Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদক সমীপেষু: অপার করুণা

১৬ এপ্রিল ২০২১ ০৪:৩১

অরিন্দম চক্রবর্তীর ‘পরধর্ম নিন্দা বর্জনীয়’ (৪-৪) প্রসঙ্গে এই লেখা। ভারতের প্রতিটি ধর্মের মূলে আছে অপার, অসীম করুণা। ধর্ম যখন হৃদয়বৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি করতে পারে না, তখন তা ধর্মই নয়। ধার্মিক আর ধর্মান্ধ এক নয়। ধর্মান্ধ মানুষ সমস্ত ধর্মেই কম বেশি চিরকাল ছিল, আছে, থাকবে। এদের দিয়ে কারও কোনও রকম উপকার হওয়ার নয়। এই ধরনের মানুষের হৃদয়ের দৈন্যতা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু যখন পরিকল্পনা করে ধর্মান্ধের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়িয়ে তোলা হয়, মারমুখী করে তোলা হয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের বাঁচা, হাঁটা-চলা, খাদ্য, পোশাকের মধ্যে বিভেদ ঢুকিয়ে তাদের শত্রু মনে করা হয়, তখনই ভয় জাগে। এটা টুকরো-টাকরা হিংসা নয়, আটঘাট বেঁধে আক্রমণ। এই ধরনের কৌশলের বিরুদ্ধে লড়তে পারা ভারতের দরিদ্র মানুষের পক্ষে সহজ নয়। একমাত্র ভরসা মানুষের শুভবুদ্ধির উপর, হৃদয়ের মায়া, দয়ার উপর, জ্ঞান এবং শিক্ষার উপর, ইতিহাস চেতনার উপর। যদিও ভারতীয়রা সেই করুণা হারিয়ে ফেলছে ক্রমশ।

তবুও কখনও কখনও দয়ার প্রকাশ চোখে পড়ে বইকি। এই যেমন দেশব্যাপী লকডাউনের সময় যখন রাস্তা দিয়ে দলে দলে মানুষ হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা খাদ্য, জল দিয়েছেন। দরিদ্র শ্রমিক মানুষজন পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে চাল-ডাল সংগ্রহ করে পথচলতি মানুষদের খাদ্য দিয়েছেন।

এই দায়িত্ব বা দয়া যা-ই হোক না কেন, তা এক দিনে আসেনি। এ আমাদের দীর্ঘ দিনের জীবনদর্শনের ফল। জীবনবোধের এই সহমর্মিতার জায়গায় ক্রমশ ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে লাভ তুলছে এক শ্রেণির লোক। এ দেশে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে সব সময় দিয়েছে এবং নিয়েছে। ভালর আদান-প্রদানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভারতের কাঠামো। ধর্মই কেবল নয়, ভাষা, খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সঙ্গীত-বাজনা, জীবনযাপন সবেতেই ভারতের মিশ্র সংস্কৃতি। কত খাদ্য এল কত জাতি থেকে, ভাষার কত শব্দ এল কত ভিন্‌ধর্মের মানুষের কাছ থেকে, পোশাক এল কোন সে অজানা দেশের মানুষের হাত ধরে। আজ যা কিছু আমরা ‘আমাদের’ বলে চিৎকার করি, তা কি কেবল আমাদের? আমরা অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করে নিজের করে তুলেছি।

Advertisement

কেউ কারও থেকে বড় বা মহৎ নয়। সবাই তার নিজের মতো। সে জন্য এ দেশ যতটা হিন্দুর, ঠিক ততটাই মুসলমানের। যতটা ব্রাহ্মণের, ততটাই দলিতেরও। জীবনযাপনের বিভিন্নতা আছে, খাদ্য, পোশাক, ভাষার বৈচিত্র আছে। ঠিক তেমনই প্রতিটি মানুষের মর্যাদা আর সম্মানের সাম্য থাকাটা জরুরি।

চম্পা খাতুন

কলকাতা-৯৯

সেই পথ

অরিন্দম চক্রবর্তীর নিবন্ধটির প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার জন্য এই চিঠি। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, যত মত, তত পথ। বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয় সাধন ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। ঠাকুর কথাটি বলার আগে রীতিমতো বিভিন্ন ধর্মমতে সাধনা করেছেন। কবীর, নানক, শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধ সবার উপরে মানুষকে স্থান দিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে মা সারদার এক মুসলমান ভক্ত আমজাদের কথা স্মরণ করতে পারি। আমজাদ ছিলেন এক জন ডাকাত। মা তাঁকে নিজের হাতে খেতে দিয়েছিলেন। এমনকি খাওয়ার শেষে এঁটো থালা পরিষ্কারও করেছিলেন। আমজাদের পরিচয় সম্পর্কে মাকে মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি দৃঢ়স্বরে বলেছিলেন, “আমার শরৎ যেমন ছেলে, ওই আমজাদও তেমন ছেলে।” শরৎ মহারাজ মায়ের দেখাশোনা করতেন। তাঁর সন্ন্যাস নাম স্বামী সারদানন্দ। সে যুগে ব্রাহ্মণ বাড়ির বিধবা ধর্মনিরপেক্ষতার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন। তাই এই ছোট্ট ঘটনাটির গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে যখন দেশকে ধর্মীয় মেরুকরণের মোড়কে মুড়ে ফেলার অবিরাম চেষ্টা চলছে, তখন মা সারদার এই ঘটনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভগিনী নিবেদিতাকেও সন্তান জ্ঞানে অতি আপন করে নিয়েছিলেন মা সারদা।

দিনের পর দিন সমাজ ও রাজনীতির আঙিনা সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত হচ্ছে। ধর্ম ও রাজনীতি একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠছে। ভোটের ময়দান ধর্মীয় মেরুকরণে কলঙ্কিত। ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি আমাদের পরম্পরা, ঐতিহ্যকে গ্ৰাস করে ফেলছে। আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন, এই শাশ্বত বোধ হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিবিধের মাঝে মহান মিলনের সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের পথে। অথচ, আজ থেকে বহু বছর আগে শ্রীশ্রীমায়ের সেই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ভেঙে দিয়েছিল ‘আমরা-ওরা’ বিভাজন।

গৌতম পতি

তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

বিকল্পের খোঁজ

শিলাদিত্য সেনের অনুলিখনে কৌশিক সেন ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘ঢেউ উঠবে, কারা টুটবে’ (৩-৪) একটি সময়োপযোগী আলাপন, আর এ নিয়েই আমার কিছু কথা। রাষ্ট্র কোনও কালেই ভিন্ন স্বর পছন্দ করে না, সহ্যও করে না, ইতিহাসের সাক্ষ্য এমনই। আমাদের দেশও এমনটাই দেখে এসেছে, আজও তাই দেখছে। এ ক্ষেত্রে শাসককে আলাদা আলাদা নামে চিহ্নিত করার কোনও প্রয়োজন আছে কি? মানতেই হবে, আজকের বিজেপির দায় স্বাভাবিক ভাবেই একটু বেশি। কারণ, তারা এই দুষ্ট শিকড়টি উপড়ে ফেলতে পারেনি বা চায়নি। বরং গাছটির গোড়ায় জল জুগিয়েছে, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করে শিল্প-সংস্কৃতির নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছে। এ রাজ্যের পরিস্থিতিও তা-ই— বর্তমান শাসক তৃণমূল কংগ্রেস নামটিই শুধু আলাদা এখানে। গাজ়িয়াবাদে সফদার হাশমির খুন আর এখানে এসপ্ল্যানেডে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো প্রবীর দত্তকে ভুলে যাওয়া যেমন অপরাধ, তেমন অপরাধ উৎপল দত্তের দুঃস্বপ্নের নগরী-র দুঃস্বপ্ন বিস্মৃত হওয়া, বা পশুখামার-কে রেড কার্ড দেখানো।

সুমনবাবুর উপলব্ধি, শিল্পীরা আজ বিচ্ছিন্ন। শাসকসৃষ্ট ভয়ের আবহাওয়াকে এ জন্য দায়ী করেছেন তিনি। যদিও আগের অবস্থা এমন ছিল না— রাজনৈতিক মতান্তর, মনান্তর ছিল, কিন্তু নিজের নিজের শিল্পগত অবস্থান থেকে তাঁরা নড়তেন না, পারস্পরিক সৌহার্দও বজায় রাখতেন। শাসকের চোখরাঙানি তখনও ছিল, আজও আছে, সত্য এটাই। সুমনবাবুদের তাই বলব, আপনারা নিজেদের দিকে তাকান, খুঁজুন নিজেদের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা। অর্থনীতির চাকা, সন্দেহ নেই, গতি হারিয়েছে। ওই চাকায় তেল দিতে হবে ব্যাকরণ মেনে। সরকারকে এই কাজে বাধ্য করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন গণআন্দোলন। সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বা নিবন্ধ লিখে এ কাজ হওয়ার নয়। কৌশিকবাবু কৃষক আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন। প্রশ্ন, এ তো পঞ্জাবি কৃষকদের আন্দোলন। সারা দেশের কৃষকেরা এই আন্দোলনে বাস্তবে কি অন্বিত? বিজেপি-বিরোধিতা করতে গিয়ে সত্য-বিচ্যুতি ঘটছে না তো? বিজেপি সরকার যে তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করেছে, তা অবশ্যই বিস্তৃত আলোচনা-বিতর্ক ছাড়াই— এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কয়েকটা প্রশ্ন রাখতে চাই।
১) সিএএ আইন কি কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে? আফগানিস্তান, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও তো মানুষ। তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন-নির্যাতন আমাদের হৃদয় স্পর্শ করবে না? (২) ‘লেসার ইভিল’ বা ‘মাচ মোর ইভিল’ এ সব তর্কে যাব না, আব্বাস-প্রশ্নে বিষণ্ণতায় বামপন্থীদের পরিবর্তে তৃণমূলকে সমর্থন করা কৌশিকবাবুদের পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু ২০১১-তে রাজ্যপাট হারানো বামপন্থীরা এক দিন ফিরে আসবেই ইতিহাসের নিয়মে, আজকের সাত পার্সেন্টকে খাটো চোখে দেখাটা কিন্তু দলিলে থেকে যাবে চিরকাল। ১৯৮৪-র বিজেপির দুটো আসন কিন্তু আজ ৩০৩ হয়েছে।

৩) বিজেপি বিরোধিতায় অন্ধ না হয়ে ভাবা দরকার বিজেপি কেন আজ প্রায় সারা ভারতে এমন শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত, কোনও জাদুবলে নিশ্চয়ই নয়। কৌশিক-সুমনবাবুরা কী বলেন?

বিপ্লব গুহরায়

চাকদহ, নদিয়া

আরও পড়ুন

Advertisement