কান্নুরে সদ্যসমাপ্ত পার্টি কংগ্রেস, এবং এ রাজ্যে সম্প্রতি গঠিত রাজ্য কমিটির সদস্য ও সম্পাদক মনোনয়নকে নজরে রাখলে কুমার রাণার প্রবন্ধটির (“শ্রমজীবীর ‘কোটা’, বটেই তো”, ১৫-৪) মর্ম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনও দলের নীতি, কৌশল পরিকল্পনার প্রশ্নে যে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি তার পরিকল্পনাকারীদের (এখানে পার্টির নীতি-নির্ধারকদের) উদ্ভব, বিকাশের দিকটি নজরে না আসে। এই বিষয়টি এড়িয়ে নীতি প্রয়োগের সাফল্য-ব্যর্থতার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না, যাচ্ছেও না। নেতারা আসছেন কোথা থেকে? জমি, খনি, কল-কারখানা থেকে নয়; মজুর, কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারীদের মধ্যে থেকে নয়; নেতারা আসছেন গত কয়েক দশক ধরে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে। আসছেন মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারে লালিত মূল্যবোধ থেকে। ক্যাম্পাস, ক্যান্টিন, ছাত্র ধর্মঘটের সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা সেরে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, যশ ভারী হলে উত্তরণের পথ হচ্ছে বেশি মসৃণ। পত্রিকায়, পার্টি দলিলে লিখিয়ে, টিভিতে সাক্ষাৎকারে বলিয়ে হলে শীর্ষাসনে জয়জয়কার অবধারিত। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের সঙ্গে তাঁর সংসর্গ কতটা গভীর, আন্তরিক, সে প্রশ্ন গৌণ হয়ে গিয়েছে।
এই বঙ্গে দীনেশ মজুমদার থেকে শুরু করে বিমান, শ্যামল, সুভাষ, অনিল, নিরুপম, বুদ্ধ, গৌতম, সেলিম, মানব, সুজন, শমীক, শতরূপ, মীনাক্ষী— এই প্রবাহই এখন মূলস্রোত। কান্ডারি প্রকাশ, ইয়েচুরি, বৃন্দারাও এই স্রোতেই ভেসে এসেছেন। মহম্মদ ইসমাইল, মহম্মদ আমিন, হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীরা আদর্শের পথে ক্ষীণ হয়ে-যাওয়া ধারা। শুধু সিপিএম নয়, অন্য সব সংসদীয় বাম দলও এই ধারার ধ্বজাধারী। শ্রমিক, কৃষকের নেতৃত্ব থেকে, হে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, তোমার পথ গিয়েছে বেঁকে!
মানস দেব
কলকাতা-৩৬
জাত ও শ্রেণি
কুমার রাণার প্রবন্ধটির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। মনে আছে, বেশ কয়েক বছর আগে এক বিদেশি তরুণ এ দেশে, বিশেষ করে বাংলায় বামপন্থী আন্দোলনের ক্রমবিকাশের উপর গবেষণা করতে আসেন। বামপন্থী আন্দোলন নিয়ে বহু আলোচনা হয়। হঠাৎ তিনি একটি প্রশ্ন করে বসেন, “আপনাদের এখানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নিম্নবর্গীয়দের অন্তর্ভুক্তি এত কম কেন?” এই প্রশ্নের জবাবে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। শ্রেণিসত্তাই যে মুখ্য এবং জাতিগত পরিচয় যা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিভক্তিকরণে সহায়তা করে, এই রকম কিছু একটা ভাসা ভাসা উত্তর দিয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। বলা বাহুল্য, উপলব্ধি করেছিলাম যে, আমার ব্যাখ্যা সেই বিদেশিকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
কুমার রাণা এই প্রসঙ্গটির প্রয়োজনীয়তা তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এ দেশের জাতভিত্তিক পরিচয়ের রাজনীতি, বিশেষ করে বাম মতাদর্শ-ভিত্তিক রাজনীতির নেতৃত্বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা যথার্থ। সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শোষণকে যদি ভিত্তি ধরা হয়, তবে জাতের ব্যবধান সেই শোষণের সহায়ক, এ সত্যকে স্বীকার করতেই হবে। অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই, এমনকি জয়লাভও সামাজিক শোষণকে নিষ্প্রভ করবে, এ ধারণা অলীক। এ দেশের বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী পার্টিগুলোর এ ব্যাপারে উদাসীনতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সম্পদ বণ্টনের সাম্যের উপর অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে সমাজের প্রান্তিক অংশে থাকা জাতপাতের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত এক বিপুল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সাময়িক বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে।
‘সাময়িক’ এই জন্যে বললাম যে, দেরিতে হলেও এই উপলব্ধিতে অন্তত বামপন্থী দলগুলো পৌঁছেছে যে, শ্রেণি এবং জাতের মধ্যে দ্বান্দ্বিক প্রশ্নটির সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তার দায়িত্ব তাঁদেরকেই নিতে হবে। হয়তো সে কারণেই সিপিআইএম-এর সদ্যসমাপ্ত কংগ্রেসে তার আভাস পাওয়া গেল। পথের শেষ প্রান্ত এখনও বহু দূর, সময়ের গতি দ্রুতহারে বহমান, সুতরাং পা চালিয়ে যেতে হবে বন্ধু!
পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়
কলকাতা-৩৪
ওষুধ-প্রতিনিধি
‘দাম বাড়ায় ওষুধ-প্রতিনিধি বয়কট’ (১৯-৪) প্রসঙ্গে মেডিক্যাল রিপ্রেজ়েন্টেটিভ হিসেবে তিন দশকের বেশি সময় কাজের সুবাদে, এবং এই শিল্পের এক জন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী হিসেবে কিছু বলতে চাই। আমি দেখেছি, ওষুধের দাম বাড়া নিয়ে সাধারণত চিকিৎসকদের তেমন হেলদোল থাকে না। অতিমারির পরিণামে কর্মহীনতা ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় এক জন চিকিৎসকের ওষুধের দাম বাড়া প্রসঙ্গে এমন উদ্বেগের সংবাদ অবশ্যই আনন্দের। তবুও মনে রাখা প্রয়োজন যে, দাম বাড়ার ক্ষেত্রে এমআর-রা শুধুমাত্র নিধিরাম নন, তাঁরাও ভুক্তভোগী। কারণ তাঁরা জানেন, ওষুধের দাম বাড়া মানে বিক্রির সম্ভাবনা কমা। ঘাটতি পূরণ করতে কাজের বোঝা বাড়বে। এ ভাবেই এমআর-রা এই বোঝা বয়ে চলেছেন নিয়মিত। বস্তুত এই শিল্পে মাৎস্যন্যায় অবস্থা চলছে। নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়াই তৃতীয় পক্ষ দিয়ে উৎপাদন করিয়ে বাজারে বিক্রি করতে কিছু কর্মী নিয়োগ করে বহু ব্যবসায়ী আজ ‘শিল্পপতি’। উদারীকরণের বাদ্য-ঝঙ্কারে ‘ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডার’ তুলে নিয়ে ‘ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি’ তৈরি করে দাম বাড়ানোর জনবিরোধী পথ তৈরি হয়। দেশি-বিদেশি কর্পোরেট মালিকদের মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে এই পথে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের পার্থক্য নিয়ন্ত্রণের কোনও বালাই নেই। আবার ‘কম্বিনেশন’ ওষুধের উপর কোনও রকম নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অতিরিক্ত মুনাফার তাগিদে বাজারে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় মিশ্রিত ওষুধের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। বাৎসরিক দাম বাড়ানোর আইনি সুযোগ দিয়ে কার্যত অতিরিক্ত মুনাফা তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
অথচ, এই শিল্পে কয়েক লক্ষ শ্রমিক নিযুক্ত। ‘এমআর’ নামে পরিচিত এই শ্রেণির কর্মীদের প্রতি সরকারের কোনও রকম দায়-দায়িত্ব পালনের চেষ্টা নেই। তাঁদের জন্য তৈরি ‘সেলস প্রোমোশন’ আইন বিলুপ্ত। ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ নেই। বেতন কাঠামো নেই। ন্যূনতম বেতন থেকে বঞ্চিত প্রায় সকলেই। কাজের কোনও সময়সীমা নেই। ঘরের কাজ, বাইরের কাজের উপর অত্যাধুনিক ব্যবস্থায় নজরদারি চরমে। বিক্রির দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণই কর্মীর। এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন করলে চাকরি হারাতে হয়।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির প্রধান দায় সরকারের নীতির। সরকারকে ঠিক করতে হবে, সরকারি নীতির লক্ষ্য কী? জনসাধারণের স্বার্থরক্ষা, না কি ব্যবসায়ীদের মুনাফার সুরক্ষা? ওষুধের ধারাবাহিক দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসক সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। তবুও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রিত হবে না, যত ক্ষণ না ভুক্তভোগীরা ওষুধের দাম নিয়ে এমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হবেন। ন্যায্য দামে ওষুধ পেতে হলে সমাজের সব অংশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলির কাজের প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে। এমআর-রা অবশ্যই তাঁদের অন্যতম সহায়ক হতে পারেন।
শ্যামল ঘোষ
কলকাতা-১৩১
অগ্নিমূল্য
‘নীরব মহামারি’ (২৩-৪) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি পড়লাম। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষ কিনবে কী, আর পরিবার নিয়ে খাবে কী? কেন্দ্রীয় সরকারের মাথাব্যথা নেই। রাজ্য পাঁচ টাকায় ডিম-ভাত দিচ্ছে, কিন্তু সবার কাছে পৌঁছচ্ছে না। কৃষক, শ্রমিক, কুলি-মজুর, খেতমজুর, দিন-আনি দিন-খাই মানুষ কাজের বিনিময়ে পেট ভরে খেতে পাচ্ছেন না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সকলেই অপুষ্টির শিকার। সরকারের পক্ষে সকলকে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ অসম্ভব। তাই দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে দ্রুত জিনিসপত্রের মূল্য হ্রাস করতে হবে।
রীতা পাল
কলকাতা-২৪