2 ‘অমর ভারত যাত্রা’ (প্রথম পাতা, ২৯-৭) শীর্ষক ছবিটি প্রকাশের জন্য সাধুবাদ জানাই। এ প্রসঙ্গে এ বছর অমরনাথ যাত্রার জন্য ওই জায়গায় গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা সকলকে না জানিয়ে পারছি না।

এত বড় ও কঠিন যাত্রায় কেউ হেঁটে, কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ ডুলিতে যেতে পারেন, কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই দেখেছি, এই প্রদেশের মানুষের সাহায্য ছাড়া এগোনো খুব কঠিন। এঁরা নির্দ্বিধায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই তাঁদের সারা বছরের রুজি-রোজগারের এটা একটা পথ, কিন্তু সহৃদয়তা! যে ছবিটি প্রকাশিত, আমার ধারণা তা চন্দনবাড়ি থেকে পিসুটপ যাওয়ার রাস্তায় তোলা, যা একেবারে বরফ ও কাদায় মিশ্রিত। এ বার অতিরিক্ত বরফ পড়ার ফলে রাস্তাটি বেশ দুর্গম হয়ে পড়েছে। সে জন্যেই বেলচা দিয়ে বরফের আস্তরণ সরিয়ে দর্শনার্থীদের চলার পথ তৈরি করে চলেছেন বহু স্থানীয় মানুষ।

এ ছাড়াও ঘোড়া বা ডুলিতে যাত্রা করলে এঁরাই নিয়ে যাবেন এবং নিয়ে আসবেন। কিন্তু তার বিনিময়ে যা দেখলাম, তা অতি ভয়ঙ্কর। সেবা দেওয়ার নামে দেশের বিভিন্ন প্রদেশের (পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া) লঙ্গরখানা এখানে ভর্তি। এক-এক জায়গায় উত্তর দক্ষিণ সব প্রদেশের নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে মানুষগুলি এত কষ্ট করে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান, সেই কাশ্মীর প্রদেশের মানুষেরা যদি লঙ্গরখানায় ঢোকেন, তাঁদের মুখের ওপর ‘না’ বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই আমাদের ধর্ম! এই আমাদের সেবার নমুনা! তাও স্বামী বিবেকানন্দ-মহাত্মা গাঁধীর দেশে!

কোনও রাজনৈতিক দলই এর সঙ্গে জড়িত নন, কিন্তু এ এক অলিখিত রেওয়াজ, যা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। হিসেব অনুযায়ী প্রতি দিন প্রায় ৭৫০০ জন যাত্রী মন্দির দর্শনে যান। ওখানে রয়েছেন আরও ১৫০০০ মানুষ। নীচে নামছেন ১০০০০ যাত্রী। সব মিলিয়ে প্রায় ৩২৫০০ মানুষের সমাবেশ প্রতি দিন। যাঁরা সারা বছরের রুটি-রুজির টানে এখানে চলে আসেন এবং ওই প্রচণ্ড ঠান্ডায় দেড় মাস অতিবাহিত করেন, তাঁদের দুর্দশা না দেখলে আমার অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার অপূর্ণ থেকে যেত। 

আমার এই অভিজ্ঞতা পড়ে কেউ হয়তো সহানুভূতিশীল হবেন, কেউ উল্টো ধারণাও করতে পারেন। কিন্তু সেবাধর্মের নামে যে রকম ভণ্ডামি দেখলাম, মনে হল, এ দেশকে সঠিক পথে চালানো শিবেরও অসাধ্য।

শেখর মুখোপাধ্যায়, টালা

বেথুনের স্কুল

2 ‘মহিলা স্কুল’ (৩০-৭) শীর্ষক চিঠিটিতে কিছু ভুল তথ্য রয়েছে। বেথুন সাহেবের মহিলা বিদ্যালয় ছিল ‘ভারতের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ মহিলা বিদ্যালয়’— বক্তব্যটি সত্য নয়। বেথুন ১৮৪৯ সালের ৭ মে যে বালিকা বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন, তার নাম ছিল ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল। স্কুলটি উদ্বোধনের সময় বেথুন জানান যে, "none but the girls of respectable Hindus would be admitted."‌ সুতরাং বেথুন স্কুলকে সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ বলা যাবে না। 
‘‘মানবতাবাদ ছিল শিক্ষার প্রধান বিষয়’’—কথাটি শুনতে ভাল। বেথুন নিঃসন্দেহে মানবতাবাদী ছিলেন। কিন্তু যে বয়সের বালিকারা এখানে আসত, তাদের মানবতাবাদ শেখানো সম্ভব ছিল না। ২১ জন বিশিষ্ট ভদ্রলোক বেথুনকে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলেন, তাঁদের কন্যাদের স্কুলে পাঠাবেন। প্রকৃত পক্ষে উদ্বোধনের দিন মাত্র ১১ জন ছাত্রী উপস্থিত ছিল। পরে ছাত্রিসংখ্যা কমতে কমতে চার-পাঁচ জনে দাঁড়িয়েছিল। এরা নিতান্ত শিশু। মানবতাবাদ এদের পাঠ্য ছিল না।
আরও একটি ভুল তথ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বেথুন ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে। বেথুনকে অর্থ ও জমি দিয়ে সাহায্য করেন দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ ও আরও অনেক বাঙালি যুবক। স্কুলবাড়িটি তৈরি করতে কোনও সরকারি সাহায্য নেওয়া হয়নি, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দানে বাড়িটি তৈরি হয়। বেথুন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি উইল করে স্কুলকে দিয়ে যান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডালহৌসি নিজের টাকা দিয়ে স্কুল চালিয়েছিলেন। অবসর নেওয়ার সময় তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রাজি করিয়ে স্কুলটিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন ১৮৫৬ সালে। 

সুনন্দা ঘোষ, প্রাক্তন অধ্যাপিকা ও বিভাগীয় প্রধান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বেথুন কলেজ

ওরা কাজ করে

2 প্রতিবাদের কোনও রকম তোয়াক্কা না করে লোকসভায় গত ৩০ জুলাই বেতন বিধি বিল পাশ করানো হল। শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস সংক্রান্ত চারটি আইনকে একত্র করে তৈরি এই বেতন বিধি তৈরি হলে, কেন্দ্রীয় সরকার গোটা দেশে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতনের ভিত তৈরি করে দেবে, যার ভিত্তিতে রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের রাজ্যে শিল্পমহল ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যূনতম বেতন ঠিক করবে। এর আগে গত ২৩ জুলাই শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, কেন্দ্রের ঠিক করা ন্যূনতম দৈনিক বেতনের ভিত হবে ১৭৮ টাকা, অর্থাৎ মাসে ৪৬২৮ টাকা (২৬টি কর্মদিবস ধরে)। বর্তমানে ন্যূনতম দৈনিক বেতন হল ১৭৬ টাকা। এটা নির্ধারিত হয়েছিল ২০১৭ সালে। ২ বছর বাদে বাড়ল মাত্র ২ টাকা। বাড়ল, না কি, মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে ২ বছর বাদে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন কমিয়ে দেওয়া হল? 
প্রশ্ন হল, কিসের ভিত্তিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল? ১৯৫৬ সালে আয়োজিত ভারতীয় শ্রম সম্মেলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯১ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, দৈনিক ২৭০০ ক্যালরি শক্তিসম্পন্ন খাবারের কথা বিবেচনা করে ন্যূনতম মাসিক বেতন নির্ধারিত হওয়া উচিত। সেই অনুযায়ী ২০১৬ সালে সপ্তম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী তা দাঁড়িয়েছিল মাসিক ১৮০০০ টাকা। যদিও ওই হিসাব নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছিল, তবুও ওই হিসাবের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এর পরিমাণ ২৩০০০ টাকার কম হবে না। তা ছাড়া, ন্যূনতম বেতন নিয়ে গত বছর জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম দফতরের তত্ত্বাবধানে এক বিশেষজ্ঞ কমিটি নিযুক্ত হয়েছিল। সে কমিটি কোনও এক অজ্ঞাত কারণে শ্রমিকদের জন্য দিনে ২৪০০ ক্যালরি শক্তিসম্পন্ন খাবারের কথা বিবেচনা করেছিল। সে অনুযায়ী তাদের প্রস্তাব ছিল: ন্যূনতম দৈনিক বেতন ৩৭৫ টাকা থেকে ৪৪৭ টাকা হবে; যা মাসে দাঁড়ায় ৯৭৫০ থেকে ১১,৬২২ টাকা। আশ্চর্যের বিষয়, বেতন কমিশন কিংবা সরকারের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ কমিটি— কারও সুপারিশ মানতে প্রস্তুত নয় বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। 
এই সরকারই আবার মন্ত্রী কিংবা সাংসদদের মাইনে বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে দরাজহস্ত। যে সাংসদের মাসিক মাইনে এক সময় ৫০ হাজার টাকা ছিল, তা এখন ১ লাখ টাকা। অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ধরলে এ অঙ্ক আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই সরকারই এ বারের বাজেটে একচেটিয়া শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের জন্য কর্পোরেট কর-এ দেদার ছাড় ঘোষণা করেছে; ব্যাঙ্কে এদের না মেটানো ঋণ মিটিয়ে দিতে ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অথচ সমস্ত সম্পদের স্রষ্টা, সভ্যতার কারিগরদের আজ এই দুরবস্থা। 

গৌরীশঙ্কর দাস 
সম্পাদক, ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ় ইউনিটি ফোরাম, পশ্চিমবঙ্গ