‘অসুরক্ষিত’ (৩০-১২) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি আমাদের দেশের কয়েক কোটি মহিলা শ্রমিকের বিপন্নতাকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। সরকারি দফতরে, সরকারি পরিকল্পনায় এ রাজ্যে কাজ করে চলেছেন লক্ষ লক্ষ মহিলা শ্রমিক। শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বহু নতুন আইন, নিয়মনীতি রচিত হয়েছে। কিন্তু আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড-ডে মিল, এনআরএলএম— এ রকম বহু দক্ষ শ্রমিক থেকে গিয়েছেন সরকারি সমস্ত নিয়ম-নীতির বাইরে। সরকার কৌশলে ‘স্বেচ্ছাসেবক’ বলে এঁদের প্রতি সমস্ত সরকারি দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করছে। এই তকমার আড়ালে ২৪ ঘণ্টার ‘বাধ্যতামূলক শ্রম’-কে স্বেচ্ছাশ্রম বলে চালানো হচ্ছে। এ শুধু নারী-শ্রমিকের অমর্যাদা নয়, এক ধরনের প্রতারণাও বটে।
গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে এ রাজ্যে প্রায় ৭০ হাজার আশাকর্মী লাগাতার কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের চার মাসের ইনসেন্টিভ ও দেড় বছর পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের টাকা দেওয়া হচ্ছে না। ভাগে ভাগে টাকা দেওয়ার ফলে কোনও হিসাব মিলছে না। বকেয়া থাকাটা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আশাকর্মীদের মূল কাজ মায়ের মৃত্যু, শিশুমৃত্যুর হার কমানো, মা ও বাচ্চাকে পরিষেবা দেওয়া। সরকারি স্বাস্থ্য দফতরের অধীনে থেকে পরিষেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে মায়ের মৃত্যু, শিশুমৃত্যুর হার কমিয়েছেন এই কর্মীরা। এই কারণেই, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন তাঁদের ন্যাশনাল রুরাল হেলথ মিশন (এনআরএইচএম)-এর ‘স্তম্ভ’ আখ্যা দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় এঁদের ‘গ্লোবাল লিডার্স হেলথ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও করোনা বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য নানা সম্মানে ভূষিত করেছেন, ওঁরা ‘বঙ্গ জননী’ আখ্যা পেয়েছেন। কিন্তু করোনা পরিষেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হলে যে এক লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা হয়েছিল, সে টাকা তাঁরা পাননি।
নিরলস ভাবে অন্যের মাতৃত্ব, অন্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করা, অন্যের সন্তানের যত্ন নিতে শেখানোই এঁদের মূলমন্ত্র। কিন্তু এই সমাজসেবীদের প্রয়োজনীয় মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনও সরকারই নিশ্চিত করেনি। আজ শুধু স্বাস্থ্য নয়, দুয়ারে সরকার, ভোট, বোর্ড পরীক্ষায় ডিউটি, আবাস যোজনার ডিউটি, পিকনিক স্পটে ডিউটি, পথের ঘাটে মলমূত্র ত্যাগের বিরুদ্ধে সতর্কতা অভিযান, শাসক দলের বড় বড় সভা সমাবেশে ভিড় সামলানোর ডিউটি— বিবিধ কাজে এঁদের ব্যবহার করা হয়। এ কাজে ঝুঁকি আছে, হয়রানি আছে, অসম্মান আছে, কিন্তু কোনও পারিশ্রমিক নেই। সরকারি জনমোহিনী প্রকল্পকে জনপ্রিয় করতে এঁদের ব্যবহার করা হয়, এতে কর্মীরা গার্হস্থ জীবন এবং কর্মজীবন মেলাতে পারেন না। না পারলে আছে নিরন্তর জবাবদিহি ও টাকা কেটে নেওয়া। অতিরিক্ত কাজের কোনও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ও শ্রমসময় গ্রাহ্য করা হয় না।
ভোটবৈতরণি পার করার জন্য বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু পুজোর আগে, ইদের আগে এঁরা ভাতা পান না। ফলে এই অবহেলিত শ্রমিকদের যথার্থ মর্যাদা দিতে হলে প্রয়োজন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং এঁদের সম্মানজনক বেতন কাঠামো স্থির করার জন্য সুষ্ঠু নীতি নির্ধারণ।
ইসমত আরা খাতুন, রাজ্য সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন
পুনর্ব্যবহার
বর্তমান পরিবেশ দূষণের সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পরিমাণে জমে থাকা বর্জ্য এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এই পরিস্থিতিতে এই বিপুল জমে থাকা বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনাই একমাত্র পথ, যা শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয় কর্মসংস্থানের এক বিপুল বাজারও খুলে দিতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে তাকে পৌঁছনো, প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মূল লক্ষ্য হল পরিবেশ দূষণ হ্রাস করা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক দিকে যেমন পরিবেশের উপর মানুষের ক্রিয়াকলাপের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়, তেমনই কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সুযোগ তৈরি হয়। বর্জ্য থেকে নতুন পণ্য তৈরি, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য-ভিত্তিক শক্তি উৎপাদন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে (সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ) প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
পরিবেশের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব যথেষ্ট। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভাগাড় বা অন্যান্য স্থানে বর্জ্যের পরিমাণ কমে, যা নানা ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন আটকায় এবং বায়ুদূষণ হ্রাস করে। সঠিক পদ্ধতিতে বর্জ্য নিষ্কাশন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করে এবং বর্জ্যের পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ ও শক্তির সাশ্রয় করা যায়। এ ছাড়াও, বর্জ্য থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র উদ্ধার করে নতুন পণ্য তৈরি করা যায়, যা নতুন বাজার সৃষ্টি করে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটায়।
পার্থ প্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান
বিকল্প পথ
‘পরিবেশের বন্ধু নয়’ (২২-১২) শীর্ষক চিঠিতে সৌম্যজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির প্রতিকূল প্রভাব সম্পর্কে যা লিখেছেন, তা খুবই সময়োপযোগী এবং প্রাসঙ্গিক। এই প্রসঙ্গে কিছু কথা যোগ করতে চাই।
লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার কমাতে হলে গণপরিবহণের ক্ষেত্রে ট্রামের কোনও বিকল্প নেই। ট্রাম এক দিকে যেমন পরিবেশবান্ধব পরিবহণ, তেমনই অন্য দিকে এতে শক্তি সঞ্চয় করে রাখার জন্য ব্যাটারির দরকার পড়ে না। ফলে ব্যাটারি-চালিত গাড়িতে চার্জ দেওয়ার ও ব্যবহারের সময় যে শক্তির অপচয় হয়, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। ট্রামের যাত্রিধারণ ক্ষমতা বাসের থেকেও বেশি হওয়ায়, এতে পরিবেশের উপর জনপ্রতি প্রভাবও অনেক কম পড়ে। শহরাঞ্চলে গাড়ির আধিক্য যানবাহনের গতিশীলতার একটা বড় প্রতিবন্ধক। দূষণ বাড়ার একটা প্রধান কারণ হল বড় গাড়ির প্রতি মানুষের মোহ। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। এক জন বা দু’জনের জন্য বড় গাড়ির ব্যবহার শুধু শক্তির অপচয় নয়, তা রাস্তার পরিসর ও পার্কিং স্পেস কম করে বাকি যানবাহনের গড় গতি প্রভাবিত করে। ছোট গাড়িতে কম শক্তিশালী ব্যাটারি লাগে। ছোট গাড়ির সংখ্যা বাড়লে জনপ্রতি রাস্তার পরিসরও বাড়বে, দূষণও কমবে।
দূষণ কমাতে হলে এক দিকে যেমন মেট্রো নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে, তেমনই মেট্রো স্টেশনে পৌঁছনোর জন্য উপযুক্ত সংখ্যক ট্রাম, ইলেকট্রিক বাস বা ট্রলিবাসের মাধ্যমে ফিডার সার্ভিসের ব্যবস্থা করতে হবে। অটো, টোটো ও দু’চাকার গাড়ির উপর মানুষের নির্ভরতা কমলে রাস্তা আরও উন্মুক্ত হবে। কলকাতার উপকণ্ঠে, বিশেষত নিউ টাউনে ট্রাম চালানোর প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে দেশের ভিতরে যাতায়াত ব্যবস্থাকে শক্তি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করতে হলে একটা দীর্ঘকালীন ও বহুমাত্রিক পরিকল্পনা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনই প্রয়োজন রয়েছে নাগরিক চেতনারও।
শৌভিক মজুমদার, কলকাতা-৫৫
চক্ষু দান
‘যুবকের দৃষ্টিদান’ (১৮-১২) খবরের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। হৃদ্রোগে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে একের পর এক হাসপাতালে দৌড়ে, পথচলতি মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে স্বামী মারা যান। যে সমাজ ওই ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য ন্যূনতম সাহায্যটুকুও করেনি, সেই সমাজকেই মৃত স্বামীর দু’টি চোখ দান করেছেন তাঁর স্ত্রী। ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর হলেও, গোটা দেশ এর থেকে শিক্ষালাভ করুক।
অঞ্জন কুমার শেঠ, কলকাতা-১৩৬
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)