সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘সে বারও শরৎকাল, বৃষ্টির মধ্যে যেন ভয়ঙ্কর আক্রোশ’ (২৪-৯) শীর্ষক রচনাটি মনোগ্রাহী। ১৯৭৮ সালের সেই তিন দিন জুড়ে অতিবর্ষণের প্রথম দিনটি আজও স্মৃতিতে অম্লান। হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিটের অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দুপুরবেলা আর এক ছোটবেলার বন্ধুকে সঙ্গী করে প্যারাডাইস সিনেমায় ডন দেখতে গেলাম। তবে শেষ লগ্নে আমাদের জুতো ভিজে যাওয়ায় তড়িঘড়ি বাইরে বেরিয়ে এসে যা দেখলাম, তাতে ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেল। গোটা দুপুর জুড়ে প্রবল বৃষ্টিতে এসপ্ল্যানেড চত্বর জলের তলায়। বৃষ্টি থেমেছে দেখে আমরা জল ঠেলে পায়ে হেঁটে কার্জ়ন পার্কে এসে হাজরাগামী একটি মিনিবাসের পাদানিতে প্রায় ঝুলন্ত অবস্থায় হাজরা মোড় এলাম।
সেখান থেকে আবার হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, যেখানে আমার বন্ধুটির বাড়ি। সায়েন্স কলেজের উল্টো দিকে এসে বন্ধুকে যখন বিদায় জানালাম তখন রাত আটটা, কোথাও কোমর-জল, কোথাও হাঁটু-জল। সময় তো লাগবেই। এর পর আমি একা জল ভেঙে গড়িয়াহাট পর্যন্ত চলতে থাকি এবং বালিগঞ্জ শিক্ষাসদনের সামনে প্রায় বুক অবধি জল পাই। গন্তব্য, গড়িয়া। আশ্চর্য, ঠিক গড়িয়াহাটের মোড়ে জল জমে নেই। তবে হাজার মানুষের জমায়েত ওই জায়গাটিতে। বাস, ট্যাক্সি কিছু চলছে না। বাজারের সামনে একটা ম্যাটাডোর থেকে হঠাৎ দৈববাণীর মতো ‘গড়িয়া, গড়িয়া’ ধ্বনি শোনা গেল। হাতে যেন চাঁদ পেলাম, অতঃপর আরও জনাত্রিশেক সর্বাঙ্গ সিক্ত সহযাত্রীর সঙ্গে গড়িয়া অভিমুখে যাত্রা। পরবর্তী দু’দিনও বিপর্যয় ছিল, তবু শুনেছিলাম গড়িয়া থেকে ঢাকুরিয়া বাস পরিষেবা অটুট রাখা সম্ভব হয়েছিল।
তাপস চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-৩৯
দায়ী নাগরিকও
২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত-আট বছর কলকাতায় ছাত্র-জীবন কাটিয়েছি। তখনও বৃষ্টি হত। জল জমত। নিউ মার্কেট সংলগ্ন অঞ্চল বা শিয়ালদহ সংলগ্ন অঞ্চলে থৈ থৈ জল দেখেছি। হাঁটু জলে রাস্তাও হেঁটেছি। কিন্তু সম্প্রতি যে ছবিগুলি ফুটে উঠছে, তা একবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এটা যেন এক প্রকার বিপর্যয়! কলকাতার এই অবস্থাতেও দেখতে পাচ্ছি অনেকেই বিভিন্ন ভাবে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বাইরে শুধুমাত্র বিরোধিতার মানসিকতা থেকে এমন সব প্রসঙ্গ তুলছেন, যা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সত্যিই অস্বস্তিকর, অমূলকও।
অনস্বীকার্য যে, সরকারি কাজে কিছু শিথিলতা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই বিপর্যয়ের জন্য শুধুমাত্র সরকারকে একতরফা ভাবে দায়ী করা ঠিক নয়। যে ভাবে বা যে মাত্রায় একনাগাড়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা বিগত ৩০-৪০ বছরে হয়েছে কি না সন্দেহ! এটাতে যেমন একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্রকৃতির উপর মানুষের সীমাহীন অত্যাচারের পরিণতির ছবি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এমন সব কার্যকলাপ মানুষ করে চলেছে, যার ফলে বিপর্যয় নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ঘন ঘন বিভিন্ন জায়গায় ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ তারই উদাহরণ। পরিবেশবিদরা এই মেঘভাঙা বৃষ্টির সংখ্যা বৃদ্ধিকে পরিবর্তিত জলবায়ুর অন্যতম ফল হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
অন্য দিকে, শুধু কলকাতা নয়, বিভিন্ন শহর, এমনকি গ্রামগঞ্জেও দেখেছি ব্যাপক হারে প্লাস্টিকের ব্যবহার। প্লাস্টিকের ঢাকা, খাবার রাখার পাত্র, কৌটো-সহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন সরঞ্জামে চার দিক ছেয়ে গেছে এবং মানুষ নির্বিচারে এগুলোকে যত্র তত্র ফেলছে। প্লাস্টিক বর্জ্য-সহ বাড়ির আবর্জনা পার্শ্ববর্তী ড্রেনে ফেলতেও হামেশাই দেখা যায়। তার ফলে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে বৃষ্টির দিনে বড় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সুতরাং এই বিপর্যয়ের সময় দায় ঠেলাঠেলির কচকচানি না বাড়িয়ে সমস্যাগুলির সমাধানে এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় সহানুভূতি দিয়ে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। উৎসবের দিনে তিলোত্তমা কলকাতাকে সুন্দর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
পাশাপাশি নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। যে ভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে, তার দায় শুধুমাত্র সরকারের উপর না চাপিয়ে নিজেরাও এমন কিছু কাজ করি, যা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে, দূষণ কমাবে। নাগরিক হিসাবে সেটিও আমাদেরই দায়িত্ব। উৎসবের দিনে ভাল থাকুক পশ্চিমবঙ্গ, এই আশাই করছি।
জাহির আব্বাস, শক্তিগড়, পূর্ব বর্ধমান
জল-আতঙ্ক
‘রাতভর বৃষ্টির সঙ্গী গঙ্গার বান, বিপর্যস্ত হাওড়া’ (২৪-৯) শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে কিছু কথা সংযোজন করতে চাই। প্রতিবেদনে ওয়র্ড-৯’এর উল্লেখ না থাকায় হতাশ হলাম। আমাদের এলাকা ওই ওয়র্ডের মধ্যেই পড়ে। এখানে জল-যন্ত্রণা এক নারকীয় রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের কেউ খোঁজ নেয় বলে মনে হয় না। একটা সময় ছিল পানীয় জলের সমস্যা। কিন্তু তৎকালীন কাউন্সিলর বিভাস হাজরার উদ্যোগে অবশেষে পানীয় জলের সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু জল জমার সমাধান নেই। আমার বাড়ির সামনে নর্দমা উপচে রাস্তায় জল সারা বর্ষার সঙ্গী। হালকা বৃষ্টি হলেই সেই জল সিঁড়ির তলায় ঢুকে যাচ্ছে। পুরসভার ভোট হয়নি দীর্ঘ দিন। ফলে কোনও কাউন্সিলর না থাকায় এই সমস্যার কথা জানানোর উপায় নেই। নিয়মিত নর্দমাও পরিষ্কার হয় না।
হাওড়ার অধিকাংশ জায়গাই উপযুক্ত পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে। জমা জলের পাশাপাশি আরও এক বড় সমস্যা রাস্তার চরম খারাপ অবস্থা। প্রতি বছর বর্ষার পর রাস্তা মেরামতি করতে পুরসভা উদ্যোগী হয়। আবার কয়েক দিনের মধ্যেই তা খারাপ হয়ে যায়। বার বার টেন্ডার ডাকা ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে আবারও বানানো হয় রাস্তা। প্রশাসন নির্বিকার। কাজের সময়ে পুরসভার কোনও ইঞ্জিনিয়ারকে দাঁড়িয়ে কাজের তদারকি করতে দেখা যায় না। এলাকার দাপুটে নেতার তদারকিতেই রাস্তা মেরামতি হয়। এটাই এই জেলার দস্তুর! ফলে পরিকল্পনাবিহীন রাস্তা অল্প বৃষ্টিতেই মরণফাঁদ হয়ে ওঠে। কোথাও দেখলাম না নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনের সদর্থক উদ্যোগ। যেখানেই জল জমে, সেখানেই সমাধান হিসাবে শুধুমাত্র রাস্তা উঁচু করার প্রয়াস দেখি। সদ্য বাইপাস থেকে হাওড়া ময়দান অবধি রাস্তা কিছুটা মেরামতি হল পেভার ব্লক দিয়ে। ব্যস্ততম রাস্তা সহজে বানানো হল, কিন্তু বড় ভারী গাড়ির ভার বহন ক্ষমতার কথা ভাবা হল না। কত দিন টিকবে এই রাস্তা সেটাই প্রশ্ন। পাশাপাশি রাস্তার দুই ধার উঁচু হয়ে আছে। কোনও নর্দমা নেই। ফলে অল্প বৃষ্টি হলেই সেই জল চৌবাচ্চার মতো রাস্তায় জমে যাচ্ছে। পেভার ব্লক উঠে যাচ্ছে এবং পিচের আস্তরণ থাকলেও তা নষ্ট হচ্ছে। এমন অদূরদর্শিতার পরিণাম মারাত্মক, ভুগতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে। এই জলযন্ত্রণা থেকে কবে মুক্তি মিলবে?
স্নেহাশিস সামন্ত, দাশনগর, হাওড়া
বইপাড়ার পাশে
সাম্প্রতিক আকাশভাঙা বৃষ্টির কারণে এক রাতের মধ্যে গোটা কলকাতা ভেসে গিয়েছিল। বাদ যায়নি সবার প্রিয় বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটও। প্রায় সব বইয়ের দোকানেই জল ঢুকেছে। নষ্ট হয়েছে প্রচুর বই। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেই সব ছবি। স্বাভাবিক ভাবেই বাঙালির বৃহত্তম উৎসব দুর্গাপুজোর আগে এই দুর্যোগে মাথায় হাত বই ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বইপ্রেমী মহলের। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে কলেজ স্ট্রিট। অনুরোধ জানাই, বইপাড়ার পাশে দাঁড়ান। বই কিনুন, বই উপহার দিন। স্কুল-কলেজের গ্রন্থাগারগুলিতে এই সমস্ত বই কম টাকা দিয়ে হলেও কেনা হোক। যাতে বই ব্যবসায়ীরা আগামী দিনে এই ক্ষতি সামলে উঠতে পারেন।
শুভজয় সাধু, শ্রীরামপুর, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)