×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৫ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

আতঙ্ক কোনটা বেশি, মৃত্যুর, না চাকরি চলে যাওয়ার?

২৩ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৪৩
মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে আমেরিকায়। —ফাইল চিত্র।

মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে আমেরিকায়। —ফাইল চিত্র।

বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ। ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ!

বৈশাখের আহ্বানে শহরটা খুব চেষ্টা করছে উঠে দাঁড়ানোর, কিন্ত পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে, দমবন্ধ হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে আছে এক সময়ের প্রাণচঞ্চল জীবনদায়ী টাইমস স্ক্যোয়ার।

মার্চের গোড়ায় মেক্সিকো ভ্রমণের আগের দিন সন্ধ্যেবেলা থেকে রাত দশটা অব্দি তোলপাড় করেছি নিউ জার্সির কিছু জায়গা শুধু একটা স্যানিটাইজারের আশায়, নিদেনপক্ষে একটা অ্যালকোহল ওয়াইপস, কিন্তু কিচ্ছু নেই। বার বার বিভিন্ন সোশ্যাল গ্রুপে সবার এক প্রশ্ন, কোথাও কি কেউ পেয়েছে এগুলো? সমবেত উত্তর, না!

Advertisement

আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম মেক্সিকোর উদ্দেশে। না, তখনও ভয়টা গ্রাস করেনি। ভেবেছিলাম ওই সোয়াইন ফ্লুয়ের মতন কিছু। কিচ্ছু হবে না। ওই ভাবনাই কাল হল। শুধু এই ভাবনাটা ডুবিয়ে দিল গোটা পৃথিবীকে। আতঙ্ক কোনটা বেশি, মৃত্যুর, না চাকরি চলে যাওয়ার?

আরও পড়ুন: দেড় বছরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বর্ধিত ডিএ বন্ধ রাখল কেন্দ্র

বসন্ত বৈশাখিতে এ বারও চেরি ব্লসম গোলাপি। প্রকৃতিকে শাসন করার চেষ্টায় আজ আমরা নিজেরাই ধরাশায়ী। জিতে গিয়েছে টিউলিপ, হ্যায়াসিন্থ, গ্লাডিওলাস। কিন্ত যদি বা বদ্ধ কাঁচের জানলার বাইরে তাদের এক ঝলক দেখা মেলে, তাদের কাছে যাওয়ার উপায় নেই। খাঁচাবন্দি আজ নিউইয়র্ক সভ্যতা।আগন্তুকের মতো ধেয়ে এসেছে করোনাভাইরাস, গিলে নিচ্ছে প্রবীণ-নবীন সবাইকে। মাকড়সার জালের মতো বিস্তারিত হয়ে পড়ছে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মননে। যদি বেঁচেও যাই চাকরিটা থাকবে তো?

১০ মার্চ প্রথম টের পেয়েছিলাম ‘ত্রাস’ শব্দটার মানে। এয়ারপোর্টে সবাই স্বতন্ত্র, এই ভিড়ে ছ’ফুট মানা হচ্ছে কি? যার কাছে স্যানিটাইজারে, সেই রাজা। মেক্সিকো থেকে তুলতে পেরেছিলাম চারটে। প্লেনের সিট মুছে বসেও মনে হয়েছিল, পাশের জন আক্রান্ত নয় তো! ওই শেষ রাস্তা দেখা।

ঘরবন্দি আজ দেড় মাস। তাও রোজ বিকেলে লকডাউনের খবরটা বদলায় না। শুধু বলা হয়, ‘ইয়েট টু রিচ দি পিক।’ অশনি সংকেত ডিসেম্বরেই ছিল। কিন্ত বিশ্বের সব থেকে বড় দেশও সেই ভুলটা করল। ‘জাস্ট এ ফ্লু’ বলে ফুৎকারে ওড়ানো হল সতর্কবার্তা। যেদিন লাগাম টানার প্রথম চেষ্টা হল তখন শ্বাসকষ্টে ভুগছে গোটা শহর, কখনও ভাইরাসের কারণে, কখনও ঘরবন্দি দমবন্ধের কারণে।

‘সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট’-এর পাকদন্ডি আরও এক  বার নস্যাৎ করে দেয় মনুষ্যত্বের ব্যাখ্যা। টারগেট থেকে ওয়ালমার্ট, কস্টকো থেকে শপরাইট, হু-হু করে খালি হয়ে যায় খাবারের বা দৈনন্দিন সামগ্রীর তাক। পিছিয়ে পড়ে দুর্বলরা। একটু দুধ না কিনতে পারলে বাচ্চাটা খাবে কি? ভেঙে পড়ে সামাজিক দূরত্ব। দেরি হলেও তখন রাশ ধরে প্রশাসন।

আরও পড়ুন: ‘স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই কঠিন চ্যালেঞ্জ বলে মনে হচ্ছে’​

সময় বেঁধে দেওয়া হয় বয়স মেনে। কিন্ত সংখ্যা তখন ৫০ হাজার পেরিয়েছে। আস্তে আস্তে বন্ধ হচ্ছে তখন সহজ জীবনযাপন। প্রশ্ন হানে আতঙ্কিত সমাজ, এত দেরি কেন? অর্থনীতি বাঁচাতে গিয়ে কি তা হলে নরবলি দেওয়া হবে? কঠিন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে এগিয়ে আসে সি.ডি.সি এবং হু। পরীক্ষা শুরু হয় এই গণশত্রুর, ঘাড়ের পাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছে তখন ভাইরাস। নির্দেশ জারি হয়। সব অফিস-কাছারি, স্কুল-ইউনিভার্সিটি বন্ধ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। খোলা শুধু খাওয়ার দোকান। তা-ও বসে খাওয়া নয়। আর খোলা কিছু দৈনন্দিন দোকানপাট। আজকের তারিখে সেটিও বন্ধ। ভারতীয় দোকানগুলোয় আর আসছে না দেশের জিনিস, টান পড়ছে পকেটে। মার্কিন মুলুকে থাকা আমাদের মতো ‘না মার্কিনি, না ভারতীয়’-দের অবস্থা আরও শোচনীয় করে দেয় বাংলার সংখ্যাটা, বয়স্ক বাবা-মা একা ওখানে।

‘বিদেশি ভাইরাস, বড়লোকি রোগ’-এর নিষ্ঠুর তকমা হয়তো বোঝে না আমাদের অসহায়তা। যত ক্ষণে আমার কলম পৌঁছবে আপনাদের কাছে, তত ক্ষণে সংখ্যাটা বেড়ে যাবে অনেক। এখানে একদিনে মারা যাচ্ছে আটশোরও বেশি। তথ্য বলছে, মৃত্যু ছাড়িয়ে যেতে পারে সমস্ত পরিসংখ্যান। আক্রান্ত সবাইকে হাসপাতালে রাখার আর জায়গা নেই। বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্বল্প অসুস্থদের, ভরসা শুধুই ‘সম্পূর্ণ বাড়িতে থাকা’ আর নিউমোনিয়া চিকিৎসার সাধারণ অসুধ, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন।

কিন্ত তাও কোথাও ফাঁকফোকর থেকেই যাচ্ছে আজও। ঘরের সামগ্রী সমস্তই প্রায় শেষের দিকে বলে গাড়ি নিয়ে বেরতেই চোখে পড়ে এখনও রেস্টুরেন্টের ‘ড্রাইভ থ্রু’ খোলা। বেশির ভাগেরই বসে খাওয়া বন্ধ। ব্যাঙ্কে ষাটের বেশি বয়সি মানুষের ভিড় অন্য যে কোনও সাধারণ দিনের থেকে বেশি। গ্রসারি স্টোরের ভিতরে ঢোকান হচ্ছে দু’জন করে, কিন্তু বাইরের লাইনে কোনও দূরত্ব মানা হচ্ছে না। ঘরে থাকাটা কি মহামারির থেকেও ভয়ংকর?

সরগরম নিউইয়র্কের রাস্তায় খোলা হয়েছে সাদা চাদরে মোড়া মেডিকেল বেড। সারি সারি ট্রাক বহন করছে মৃতদেহ, গা গুলিয়ে উঠছে জানালার বাইরে তাকাতে। ‘ফুড কন্টেনর’-এর ট্রাকও এখন শববাহী গাড়ি। বুক কেঁপে ওঠে যখন খবর আসে খোদ নিউজার্সিতে চারশোর বেশি পুলিশ অফিসার ‘টেস্টেড পসিটিভ’! রক্ষক আক্রান্ত হলে এই মহামারিতে শান্তি বজায় থাকবে তো!

এর মধ্যে মৃত্যু হয় প্রথম বাঙালির, বয়স ৭২। প্লাস্টিকে মোড়ান শরীরটার শেষকৃত্যের জন্য শেষ দেখাটুকুও পায় না পরিবার। যথার্থ আজ লাশ শব্দের অর্থ। তার পর আবার একজন। কলকাতার তেঘরিয়ার বাসিন্দা এসেছিলেন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে।কিন্ত ফিরতে পারলেন না আর দেশে। আক্রান্ত অনেকেই, কিন্তু নীরব তারা বলতে চাইছে না একঘরে হওয়ার লজ্জায়। কিন্তু কীসের লজ্জা? কোনও অসুস্থতা তো লজ্জার নয়। কোভিড-১৯ পাল্টে দিচ্ছে শিক্ষিত উপলব্ধি।



স্তব্ধ নিউইয়র্ক শহর। —ফাইল চিত্র।

প্রতিদিন প্রেসিডেন্টের আর্জি, ঘরে থাকুন। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে না? তাও গোপনে চলছে মুর্খদের করোনা-পার্টি। এক-এক ঘন্টায় বাড়ছে ৫০০ আক্রান্ত।

এমন দুরবস্থায় হঠাৎ খবর আসে অমুক বান্ধবীর চাকরিটা আর নেই, ‘ইকনমি ক্রাইসিস’-এর কোপ, তমুক বন্ধুকে এক দিনে ‘ফায়ার’ করা হয়েছে, কারণ বলা হয়েছে ‘কস্ট কার্টেল’। আগের দিন দুপুরে বাড়ি থেকে কাজ করার পর আজ তারা  ‘বেকার’। প্রশাসন কি বোঝে বেকারত্বের মানেটা!

একটা মহামারি বুঝিয়ে দিয়ে গেল, রাস্তায় থাকা যে মানুষগুলো ভাবছে ‘কোন মরাটা সহজ, না-খেতে পেয়ে, নাকি করোনাতে মৃত্যু’ তারা ব্যতিত সবাই বড়লোক। এখানে তারা ‘হোমলেস’ বা যারা ‘ডেইলি ওয়েজার’।

খবর পেলাম আমারই আত্মীয়ের অফিসের ক্যান্টিনের ভদ্রলোক আজ সকালে মারা গেছেন কোভিড-১৯-এ। জানা নেই ওর থেকে, এই মৃত্যু-থাবা ঘরে ঢুকে এসেছে কি না। এক দিনে ১৩ জন মারা গেছে নিউইয়র্ক হাসপাতালে, বয়স ২৫-৩৩! ভেন্টিলেশনে এক-একজন থাকছেন আট ঘন্টা।

সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বন্ধ হয়েছে আমেরিকা থেকে যে কোনও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিষেবা, কিন্ত ‘ডোমেস্টিক’ যে আরও ভয়াবহ। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছে সবথেকে কঠিন মনটাও। তথ্য বলছে ছোটবেলায় নেওয়া বি.সি.জি ভ্যাকসিন বাড়াতে পারে প্রতিরোধক্ষমতা, সত্যতা যাচাই করার মতো সাহস নেই। জ্বর হলেও, ভয়ে অনেকেই যাচ্ছে না ক্লিনিকে। দ্বিধাগ্রস্ত, আতঙ্কিত গোটা সমাজ। বন্ধ এখন মন্দির-গির্জা। ঈশ্বর অক্লান্ত কাজ করছেন রাত-দিন, সফেদ অ্যাপ্রনে। কিন্তু এই ঈশ্বর যে অবিনশ্বর নয়। খবর আসছে কয়েকজন ডাক্তার-নার্স আক্রান্ত এই সর্বনাশা মহামারিতে। তা হলে উপায়? উপায় সতর্কতায়।

ভরসা একটাই, চার দেওয়াল । দুপুরে হঠাৎ সাইরেনের আওয়াজে মনে হয়, অনেকটা ‘জোমবিল্যান্ড’-র মতো বাস করছি আমরা, দরজা খুললেই নৃশংস মৃত্যুর কবলে। বাজারে যদি কদাচিৎ যেতে হয়, যদি খোলা থাকে একটা আমেরিকান দোকান, সেখান থেকে ফিরেই সাবান-জলে পরিস্কার করতে হচ্ছে সারা শরীর। যেন বাহক না হই এই মারণরোগের। 

আরও পড়ুন: আমার প্রতিবেশী তার সাত বছরের ছেলেকেও বুঝিয়েছে বেশি খাওয়া চলবে না​

এ ভাবেও বাঁচা যায় তা হলে। নিশ্বাস নিচ্ছি যখন, বেঁচে আছি এখনও।

আমেরিকার সর্বোন্নত ‘মেডিকেল স্ট্রাকচার’ এখনও অপারগ ‘ফ্লাটেনিং দি কার্ভ’ করতে। প্রয়াস চলছে, সুস্থ হচ্ছে অনেকে। কিন্ত তার সংখ্য বড্ড নগন্য। অপর্যাপ্ত খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী, অনিশ্চিত চাকরি, ক্রমবর্ধমান মূল্য, অসম্ভব মানসিক চাপ নিয়েও আমরা লড়ছি রোজ।

খুব কম আসে এমন সময় যখন দেশের জন্য কিছু করা যায়, সব যুদ্ধ সীমান্তে হয় না, ঘরে থেকে দেশকে বাঁচান। চা না-হয় একটু কমই খেলেন, চ্যালেঞ্জ ধরে নিন না, ঠিক পারবেন! সময়টা খারাপ হতে পারে, পরিণতিটা কখনও না।

একটাই অনুরোধ সবাইকে, নির্ভুল তথ্য ছাড়া গুজব ছড়াবেন না। এখানে মানুষ আজ দ্বিধায়, কী করণীয়!

কিন্তু ওই যে, বাঁচার লড়াই থামলে চলবে না। ১৪২৭-এর বাংলা ক্যালেন্ডারে নতুন দিন, নব সূচনায় আর এক বার বুক বাঁধা। এক সাথে সবাই একা। তাই প্রযুক্তির সাহায্যে অনলাইনে চলছে বর্ষবরণ। গানে, নাচে, গল্পপাঠে, শ্রুতিনাটক আর গানের লড়াইতে। নতুন জামা বার করতে গিয়ে কলকাতায় থাকা বুড়ো বাবা-

মার কথা মনে পড়ে হাত কাঁপলেও, ওঁদের ভালো রাখতে দেখাতেই হবে ভাল আছি। জুম-স্কাইপে কিছু ক্ষণ ‘তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’। কখনও গলাটা একটু কেঁপে গেলে স্ক্রিনের ও পারে বন্ধুদের সান্ত্বনা, ‘পাশে আছি দূরে থেকেও’।

ভারতবর্ষে তথা কলকাতায় আপনারা একটু বাড়িতে থাকুন, দেখুন দূষণ কত কম, আকাশটা আজ আর একটু নীল। ওদিকটা ভাল থাকলে আমরা এখানে লড়ে নেব।

তৃতীয় বিশ্ব আজ সাহায্য করছে বিশ্বের প্রথম শ্রেণির দেশকে। ‘প্যানডেমিক’ মিলিয়ে দিয়েছে গোটা পৃথিবীকে।

আর এক বার কি ফিরতে পারে বোধ-বুদ্ধি-চেতনা? পয়লায় প্রতীক্ষা সুদিনের। এ ভাবে মুছে যেতে পারে না ২০২০। কিন্ত এখনও ওই কাঁচবিদ্ধ ফুসফুস প্রতিধ্বনি করে যায়, নিউ ইয়র্ক ‘আর এক বার ঘুরে দাঁড়াও, ধ্বজা ওড়াও জীবনীশক্তির”।

সুষ্মিতা রায়চৌধুরী, নিউ জার্সি, আমেরিকা

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

Advertisement