E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: সভ্যতার ভিত্তি

একটি সন্তানকে বড় করে তুলতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, অসুস্থতার সময় শিয়রে বসে বিনিদ্র রাত কাটানো, শিক্ষিত ও প্রকৃত মানুষ করে তোলার জন্য পিতা-মাতার অন্তহীন ত্যাগ— এ সবই পাশে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন।

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ০৬:০৪

সোমা মুখোপাধ্যায়ের ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ (রবিবাসরীয়, ৭-৬) প্রবন্ধটি অনবদ্য। সভ্যতার আদিতে মানুষ জোটবদ্ধ হয়েছিল সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, আনন্দ-বেদনায় একে অপরের প্রয়োজন অনুভব করে। সেই জোটবদ্ধতা থেকেই পরিবার, পরিবার থেকে গ্রাম, শহর, নগর— সব কিছুর জন্ম হয়েছে ‘পাশে থাকার’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু স্বার্থপরতা, হিংসা, ঈর্ষা, রাগ, ক্রোধ, ক্ষমতা ও অর্থের লোভে আজকের সমাজ ক্রমশ একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই পথ চলতে চলতে কেউ মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে গেলেও অনেকেই তাকিয়ে না দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যান। অথচ সদ্য হাঁটতে শেখা একটি শিশুও নির্ভয়ে এগিয়ে যায়, কারণ তার বিশ্বাস— কেউ না কেউ তার পাশে আছেন।

একটি সন্তানকে বড় করে তুলতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, অসুস্থতার সময় শিয়রে বসে বিনিদ্র রাত কাটানো, শিক্ষিত ও প্রকৃত মানুষ করে তোলার জন্য পিতা-মাতার অন্তহীন ত্যাগ— এ সবই পাশে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। অথচ আজকের সমাজে সেই মা-বাবারই অনেকের ঠাঁই হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, সন্তানের সংসারে নয়। সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া, মা-বাবাকে সন্তানের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া, অজানা স্টেশনে বা মেলায় ফেলে আসা, এমনকি তাঁদের উপর শারীরিক নির্যাতনের মতো পৈশাচিক ঘটনাও আজ আর বিরল নয়। যাঁদের বার্ধক্যে সন্তানের পাশে থাকার কথা, তাঁদের প্রতি অনেকেই আজ নির্মম।

আমার নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। বাবা মৃত্যুর আগে প্রায় এক বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। সেই সময় মা ও আমার বোনেরা সব সময় তাঁর পাশে ছিলেন। সেবা, যত্ন, মমতা ও ভালবাসা দিয়ে তাঁরা বাবার প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। তখন আমি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। আমি বাড়ি আসব শুনলেই বাবা বিছানা ছেড়ে গেট পর্যন্ত হেঁটে চলে আসতেন। আমি যত দিন বাড়িতে থাকতাম, তাঁকে হাসিখুশি দেখা যেত; ঘরের মধ্যে হাঁটাচলাও করতেন। মানুষের ভালবাসা ও বিশ্বাস কতখানি শক্তি জোগাতে পারে, আজও সেই কথা ভেবে বিস্মিত হই।

শুধু বাবা-মা বা ভাই পাশে আছেন— এই বিশ্বাসে বহু স্বামী-পরিত্যক্তা, পণের অত্যাচারে ঘরছাড়া কিংবা পারিবারিক হিংসার শিকার মহিলা নতুন করে স্বাধীন ভাবে বাঁচার সাহস পেয়েছেন, তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি।

আবার এর ঠিক উল্টো ছবিও দেখেছি। ‘আমার পাশে কেউ নেই’— এই অসহায় বোধ থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখেছি দু’জন মানুষকে। করোনা অতিমারির সময় মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে রেড ভলান্টিয়ারদের রোগী ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য ঘটনা আজও মানুষের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

বিশ্বাসভঙ্গ

সোমা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ শীর্ষক প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে এই পত্র। আমার স্ত্রী স্তন-ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর চার বছর লড়াই করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। কলকাতার নিউ টাউনের বেসরকারি ক্যানসার হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। জীবনের শেষ সময়টুকুও সেখানেই কেটেছে। সেই কঠিন সময়ে আমিই ছিলাম তাঁর প্রধান ‘কেয়ারগিভার’।

তাঁর বন্ধুরা নিয়মিত আসতেন, প্রতিবেশীরাও সুযোগ পেলেই এসে গল্প করতেন, যাতে তাঁর মনোবল অটুট থাকে। একমাত্র কন্যা নিজের সংসার ও চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও প্রায়ই মায়ের কাছে এসে বসত। মা-ও সব সময় মেয়েকে কাছে পেতে চাইতেন। এই আন্তরিক সঙ্গ আমাদের কঠিন সময়টাকে অনেকটাই সহনীয় করে তুলেছিল।

কিন্তু যাঁদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা, যত্ন ও সহমর্মিতা প্রত্যাশা করেছিলাম, সেই চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ আশানুরূপ ছিল না। ডিসেম্বরে বছর শেষে এক বিরাট সংখ্যক ডাক্তার এবং হাসপাতালের অন্যান্য কর্মী ছুটি নিয়েছেন বলে কেমোর তারিখ পেতে দু’সপ্তাহের বেশি দেরি হল। এর মধ্যেই স্ত্রীর জন্ডিস ধরা পড়ে। নির্ধারিত দিনে চিকিৎসক কেমোথেরাপি না দিয়ে আরও দু’সপ্তাহ পিছিয়ে দেন। এই সময়ের মধ্যে জন্ডিস আরও বেড়ে যায়। ফলে আর কেমোথেরাপি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার মাত্র এক মাসের মধ্যেই আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়।

অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিষেবার জন্য নির্ধারিত অর্থ গ্রহণে কোনও রূপ শিথিলতা দেখাননি। প্রাইভেট রোগী হিসাবে চিকিৎসা করানোর খরচ যে কত বিপুল হতে পারে, ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে তা সহজেই অনুমেয়। চিকিৎসাব্যবস্থায় দক্ষতার পাশাপাশি মানবিকতা, সময়নিষ্ঠা ও সহমর্মিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ— এই তিক্ত অভিজ্ঞতা বার বার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তপনকুমার ভট্টাচার্য, ওলাইচণ্ডীতলা, হুগলি

ঈশ্বরের দূত

সোমা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ প্রবন্ধের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কঠিন সময়ে একটি ফোনকলের মাধ্যমেও কী ভাবে মানুষের পাশে থাকতে পারে, সেই কথাই বলতে এই চিঠি।

কোভিডের সময় আমাদের পরিবারের দুই জন ষাটোর্ধ্ব সদস্য গুরুতর ভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আমি এবং আমার মা-ও অসুস্থ ছিলাম। তবে এক চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতেই চিকিৎসা চলছিল। সময়টা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগের। হঠাৎ কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কী করব, সেই ভয় সব সময় আমাদের তাড়া করে বেড়াত।

ঠিক সেই সময় আমাদের পাড়ার পরিচিত এক চিকিৎসক, যিনি একটি সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র অধ্যাপক ও চিকিৎসক, প্রতি দিন সন্ধ্যায় তিনি নিজে ফোন করে আমাদের খোঁজ নিতেন। সারা দিন হাসপাতালের কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও তিনি এই সময়টুকু আমাদের জন্য রাখতেন। সত্যি বলতে, প্রতি দিন সেই একটি ফোনকলের জন্য আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম। তাঁর কয়েকটি আশ্বাসের কথা আমাদের ঘরের ভারী পরিবেশকে অনেকটাই হালকা করে দিত। এক জন চিকিৎসক ওষুধ দিয়ে আমাদের সুস্থ করে তুলেছিলেন, আর এই চিকিৎসক আমাদের মনে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন আশা ও লড়াইয়ের আলো। যাঁরা এই ভাবে অন্যের পাশে থাকেন, তাঁরাই বোধ হয় সত্যিকারের ঈশ্বরের দূত।

অনির্বিত মণ্ডল, ইছাপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

ভালবাসার ঋণ

সোমা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছেড়ে যাইনি, পাশেই আছি’ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রবন্ধকার লিখেছেন, আমাদের ঘরে ও বাইরে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা আমাদের প্রকৃত ‘কেয়ারগিভার’। তাঁদের যত্নেই আমাদের অসুখের দিন যেমন কাটে, তেমনই সুখের সময়ও হয়ে ওঠে নিশ্চিন্ত। তাঁরা আমাদের ঘরের মানুষ— মা, স্ত্রী, কন্যা; আবার ঘরের বাইরের সেই সব নার্স ও চিকিৎসকও, যাঁরা পেশাগত দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠেন আমাদের অসুখের সমব্যথী। তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন গৃহসহায়িকারা, যাঁরা প্রতি দিন আমাদের ঘরে তাঁদের যত্নের স্পর্শ দিয়ে যান।

বাংলায় ‘শুশ্রূষা’ শব্দটির অর্থ ইংরেজি ‘কেয়ার’ শব্দের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। ‘শুশ্রূষা’ মানে শুধু সেবাই নয়, শুনতে চাওয়ার ইচ্ছাও। কিন্তু আমরা কি সত্যিই পাশের মানুষের কথা শুনতে চাই? ঘরের সেই মানুষটির কথা, যিনি প্রতি দিন নিরন্তর গৃহশ্রম দিয়ে, আমাদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেন? তাঁর ক্লান্তি, তাঁর না-বলা যন্ত্রণা, তাঁর মানসিক অবসাদের প্রতি আমরা কতটা সহমর্মী? আমাদের সমস্ত মূল্যবোধের গর্ব মুহূর্তে মিথ্যা হয়ে যায়, যদি ভালবাসার ঋণ ভালবাসা দিয়েই শোধ করতে না পারি।

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Isolation Senior Citizens Society

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy