‘সঙ্ঘ রুখতে সিপিআইয়ের হাতে বেদ পুরাণ’ (১৪-১০) সংবাদটি প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। সিপিআই-এর দিল্লির প্রকাশনা সংস্থা পিপলস পাবলিশিং হাউস (পিপিএইচ) বিপণিতে ১৯৭৪ সালে বাণী দেশপান্ডের লেখা ‘ইউনিভার্স অব বেদান্ত’ বইটি বিক্রি হত। বইটি সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টি রুশ ভাষায় অনুবাদ করে পার্টি স্কুলের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তও করে। বইটির মরাঠি অনুবাদ হয়। হিন্দিতে অনুবাদ হয় ‘মার্ক্সবাদী দর্শন কি বৈদিক পরম্পরা’ নামে। সেই সময় সিপিআই-এ গোটা দেশ জুড়ে গেল গেল রব পড়ে গিয়েছিল বইটি নিয়ে নয়, বইটির ভূমিকা লেখককে নিয়ে। ভূমিকা লিখেছিলেন সিপিআইয়ের তৎকালীন চেয়ারম্যান শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে (এস এ ডাঙ্গে)। প্রসঙ্গত, বাণী দেশপান্ডে ছিলেন সম্পর্কে ডাঙ্গের জামাতা। চেয়ারম্যান ডাঙ্গের ভূমিকা নিয়ে সিপিআইয়ের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলী কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনে সিপিআইয়ের বহু বিদগ্ধ তাত্ত্বিক তাঁদের মতামত পেশ করেন। অধিকাংশ রক্ষ‌ণশীল সদস্য ডাঙ্গের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সিপিআই নেতা এম ফারুকি, এস জি সরদেশাই, গঙ্গাধর অধিকারী থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমালোচনায় সরব ছিলেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, জগদীশ দাশগুপ্ত, দিলীপ বসু, নরহরি কবিরাজ। কমিশনে প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর এস এ ডাঙ্গে বলেছিলেন একটাই কথা, ‘‘যথেষ্ট হয়েছে, আমার লেখাটা তোমরা আর একবার পড়ে দেখো।’’ কেরল সিপিআই সম্ভবত সাড়ে চার দশক পর সেই কাজটি শুরু করল।

ওই বইয়ের ভূমিকায় ডাঙে কী লিখেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, সময়ের প্রেক্ষ‌াপটে বেদের মূল্যায়ন করা উচিত। এটিও ইতিহাসের অংশ। কার্ল মার্ক্সের বহু আগে ভারতীয় সমাজ বিবর্তনের ধারা বুঝতে বেদকে অস্বীকার করা যায় না। ডাঙে কখওনই মার্ক্সের বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সঙ্গে বেদের সাযুজ্য সন্ধান করেননি। কিন্তু সে দিন সিপিআই-এর রক্ষ‌ণশীল নেতৃত্ব পার্টির চেয়ারম্যানকে অপদস্থ করতে ওই বইয়ের ভূমিকাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ৪৫ বছর পর কার্যত ডাঙে-র সে দিনের সেই নির্দেশিকা মেনে কেরল সিপিআই পার্টির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ডি রাজাকে দিয়ে ‘ভারতীয়ম ২০১৯’ শীর্ষক তিন দিনের আলোচনা চক্রের আয়োজন করছে। ১৯৯১-তে ডাঙে মারা গিয়েছেন। ২০১৫ সালে বাণী দেশপাণ্ডেও মারা গিয়েছেন। সিপিআই-এর সে দিনের ডাঙের সমালোচক রক্ষ‌ণশীল নেতৃত্বের ভূমিকা আজ কি তবে দলে সমালোচনায় স্থান পাবে? 

তবে শুধু ডাঙে নন, সিপিআই নেতা ভবানী সেন ও সিপিএম নেতা ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদও বেদ, পুরাণ, উপনিষদ ও মহাকাব্যে সমকালীন সমাজ মূল্যায়নের উপাদান হিসেবে দেখতে গিয়ে দলে সমালোচিত হয়েছেন। 

সুকুমার মিত্র

কলকাতা-১২৫

অষ্টমীর দিনে
অষ্টমীর দিন। হোস্টেল পৌঁছলাম। হোস্টেলের পাশেই আবাসিকদের পুজো, ঢাকের আওয়াজে উৎসবের দ্যোতনা উপেক্ষা করে চললাম অন কল রুমের দিকে। আমাদের হেডস্যর বলেন, ডাক্তারদের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের কোনো যোগাযোগ থাকে না— যে তারিখ, যে বার, যে দিনই হোক; ডাক্তারদের প্রস্তুত থাকতে হয় সব সময়। ওয়ার্ডে ঢুকলাম।
ওয়ার্ডে এক বার ঢুকে পড়ার সুবিধা হল, তার পর আর কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না— পুজো, বাড়ি, মনখারাপ ইত্যাদি কোথায় যেন উড়ে যায়। এ-কাজে সে-কাজে দিনটা মোটামুটি খারাপ কাটছিল না। ওয়ার্ডের সিস্টারদের দৌলতে রাতে বেশ গরম খিচুড়িও জুটেছিল। এমন সময় ইমার্জেন্সি থেকে দাদা ফোন করে জানাল, একখানা হেমাটেমেসিস (অর্থাৎ রক্তবমি) পেশেন্ট এসেছে, ভর্তি করতে হবে। মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল।
কিছু ক্ষণের মধ্যেই ঘরঘর শব্দে ট্রলি এসে উপস্থিত হল ওয়ার্ডের দরজায়, সে দৃশ্য একবার দেখলে ভোলার নয়। বছর তেইশ-চব্বিশের এক যুবক, আর তার চার দিকে সেই 'coffee ground vomitus'-র সমুদ্র। ছেলেটা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে, আর অনবরত নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে রক্তবমির বন্যা বইছে। পাল্‌স নেই, বিপি পাওয়া যাচ্ছে না। দেখে মাথা গুলিয়ে গেল, crystalloid, colloid, blood, sengstaken blakemore tube, endoscopy ইত্যাদি অনেক কিছুই মাথায় এল; কিন্তু শুধু জেটে স্যালাইন দেওয়া ছাড়া কোনও কিছুই করা হয়ে উঠল না। আস্ত সতেজ একটা প্রাণ চোখের সামনে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শেষ হয়ে গেল ওই ট্রলিতেই, বেডে অবধি তোলা গেল না।
যেটুকু জানতে পেলাম, ছেলেটার কোনও নেশাই ছিল না। মাঝে মাঝেই নাকি জ্বর আসত, নিজের মতো ওষুধ নিয়ে খেয়ে নিত। এই করে দিন পাঁচেক আগে পেটে ব্যাথা, গ্যাস ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়, সেখানে রক্তবমি শুরু করায় তাকে রেফার করা হয়। সময় মতো ডেথ সার্টিফিকেট লেখার খাতা এল, কে জানত আরও একটা ধাক্কা অপেক্ষা করে আছে— রোগীর বাবার নামের আগে 'Late' বসানো!
এক জন আত্মীয় দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে। গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, ওর বাবা যখন মারা যান, ওর তখন দু’বছর বয়স। জিজ্ঞাসা করলাম, কোনও ভাই, বোন আছে? উত্তর এল, না। 
আমরা আমাদের রোজকার জীবনের ছোটখাটো না পাওয়া, রাগ, দুঃখ, এ সব নিয়ে ভেবেই কাটিয়ে দিই। এ দিকে মহাষ্টমীর রাতে এক বিধবা তাঁর একমাত্র সন্তান হারালেন। এই কষ্টের যে কী পরিমাপ, কত গভীর তার তাৎপর্য, তা অনুধাবন করার মতো ক্ষমতা আমার ছিল না, ভবিষ্যতেও কোনও দিন হবে কি না জানিনা।
কোনও মৃত্যু যতই মর্মান্তিক হোক, সেটা কাটিয়ে উঠে জীবিতদের সেবার জন্যে প্রস্তুত হওয়াই এক জন ডাক্তারের ধর্ম। সেই ধর্ম মেনেই পরদিনের রাউন্ডও হল। বিকেলে রাউন্ডে এসে শুনলাম আমাদের অন্য এক জন পেশেন্টও মারা গেছেন। এই খবরটার জন্যে যদিও প্রস্তুত ছিলাম— এক অশীতিপর বৃদ্ধ, সেপ্টিসেমিয়া, সম্ভবত ক্যানসারও ছিল— এই মৃত্যুটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। রাউন্ড দিতে গিয়ে দেখি ওঁর ছেলে শূন্য নয়নে তাকিয়ে আছেন। কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়াতেই বাচ্চার মতো কাঁদতে শুরু করলেন, ‘‘ডাক্তারবাবু, মা-ও গেছে, বাবাও চলে গেল।’’
রাউন্ড সেরে বেরিয়ে এলাম। কলকাতা নববধূর সাজে সেজেছে, নবমীর রাতে উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়। সেই আলোর ভিড়ে মনের ভেতরের অন্ধকারটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠল! এই এত উৎসব- আয়োজন, মানুষের জীবন এ-সব পেরিয়েও প্রতিনিয়ত বয়ে চলেছে মৃত্যুর পানে।
সত্যিই "Our life is but a winter’s day; Some only breakfast and away; Others to dinner stay and are full fed; The oldest man but sups and goes to bed; He that goes soonest has the least to pay."
শুভাংশু পাল
জুনিয়র ডাক্তার

এসএসকেএম হাসপাতাল, কলকাতা

আবাসিক
‘আবাসিকদের ঘর ছাড়ার নোটিস,...’ (১৪-১০) শীর্ষক খবরের প্রেক্ষিতে জানতে চাই, কোনও বাড়িতে কাউকে এক বার থাকতে দেওয়ার অর্থ কি তাকে (বা তাদের) সারা জীবন থাকতে দেওয়া? দীর্ঘ দিন ধরে এই ব্যাপারটা এ রাজ্যে একটা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়েছে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সস্তা রাজনীতি। আবাসিক/ ভাড়াটেদের চিরস্থায়ী করার এ রকম দাবি বিশ্বের সভ্য শহরগুলোর আর কোথাও আছে কি? জানি না, এ দেশেরও অন্য কোনও শহরে এ রকম আশ্চর্য পরিস্থিতি আছে কি না। 
সুকুমার রক্ষিত
সম্পাদক, অল ক্যালকাটা হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন