সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদক সমীপেষু: মেতে ওঠার বিপদ

Puja
ফাইল চিত্র।

১৯৭৮ সালে বন্যা। বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামে আমাদের পুজোবাড়িতে এক কোমর জল। মূর্তি ভেসে গিয়েছে। কোনও রকমে ঘটে-পটে পুজো হল। তার আগে হুগলিতে ঝড়ে পাড়ার বারোয়ারি প্যান্ডেল, মূর্তির দফারফা। ওই ঘটে-পটে পুজো। ১৯৮৪, আলোর শহর চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো নিষ্প্রভ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও বাড়ি, পাড়ায় বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে সে বছর সাধারণত পুজো হয় আনন্দ ছাড়াই। এটাই পরম্পরা। এমন অনেক উদাহরণ আছে। তা হলে এক বছর কেন সবাই এইটুকু ত্যাগ করতে পারব না? কিন্তু তার জন্য সর্বজনীন শৃঙ্খলা চাই। এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষায় সাধারণত তিন রকম দায়িত্ব থাকে। এক, ব্যক্তিগত দায়িত্ব; দুই, সামাজিক দায়িত্ব; এবং তিন, সরকারি দায়িত্ব।

সম্পাদক গৃহস্থকে সতর্ক করেছেন (‘কী বা আসে যায়’, ১৪-১০)। শারদীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে যে ভাবে মাস্ক খুলে বেপরোয়া আনন্দে মেতে ওঠার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, তা খুব আশঙ্কাজনক। এ ক্ষেত্রে পেটের খিদে ও হাতের কাজের দাবি বড় বেসামাল করে দিচ্ছে। সাত মাসের ওপর ঘরবন্দি মানুষের মনও বাইরের আনন্দের জন্য পাগলপারা হয়ে যাচ্ছে। তাই এক ভারসাম্য দরকার, যেখানে সাপও মরে, আবার লাঠিও ভাঙে না। বিশেষ করে মাস্ক, স্যানিটাইজ়ার, দূরত্ববিধির মতো প্রাথমিক সতর্কতা— এইটুকু তো নিশ্চয়ই মানা যায়।

‘এই বারটি সংযত থাকুন’ (১৩-১০) নিবন্ধে বিশেষজ্ঞরা সামাজিক স্তরে আবেদন করেছেন, করোনার বিরুদ্ধে প্রায় জেতা লড়াইয়ে যেন হেরে না যায় বাঙালি। অতীতে মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থী, সারা ভারতে ইদ এমন বিপদকালে যথেষ্ট সংযত হয়ে পালিত হয়েছে। সরকারি দায়িত্ব মনে করিয়ে সম্পাদকীয়টি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখেছে। অর্থাৎ, সরকারি আচরণ ঠিক বিপরীত কাজ করছে। এ বার অতিমারির আবহে উৎসবের ক্ষেত্রে যেখানে নিরুৎসাহ করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে সরকার সমানে উৎসাহ বাড়িয়ে গিয়েছে। বারোয়ারি পুজোয় সরকারি চাঁদা ৫০,০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুতের খরচ অর্ধেক দেবে সরকার। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের জন্য কর নেবে না। এই উৎসাহ এই বছরে না দেওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল। যে পুজোয় শাসক গোষ্ঠীর কোথাও প্রচ্ছন্ন কোথাও প্রকট মদত থাকে, সেখানে সংযত হওয়ার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

 

শুভ্রাংশু কুমার রায়

চন্দননগর, হুগলি

চাই সতর্কতা

2 চার জন বিশেষজ্ঞের লেখাটি (‘এই বারটি সংযত থাকুন’, ১৩-১০) রাজ্যবাসীর প্রতি অনুরোধের সঙ্গে এক চরম বার্তা। একে অবহেলা করলে রাজ্যের জনগণকে চরম মূল্য দিতে হবে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। নানা প্রয়োজনে যাঁরা রাজ্যের বাইরে থাকেন, তাঁরা এ সময় ঘরে ফেরেন। আপনজনের সঙ্গে মিলন, মজা উপভোগ করার তৃপ্তিই আলাদা। দুর্গাপুজো মানেই উৎসব, মিলন মেলা। মানুষে মানুষে দেখা হওয়া, কথা বলা, খাওয়াদাওয়া, হৃদয়ের আদানপ্রদান— এগুলো উৎসবের অঙ্গ, মূল উদ্দেশ্য। করোনার ক্রান্তিকালে, অতিমারির আবহে তা তো হওয়ার নয়। তাই এ বছর প্রতিটি জায়গায় নিয়মরক্ষার পুজো হোক। কিন্তু বন্ধ হোক পুজোকে কেন্দ্র করে উৎসব, মিলন মেলা। কারণ, এই বছর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে করোনার আক্রমণে ছিন্নভিন্ন জনজীবন। এখনও বহু মানুষ ঘরবন্দি। লকডাউনের পর যতই আনলক পর্ব এগিয়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সংক্রমণ, বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। পরিসংখ্যান বলছে, এ রোগে সুস্থতার হার অনেক বেশি, মৃত্যুহার কম। কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্মক। খবর যা শুনছি, তাতে মনে হয় না খুব তাড়াতাড়ি এর টিকা বাজারে চলে আসবে। সে ক্ষেত্রে লড়াই করে বাঁচার কথা ভাবার সময় এখনই। তাই বেশি করে প্রচার করতে হবে, কঠিন আইন করতে হবে এর ছোঁয়াচ থেকে বাঁচার জন্য। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরা, স্যানিটাইজ়ার ব্যবহার, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় নজর রাখা প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সাবধানতা যাতে জনগণ কঠোর ভাবে মেনে চলেন, সে দিকে নজর দিতে হবে। পুজোকে উৎসবে পরিণত করলে নিয়মবিধি মান্যতা পাবে না। ফলে সংক্রমণ বাড়বে।

এই মহাবিপর্যয়ের মুহূর্তে দেশের মানুষ দেখলেন চিকিৎসাব্যবস্থার কঙ্কালসার অবস্থা। হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে বা রাস্তায় পড়ে রোগী মারা যাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ টাকা বিল মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হতে হচ্ছে। অধিকাংশ হাসপাতালে এখনই বেডের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই এই রোগে আক্রান্তদের সুচিকিৎসার জন্য দেশের ও রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রভূত উন্নতির প্রয়োজন। পুজোর বাজেট কমিয়ে এ দিকে খরচ বাড়ানো যেতে পারে।

দেশের ভেঙে-পড়া অর্থনীতিতে বিধ্বংসী ধস, বেনজির অধোগতি। লকডাউনের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। বেকারত্ব সর্বোচ্চ। দেশে প্রবল খাদ্যসঙ্কট। মানুষের হাতে নগদ অর্থের অভাব। অনেকে খাবার কিনতে পারছেন না। বাজারে কেনাকাটা ভীষণ কম। কাজের অভাবে আর্থিক সঙ্কটে পড়া চাষি, শ্রমিক, দিনমজুর ও পরিযায়ী শ্রমিকের আত্মহত্যার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই পুজোর খরচ কমিয়ে গরিব, দুঃস্থদের নগদ অনুদান দিলে ওঁদের সঙ্গে বাজার অর্থনীতির উন্নয়নও সম্ভব হত। গণেশ চতুর্থীকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রে করোনার তীব্র সংক্রমণ ঘটেছিল। দেশজুড়ে প্রতিটি রাজ্যে যখন ক্রমেই বাড়ছিল করোনা সংক্রমণ, সেই সময়ে তা দ্রুত কমিয়ে ফেলেছিল কেরল। ‘কেরল মডেল’ বিশ্বের প্রশংসা পেয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহেই ছবিটা পাল্টে গেল। এখন দেশের সব রাজ্যের গড়ের তুলনায় বেশি হারে সংক্রমণ বাড়ছে কেরলে। হঠাৎ এই বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, এ রাজ্যে গত দু’মাসে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ বাইরে থেকে এসেছেন। কেরলের সবচেয়ে বড় ‘ওনাম উৎসব’কে কেন্দ্র করে বহু মানুষ বাড়ির বাইরে এসেছেন এবং সামাজিক মেলামেশাও ঘটেছে। এ রাজ্যেও প্রতি বছর দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাইরে থেকে মানুষজন আসেন এবং সামাজিক মেলামেশাও হয়। তাই মহারাষ্ট্র, কেরলকে দেখে আমাদের শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

প্রতি বছর পুজো আসবে। আমরা আবার সেই আনন্দে মাতব। আনলক পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে বেশ কিছু মানুষের লাগামছাড়া জীবনযাপন করা দেখে পুজোয় সংযম, সর্তকতা রক্ষার বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ‘এ বছর, এই একটি বছর’ নিজের জীবনের স্বার্থে, পরিজনের তথা সমাজের স্বার্থে যদি অবাধ মেলামেশা, হুল্লোড় বন্ধ থাকে, তবে জনগণ অনেক শান্তি ও নিশ্চিন্ত জীবন উপহার পাবেন।

 

গৌতম পতি

তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

 

কিন্তু মিছিল?

‘এই বারটি সংযত থাকুন’ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আকুল আবেদন পুজোর উদ্যোক্তা ও জনগণের কাছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত এই আবেদন। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে জীবিকার তাগিদে সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি নিয়ে একসঙ্গে অনেকে মিলে যাতায়াত বা কাজকর্ম করতে হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মিছিল, মিটিং করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। মিছিল মিটিং-এ যাঁরা আসছেন, তাঁরা কি সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবেন আগামী দিনে? জমায়েত কোভিড সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জমায়েত প্রক্রিয়াতে বিরতি একান্ত কাম্য। কারণ, রাজনৈতিক দল আমাদের নাগরিক চিন্তাধারা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আয়না। বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ, চিকিৎসক সংগঠন প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা জারি রেখেছে জনগণের কাছে। কিন্তু মিটিং-মিছিল না করার কোনও বার্তা বা নির্দেশ নেই। আশাহত হয়েছি, বিশিষ্টদের লিখিত নিবন্ধেও রাজনৈতিক দলের প্রতি জমায়েত না করার আবেদনের অনুপস্থিতিতে। 

শ্রাবণী স্বপন চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা-৩২

 

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন