E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: পছন্দ, না বাধ্যতা?

ভাত, সয়াবিন আর রাজমা ‘যথেষ্ট পরিমাণ’-এ প্রোটিনের জোগান দেবে— এই ভেবে কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়? নিঃসন্দেহে প্রোটিনের পরিমাণে আপস হবে না, তবে সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ কি মিলবে?

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৫:৫৩

‘ডিম নয়, মিড-ডে মিলে ভরসা সয়াবিন, রাজমায়’ (২৩-৬) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা। ভাত, সয়াবিন আর রাজমা ‘যথেষ্ট পরিমাণ’-এ প্রোটিনের জোগান দেবে— এই ভেবে কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়? নিঃসন্দেহে প্রোটিনের পরিমাণে আপস হবে না, তবে সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ কি মিলবে? অনেকে বলবেন, কেন মিলবে না? ভেগান বা প্লান্ট প্রোটিন-বেসড ডায়েট এখন নতুন রীতি। বলে রাখা ভাল, উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎসগুলি ‘কমপ্লিট এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড’-এর উৎস নয়। পেশির সঠিক বিকাশের জন্য এক-দু’টি অত্যাবশ্যক অ্যামিনো অ্যাসিড উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে থাকে না। এখানে প্রোটিনের পরিমাণটাই অন্তিম বিচার্য নয়, উপরন্তু একটা সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। ২০টি অত্যাবশ্যক অ্যামিনো অ্যাসিড আছে, যেগুলি আমরা খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করি এবং এই সব ক’টি উপাদানই খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা আবশ্যক। এ ছাড়াও ‘মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস’ সঠিক ভাবে পাওয়ার জন্য মাছ, মাংস অথবা ডিম বাড়ন্ত বাচ্চাদের ডায়েটে থাকা একান্ত প্রয়োজনীয়। মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আর উদ্ভিজ্জ খাদ্য অতিরিক্ত পরিমাণ ফাইবার সরবরাহ করে।

যদি এই খাদ্যের পুষ্টিগুণের কথা সরিয়ে রেখে একটু রাজ্যের মানুষদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে চোখ রাখি, তা হলে হয়তো দেখা যাবে অনেক পরিবারই সন্তানদের ডিম-মাংস খাওয়াতে অপারগ। তাঁরা হয়তো সন্তানদের ডাল-ভাত খাইয়ে রাখতে পারেন এই ভরসায় যে, মিড-ডে মিলে শিশুটি একটা ডিম খেতে পারবে। নতুন ব্যবস্থায় কি সপ্তাহে দু’দিন ডিম-মাংসের ব্যবস্থা করা সম্ভব? না কি ভেবে নেওয়া হবে যে— বাড়িতে আমিষের ব্যবস্থা হবে, নিরামিষের দায়িত্ব আমরা নিই।

অনেকে হয়তো বলবেন, নিরামিষ আহার খেয়ে কি সকলে অপুষ্টিতে মরছে? উত্তর হল ‘পছন্দ’ আর ‘বাধ্যবাধকতা’-কে গুলিয়ে না ফেলাই ভাল। যারা আগের খাবার খেয়ে থাকত, সেটা তাদের ‘পছন্দ’ ছিল না, ছিল বাধ্যতা। আজকেও তা-ই হবে।

চন্দ্রানী দে, কলকাতা-২৫

অ-পর্যাপ্ত

দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষক মহলের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের মিড-ডে মিলের জন্য পড়ুয়াদের মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজ্য বাজেটে প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলের মাথাপিছু বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১০ টাকা করা হয়েছে। তবে উচ্চ প্রাথমিক স্তরে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়নি। সেখানে মাথাপিছু বরাদ্দ ১০ টাকা ১৭ পয়সাই রাখা হয়েছে।

শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে শৈশবকালে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে মাত্র ১০ টাকার মধ্যে এক জন শিশুকে কতটা পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকরা চিন্তায় রয়েছেন। এই বাজেটে যখন নানা সামাজিক প্রকল্প ও বিভিন্ন ভাতা-র খাতগুলিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেখানে প্রাথমিক স্তরে মাত্র ৩ টাকা ২২ পয়সা ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরে কোনও বৃদ্ধি না হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— দু’টি বিষয়ই উন্নত সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই শিশুদের পুষ্টির স্বার্থে, প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিলের মাথাপিছু বরাদ্দ আরও কিছুটা বৃদ্ধি করা এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করছি।

অপূর্বলাল নস্কর, ভান্ডারদহ, হাওড়া

ভারসাম্য চাই

ভারতে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ডিম দীর্ঘ দিন ধরেই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা একটি উৎকৃষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। শিশুদের বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপুষ্টি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ডিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিল কর্মসূচিতে ডিম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ শিশু নিয়মিত ভাবে অন্তত একটি উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস পেয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে ডিমের দাম যখন ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন সীমিত বরাদ্দের মধ্যে মিড-ডে মিল পরিচালনা করা বিদ্যালয় ও প্রশাসনের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।

আমাদের সমাজে এখনও একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে প্রোটিন মানেই মাছ, মাংস, ডিম বা দুধজাত খাবার। এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। মানবদেহের বৃদ্ধি, কোষ গঠন, পেশির বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভৃতির জন্য প্রোটিন অপরিহার্য। কিন্তু এই প্রোটিন কেবল প্রাণিজ উৎস থেকেই পাওয়া যায় না, উদ্ভিজ্জ উৎস থেকেও পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া সম্ভব। সয়াবিন, রাজমা, ছোলা, মসুর ডাল, মুগ ডাল, মটরশুঁটি, কলাই, চিনাবাদাম, তিল-সহ অসংখ্য খাবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। বিশেষত সয়াবিনকে অন্যতম শক্তিশালী প্রোটিন উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজমা, ছোলা ও বিভিন্ন ডালেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ফাইবার, খনিজ পদার্থ এবং বিভিন্ন ভিটামিন থাকে।

প্রশ্ন ওঠে, প্রাণিজ প্রোটিন এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন কি সমান? উত্তরে বলা যায়, সম্পূর্ণ সমান নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনায় উভয়ই কার্যকর হতে পারে। প্রাণিজ প্রোটিনকে সাধারণত ‘সম্পূর্ণ প্রোটিন’ বলা হয়, কারণ এতে মানবদেহের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে উপস্থিত থাকে, যা কোনও একটি উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে না-ও পাওয়া যেতে পারে। এই কারণেই অনেকেই মনে করেন যে, নিরামিষ খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া সম্ভব নয়। ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম শক্তি হল বিভিন্ন খাদ্যের সংমিশ্রণ। এই ধরনের খাদ্য সংমিশ্রণ একাধিক উদ্ভিজ্জ উৎসকে একত্রিত করে এমন একটি পুষ্টিগত ভারসাম্য তৈরি করে, যা প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করে।

মিড-ডে মিলের মতো বৃহৎ সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হল, সীমিত আর্থিক বরাদ্দের মধ্যে কী ভাবে সর্বাধিক পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়। যদি কোনও সময় ডিমের মূল্য এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, নিয়মিত সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তা হলে সয়াবিন, রাজমা, ছোলা, মসুর ডাল, চিনাবাদাম এবং অন্যান্য স্থানীয় উদ্ভিজ্জ প্রোটিনকে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ হতে পারে। এতে এক দিকে যেমন ব্যয় কমবে, অন্য দিকে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্রও বৃদ্ধি পাবে।

পার্থপ্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান

আর অন্যরা?

‘ডিম নয়, মিড-ডে মিলে ভরসা সয়াবিন, রাজমায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা। সম্প্রতি রাজ্য বাজেটে বলা হয়েছে, কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করবে ইস্কন। আমি আমিষ, নিরামিষ, ধর্ম ইত্যাদি প্রসঙ্গের মধ্যে যাচ্ছি না, কিন্তু কলকাতা পুরসভার বাইরে একটা বিশাল বড় পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে, যেখানে বহু সরকারি স্কুলে ছোটদের মিড-ডে মিল দেওয়া হয়। সেই সব শিশু কী খাবে? কারা নিয়েছে তাদের দায়িত্ব? সমস্ত ছোটরাই তো আমাদের দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তাদেরও সমান অধিকার আছে পুষ্টিকর খাবারের।

সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই তো এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে নীরবে সমাজে কাজ করে চলেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কালে তারাই দরিদ্র মানুষদের পরিত্রাতা হয়ে পাশে দাঁড়ায়। ইস্কনের মতো সেই সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ করে শিশুদের পুষ্টির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

এ দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎগুলিকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন তো আমাদের সবারই।

সুপর্ণা ঘোষ, কলকাতা-৩২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

mid-day meal scheme mid-day meal Non-Veg Vegetarian Foods West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy