হাওয়াই? করোনা  এক ধাক্কায় এই চিত্রের রং আমূল বিবর্ণ করে দিয়েছে। মানুষ জনের বর্তমানে একটাই পরিকল্পনা কে কী মজুত করবে। রুটি, স্প্যাগেটি, পাস্তা ছাড়াও এই তালিকায় আছে টয়লেট পেপার, বাচ্চাদের ডায়াপার - এর মত আবশ্যকীয় জিনিস। দোকানে দোকানে শুধুই 'নেই'।  দেড় মাস আগে থেকেই ফার্মাসিগুলোয় নোটিস ঝুলতে শুরু করেছে 'নো মাস্ক' 'নো স্যানিটাইজার', 'নো গ্লাভস'। এখন অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক। দোকানের তাকগুলো ভরতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। প্রাথমিক অভিঘাত কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা চলছে প্রাণপণ। 

 
আমার স্বামী এখানের ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গে পোষ্ট ডক্টরাল গবেষক। ইউনিভার্সিটিতে মার্চের প্রথম থেকে আন্ডার গ্র্যাড, পোষ্ট  গ্র্যাড ক্লাস বন্ধ হলেও ওদের রিসার্চ ল্যাব গুলো চলছিল যথা নিয়মে। তাই প্রতিদিন মনে আতঙ্ক চেপে যেতে হচ্ছিল নির্দিষ্ট সময়েই। এরই মাঝে জানতে পারি রসায়ন বিভাগেরই এক জন করোনা আক্রান্ত। তার পর মার্চের শেষ দিক থেকে জল যখন মাথার ওপর গড়াতে শুরু করে, তখন বন্ধ হয়ে যায় পুরো ইউনিভার্সিটি। বর্তমানে পেনসিলভেনিয়া রাজ্য করোনা আক্রান্তের নিরিখে আমেরিকায় চার নম্বরে। তালাবন্দি হওয়ার অর্ডার চালু হয়েছে এক মাসের বেশি। বাসে নয় জনের বেশি ওঠা নিষেধ। তাও পিছনের দরজা দিয়ে ওঠানামা করতে হয় চালকের সুরক্ষার জন্য। সমস্ত রেস্তরাঁতে শুধু 'টেক আউট' ব্যবস্থা। আপাত শান্ত  পিটসবার্গ এখন আরও শান্ত।
 
এক মাসের বেশি হল আমরা বাড়িতে। গ্রসারি অর্ডার করছি অনলাইনে। দীর্ঘ সময়ে বাড়ির নিচে নেমেছি বার তিন। তাও মাস্ক গ্লাভসের ধড়াচূড়ায় সেজে। ব্যালকনি এখন আমাদের একটুকরো আকাশ, বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ। পরিস্থিতি এই ক'দিনে শিখিয়েছে অনেক কিছু। শিখেছি ধৈর্য, সংযম। "ভালো লাগছে না" বলার আগে পাশের বাড়ির বাচ্চাটার কথা মনে হয়, যে মাঝে মাঝে উদাস মুখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। তখন দূর দেশে রবির অমলের কথা মনে পড়ে। দেশ,কালের সীমা ছাড়িয়ে সব শিশুই কোথাও যেন অমল হয়ে যায়।
 
আমি হাওড়া জেলার মানুষ। দেশের অনেক জায়গাই করোনার হটস্পট। আমাদের জেলাও এরমধ্যে অন্যতম। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিদিন অনেক খবর কানে আসে। মুহূর্তে জানতে পারি আক্রান্তের সংখ্যা। চিন্তা হয় বাড়ির জন্য, সর্বোপরি নিজের দেশের জন্য। চিন্তা হয় দেশের আপামর বাবা, মার জন্য। চিন্তা হয় রুজি রোজগারের তাগিদে যাদের কে এই কঠিন সময়েও প্রিয়জনকে ছেড়ে, ভিন রাজ্যে বসে ভরসা করতে হয় মুঠো ফোনের ওপর, তাদের জন্য। চিন্তা হয় যাদের হাঁড়িতে পরের দিন কি উঠবে, না জানা মানুষদের জন্য। আমরা যারা  মা বাবাকে রেখে কয়েক হাজার মাইল দূরে পৃথিবীর উল্টোদিকে বাস করছি কর্মসূত্রে, যারা এই সময়ে  চাইলেও বাবা মার কাছে ফিরতে পারি না, তাদের প্রতিনিধি হয়ে বলি - ভালো থেকো আমার দেশ, ভাল থেকো পৃথিবী। সুস্থ হয়ে ওঠো শরীরে, মনে।
 
মুনমুন সামন্ত

পিটসবার্গ, আমেরিকা

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন