সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায় ও অচিন চক্রবর্তীর (‘দরকার চিকিৎসকের সাহায্য’, ২০-৯) লেখা প্রসঙ্গে এই চিঠি। ডিপ্রেশন সত্যিই সাধারণ মনখারাপ নয়, তার চেয়েও জটিল এবং ব্যাপক। জীবন যত জটিল, মানসিক অবসাদও তত গভীর। তবে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, অবসাদের চিকিৎসা করাতে হলে প্রথমেই অবসাদকে অসুখ বলে মেনে নিতে হবে। আমরা অনেক সময় কিছুতেই মানতে পারি না, আমাদের প্রিয়জন অবসাদে ভুগছে। তাই চিকিৎসা শুরু হতেই বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে যায়। আর সুচিকিৎসা পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার! ক্যানসার আক্রান্ত হলে যতটা গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে তার সিকি ভাগ গুরুত্বও পায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাড়ির মহিলারা অবসাদগ্রস্ত হন। অথচ, স্বামী বা পুত্রের বিবেচনায় তাঁরা আসেন না। বা এলেও বোঝা বলে বিবেচিত হন। ঘাড় থেকে কোনও ভাবে নামাতে পারলেই যেন তাঁরা বেঁচে যান। শুধু চিকিৎসকের সাহায্যে হবে না। চাই প্রিয়জনের সাহচর্যও। চিকিৎসার খরচও একটা বড় ব্যাপার। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে চিকিৎসা করানোর জন্য বাড়ির লোকের সময় বার করা। যারা মানসিক রোগের চিকিৎসা করাতে আর্থিক ভাবে সক্ষম, তারাও মানসিক রোগের ভবিষ্যতের মহামারি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবে তো? যে ভাবে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিসর ছোট হয়ে আসছে, এর পর আমরা প্রত্যেকেই যখন কমবেশি অবসাদে ভুগব, তখন আমাদের দেখার কেউ থাকবে না।

আশার কথা, কিছু দিন হল, মানসিক রোগের চিকিৎসাকেও স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে বিমা নিয়ন্ত্রক আইআরডিএআই। ফলে বিমার আওতায় থাকা ২৯% মানুষ উপকৃত হবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকাংশ দেশে প্রতি লক্ষ মানসিক রোগী-পিছু মাত্র এক জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তবে সর্ব স্তরে সচেতনতা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু মনোবিদদের দিয়ে এর সমাধান হবে না।

ডিপ্রেশন নিছক মনখারাপ নয়। মনখারাপ সাময়িক। ডিপ্রেশন দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা। শিশুরাও অবসাদে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক সময় আমরা মানতেই পারি না এ কথা। কিন্তু কেন এক জন মানুষ জীবনের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে এ রকম হয়ে যায়? কেন বার বার বলা হচ্ছে, মহামারির আকার নেবে মানসিক রোগ? অথচ পদক্ষেপ বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই। আমাদের চার পাশে যা ঘটে চলেছে অহরহ, তা আমাদের মন ভাল রাখতে পারে না। পেশাগত কারণেও মানসিক অবসাদ হতে পারে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তিও অবসাদে আক্রান্ত হন। দুর্ভাবনা থেকেও অবসাদ আসতে পারে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অবসাদ এই গোত্রের। এক জন চলে গেলে অন্য জনের কী হবে? এই ভাবনা থেকে প্রিয় জনকে শেষ করে দিয়ে একটি মানুষ নিজেকেও সরিয়ে নেয়। সেলেব্রিটিদের অবসাদও আজকাল খুব শোনা যায়। ছিন্নমূল মানুষরাও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। জীবন এখন মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। দৌরাত্ম্য, অবহেলা, উদাসীনতা, লোভ-লালসা, হিংস্রতা, বিকৃত আনন্দ এবং স্বার্থপরতায় জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে যখন-তখন। তখন অবসাদের সহজ শিকার হয় সেই মানুষটি। মনুষ্যত্বের প্রতিকারহীন পরাভব থেকেই আসে হতাশা, অস্থিরতা, অজানা আশঙ্কা, ঘুমের সমস্যা এবং সব শেষে নিজেকে 

শেষ করে দেওয়া। এর থেকে মুক্তির পথ কোথায়?

পার্থপ্রতিম চৌধুরী

কোন্নগর, হুগলি

সেতু ও দোকান

2 শহরে এখন এমন সেতু খুঁজে বার করা মুশকিল, যার তলায় ঝুপড়ি বা দোকান নেই। শিয়ালদহ বিদ্যাপতি সেতুর নীচের বাজার থেকে গড়িয়াহাটের ব্রিজের তলার মার্কেট, মানিকতলা ব্রিজ থেকে বিজন সেতু— সব জায়গায় একই অবস্থা। ছোট, বড়, মাঝারি খাবারের দোকান আগুন জ্বেলে রমরমিয়ে চলছে; হোটেল, জ়েরক্স, লটারির দোকান— বাকি নেই কিছুই। 

আবার এরই মধ্যে ব্যতিক্রম বাগুইআটি ব্রিজ। কাজী নজরুল ইসলাম সরণি বা ভিআইপি রোডের ওপর এই ব্রিজ কেষ্টপুর থেকে তেঘরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ব্রিজের তলা দিয়ে অবৈধ পারাপার পুরোপুরি বন্ধ। ব্রিজের তলায় লাগানো আছে পামজাতীয় পাতাবাহার গাছ, ঘাস-পাতা। আর চার পাশ দিয়ে, ওপর দিয়ে চলছে গাড়িঘোড়া, লোকজন। এই সেতু নিজেও দেখতে সুন্দর, অন্যদের দেখাতেও ভাল লাগে।

মোহনলাল ভট্টাচার্য

কলকাতা-২৮

 

ব্যতিক্রমী

2 সুন্দরবনের গোসাবা থানার অন্তর্গত বিজয়নগর গ্রাম। নোনা ধুলোতে সাদা লবণ চিকচিক করত। বছরে ২-৩ বার বাঁধ-ভাঙা জলে বিজয়বাবুর মাটির ঘরখানা মুখ থুবড়ে পড়ত। পুকুর, খাল, বিলে শুধু নোনা জল। সুন্দরবনের এই গ্রাম তখন ছিল খুবই অনুন্নত। প্রকৃতি ছিল বড়ই নিষ্ঠুর। ধান ও অন্যান্য সব্জি চাষ তো দূরের কথা, নোনা জলের জোয়ার-ভাটায় ভেসে আসত মানুষও। ভেসে আসত গবাদি পশুর দেহ, কলার ভেলায় সাপের কামড়ে মৃত মানুষ। মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে ছোট্ট স্বপন দেখত প্রকৃতির উদ্দাম উল্লাস। বাবা পেশায় জমি জরিপের আমিন। দিনে রোজগার ১০ টাকা। অনিয়মিত কাজ। কখনও পেটে-ভাতে আমিনগিরি। রোজগারের অভাবে জুটত না ল্যাম্পের আলোর কেরোসিনটুকুও। ভাইবোনেরা তাই অর্ধাহারে, অনাহারে সন্ধেবেলা ঘুমিয়ে পড়ত। মা বিনতাদেবী লেখাপড়া জানেন না। নোনামাটি সংগ্রহ করে লবণ জল জ্বাল দেন সারা রাত। উনুনের আগুনে ঝলসে যায় মুখ, শরীর। তবু ক্লান্তির ছাপ নেই। ছেলেমেয়ের বইখাতা কিনতে হবে। সকালের লবণ কী সুন্দর দেখতে! ৫ পয়সা কেজি দরে বিক্রি হয় পাড়ায় পাড়ায়, গোসাবার হাটে।

উমাদিদি চতুর্থ শ্রেণিতে বৃত্তি পেল। স্কুল ফাইনালে মেয়েদের মধ্যে সুন্দরবন এলাকায় প্রথম স্থানাধিকারিণী। মোট নম্বর ৭৪১। স্বপনও তাই দেখে খুব পড়াশোনা করে। গরু, ছাগলকে টিউবওয়েল থেকে জল এনে খেতে দেয় মাটির কলসিতে। ছোট ভাই স্বদেশকে নিয়ে তিন ভাইবোন কাঁচামাটির রাস্তায় এক ঘণ্টা হেঁটে স্কুলে যায়— বালি ধনমণি মডেল হাই স্কুল।

১৯৭৯ সাল। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬টি বিষয়ে লেটার-সহ স্বপনের সর্বোচ্চ প্রাপ্ত নম্বর ৮৩০। সুন্দরবনে প্রথম স্থানাধিকারী। সে দিন সমস্ত শিক্ষকদের কী আনন্দ! খবর বেরিয়েছিল সুন্দরবনের ‘জলে-জঙ্গলে’ পত্রিকায়। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানে প্রাপ্ত নম্বর ৮৩৫। অতঃপর খড়্গপুর আইআইটি-তে বি টেক। চাকরি রৌরকেল্লা ইস্পাত কারখানায়। কেরোসিনের ল্যাম্পে পড়াশোনা করে বড় হওয়া, প্রতিভাবান, কর্মিষ্ঠ মানুষ স্বপনবাবু মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা গেলেন ১২ অগস্ট। গ্রামের মানুষকে ভালবাসতেন, গরিব দুঃখীকে দান করতেন দু’হাতে। অসম্ভব মেধাবী। লাজুক স্বভাবের মানুষটি চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কোনও দোষারোপ, অনুযোগ, অভিযোগ ছাড়াই রেখে গেলেন চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেও শীর্ষে ওঠার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

স্বদেশ কুমার জোদ্দার

কলকাতা-১৫০

 

বিপজ্জনক রাস্তা

2 রাজারহাট থেকে কৈখালি, এই পথের এখন বিপজ্জনক দশা। বিশেষ করে রাইগাছি, কাঞ্জিয়ালপাড়া, শিখেরবাগান, নারায়ণপুর, তেঁতুলতলা এই অঞ্চলগুলির অবস্থা শোচনীয়। রাস্তা এখন এক-এক জায়গায় পুকুরের আকার ধারণ করেছে। অসংখ্য গর্তে ভরে গিয়েছে পুরো পথ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, রাস্তার দ্রুত উন্নতি 

করা হোক।

নির্মাণ গঙ্গোপাধ্যায়

কলকাতা-১৩৬

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 

কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।