এত দিন ধরে তাদের থাকতে দিলাম। নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড দিলাম। তাদের ভোট নিলাম। এর পর তাদের বললাম, তোমরা এ দেশের নও। আচ্ছা পঞ্জিকরণটা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আর্যদের আসার সময়কাল থেকে হলে কেমন হয়? আর্য, শক, হুন, পাঠান, মোগল, নেপালি, বাংলাদেশি, সবাই আউট। থাকবে কেবল ‘অরিজিনাল’ ভারতবাসী। তবেই শুদ্ধ হবে পঞ্জিকরণ!

কিংকর অধিকারী

বালিচক, পশ্চিম মেদিনীপুর

 

চেঁচামেচি কেন

সীমান্ত উন্মুক্ত, বিএসএফ প্রহরা তেমন ছিল না, এই সুযোগে পূর্ব পাকিস্তান (পরে বাংলাদেশ) থেকে অবাধ বিদেশি অনুপ্রবেশ চলছিল। গত সত্তর ও আশির দশকে কয়েক বছর ধরে অসমে বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আন্দোলন হয়, পরে অসমের ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ‘অসম চুক্তি’ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধী। বর্তমানে অসমে যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির খসড়া তৈরি হয়েছে, সেটা রাজীব গাঁধীকৃত অসম চুক্তির ভিত্তিতেই। তিন বছর ধরে ৫৫ হাজার কর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই খসড়া, যার তদারকিতে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সুতরাং এই খসড়া তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের হইচই চেঁচামেচি বেমানান ও অস্বস্তিকর।

কেউ বলছেন, এটা বাঙালি বিতাড়নের চক্রান্ত এবং ভোটের কথা মাথায় রেখেই মূলত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। নিশ্চিত করে বলা যায়, নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনেই নাগরিক পঞ্জির খসড়া তৈরি হয়েছে। এনআরসি একটি ‘বাঙালি খেদাও’ চক্রান্ত বলে এ রাজ্যের মানুষদের বিভ্রান্ত করা উচিত নয়। অনুমান, ডিসেম্বরের মধ্যে আরও পাঁচ-সাত লক্ষ মানুষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে এনআরসি-র তালিকাভুক্ত হতে পারবেন। স্বভাবতই বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষে এনআরসি-র বিধি অনুযায়ী যাবতীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই ওঁদের নাম খসড়া তালিকায় স্থান পায়নি। যাঁদের নাম বাদ পড়বে, তাঁঁরা বাংলাদেশি। ভোটের কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাবুরা অর্বাচীনের মতো কথা বলছেন।

পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ অসমের থেকেও ভয়াবহ বলেই এখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৩০% ছাড়িয়ে গিয়েছে, দেশভাগের পর যা ছিল মাত্র ১০%। পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে রাজনৈতিক বাবুদের উদাসীনতা ও নির্লিপ্ত ভাব খুবই দুশ্চিন্তার কারণ। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সত্ত্বেও অসম ও পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। পাসপোর্ট নিয়ে আসা বাংলাদেশিদের একাংশ এখানেই থেকে যান।

অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, তাই অসমিয়ারা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করতে পেরেছেন, পশ্চিমবঙ্গে সেই সচেতনতার অভাব রয়েছে। জাতীয় স্বার্থেই সারা দেশে এনআরসি হওয়া উচিত।

কিশোর পালচৌধুরী

কল্যাণী, নদিয়া

 

সংজ্ঞা জানুন

কাকে বলা হবে অনুপ্রবেশকারী আর কে-ই বা শরণার্থী? এই নিয়ে রাজ্য ও দেশ জুড়ে নেতা-নেত্রীগণ তাঁদের সুবিধেমতো শব্দ দু’টির ব্যাখ্যা করছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত সনদের ১৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এক জন শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হলেন, "A person who owing to a well founded fear of being persecuted for reasons of race, religion, nationality, membership of a particular social group or political opinion; is outside the country of his nationality; and is unable to or owing to such fear is unwilling to avail himself of the protection of that country or return there because there is fear of persecution." (Adopted on 28th July 1951 by United Nations Conference of Plenipotentiaries on the Status of Refugees and Stateless Persons ).

ওই সনদে আরও বলা হয়েছে, উপরোক্ত পাঁচটি কারণ ছাড়া অন্য কোনও কারণে যদি কেউ তাঁর নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে ঢোকেন, তা হলে তাঁকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে; তাঁকে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বলা যাবে না। সুতরাং, পূর্ব-পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে যে কোটি কোটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্মের মানুষজন, যাঁরা ধর্মীয় কারণে ওখানে অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়েছেন এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে এই বিভক্ত পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন— তাঁরা রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অনুযায়ীই উদ্বাস্তু বা শরণার্থী।

এ ছাড়াও, ভারত ও পাকিস্তানের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত দু’টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রথম চুক্তি, যেটি নেহরু-লিয়াকত চুক্তি নামে পরিচিত, স্বাক্ষরিত হয়েছিল ৮ এপ্রিল ১৯৫০ সালে। পরবর্তী কালে এ সংক্রান্ত আর একটি চুক্তি, নেহরু-নুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে। দু’টিতেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, স্ব-স্ব দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হলে যে দেশে তাঁরা প্রবেশ করবেন সেই দেশে তাঁদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হবে। সেই হিসেবে, পূর্ববাংলা থেকে অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত হয়ে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষদের শরণার্থী হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তাঁদের সমস্ত ধরনের সুযোগসুবিধা দিতে হবে।

কিন্তু, পূর্ববঙ্গ থেকে কোনও মুসলমান ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে ভারতে আসেননি, তাঁরা এসেছেন অন্য কারণে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী অথবা উপরোক্ত দু’টি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলিমরা তাই অনুপ্রবেশকারী, এখানে বসবাসের কথা নয় তাঁদের।

এ ছাড়াও, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পরে এ সংক্রান্ত আরও একটি চুক্তি হয় যেটি ‘ইন্দিরা-মুজিব’ চুক্তি নামে পরিচিত। ভারত চুক্তির ধারাগুলি মানলেও, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এগুলি কখনওই মানেনি।

এমতাবস্থায়, আমাদের রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল, কংগ্রেস এবং হতোদ্যম বামপন্থী দলগুলির কাছে অনুরোধ, দেশভাগ, হিন্দু-মুসলিম সমস্যা, শরণার্থী, অনুপ্রবেশকারী, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে মন্তব্য করার আগে বিষয়গুলি সম্পর্কে জেনে নিন। দেশভাগের ইতিহাসটাও ভাল করে পড়ুন, তার পর মন্তব্য করুন।

বিনয়ভূষণ দাশ

গোপজান, মুর্শিদাবাদ

 

মমতার লাভ

সেমন্তী ঘোষের লেখা (‘দুর্ভাবনা কমছে কই’, ৩-৮) অত্যন্ত সময়োপযোগী। হঠাৎ অসমে এনআরসি নিয়ে মাতামাতির মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতি। বিজেপি কৌশলে ইসুটাকে নিয়ে যেমন হিন্দু তাস খেলে বাজিমাত করতে চেয়েছে, ঠিক একই ভাবে সপাটে ফুলটস বলের প্রাপ্য ব্যাটিং করে মমতা ঠিক সময়ে তাঁর ধরন অনুযায়ী রাজনীতি করে দিয়েছেন। তাতে যেমন মুসলমানরা বুঝবেন মমতা তাঁদের মসিহা, তেমনই অসমের নাম বাদ যাওয়া হিন্দুদেরও সহানুভূতি মমতার পকেটে ঢুকবে। আর এখানেই বিজেপির বাড়া ভাতে ছাই পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

শুধু এক সপ্তাহ সময় চাই। কারণ ওইটুকু সময়ের মধ্যে বিজেপির পুঙ্গবরা নাম না থাকা লোকজনদের হুমকি/অত্যাচার শুরু করলেই, বিজেপির পক্ষে ওই আগুন নেভানোর ক্ষমতা থাকবে না। তৃণমূলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঢুকতে না দিলেও সেটা সর্বত্র প্রচার পেয়েছে। এর ফল কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধেই যেতে চলেছে। আর এখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির পরিপক্বতা প্রমাণ হচ্ছে।

আশিস কুমার ভট্টাচার্য

ইমেল মারফত

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।