E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: লাইনে দাঁড়াও!

সংবাদপত্রের ছবি দেখেই বিস্ময়ে হতবাক হচ্ছি। আশি-ঊর্ধ্ব এক জন মানুষ, অসুস্থ শরীর নিয়ে শুনানির দিনে বিডিও অফিসে হাজিরা দিচ্ছেন!

শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৩

‘এই ভোগান্তি কেন, ক্ষোভ প্রথম দিনে’ (২৮-১২) শীর্ষক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। ইতিপূর্বে, ২০০২ সালে, এই কাজটি বেশ নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছিল। তখন জানতেই পারিনি বিশেষ নিবিড় ভোটারতালিকা সংশোধনের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে! এ বারে বহু শিক্ষিত ও বয়স্ক মানুষকে উদ্‌ভ্রান্তের মতো নথিপত্র জোগাড় করতে দেখেছি; আবার কত জন শুধু আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। খসড়া ভোটারতালিকা প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু তা নিয়েও জনগণের মধ্যে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ বলা হচ্ছে, খসড়া তালিকায় নাম থাকলেই যে চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকবে— তার নিশ্চয়তা নেই।

শুরু হয়েছে শুনানি পর্ব। সংবাদপত্রের ছবি দেখেই বিস্ময়ে হতবাক হচ্ছি। আশি-ঊর্ধ্ব এক জন মানুষ, অসুস্থ শরীর নিয়ে শুনানির দিনে বিডিও অফিসে হাজিরা দিচ্ছেন! বছরের একেবারে শেষ পর্যায়ে এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে ভাবে অসুস্থ মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হাসপাতালের পরিবর্তে সরকারি আধিকারিকদের করিডরে হাজির হচ্ছেন, তাতে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘গণতন্ত্র’, এই শব্দ দু’টির যথার্থ প্রয়োগ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠে আসে।

২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে জ়েরক্স কপির লাইন আর ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে সিংহভাগ ভারতীয় এমনিতেই ক্লান্ত ও অবসন্ন। তবু হয়রানি থামেনি। নোটবন্দির দগদগে ক্ষত এখনও সাধারণ মানুষ সামলাতে পারেনি। এক জন কালো টাকার মালিকের নামও প্রকাশ্যে এসেছে? প্রতি দিন ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন রোখা যাচ্ছে না, অথচ রাষ্ট্র সন্দেহ করছে নিজের নাগরিকদেরই! সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে এগোনোর বদলে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে প্রান্তিক মানুষদের আরও কোণঠাসা করা হচ্ছে। যাঁরা দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন, তাঁরাই এখন নথিপত্র জোগাড়ে ব্যস্ত। স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার কমিয়ে বয়স্ক মানুষদের কার্যত আধমরা করে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেল জুড়ে শুধুই উন্নয়নের জয়গান, অথচ বাস্তবে সাধারণ গরিব মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা।

এত কিছুর পরেও জনগণ নির্দেশ মেনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ধর্মীয় উন্মাদনা আর নিত্যনতুন সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা সফল ভাবেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিবাদ যে একেবারেই হচ্ছে না, তা নয়— কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে কিছু বলা বা সমালোচনা করলেই তো এখন রাষ্ট্রদ্রোহের তকমা জোটে। জুড়ে যায় ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ অপবাদ। ফলে ভয়ে ভয়ে আমরা হেলে সাপের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।

উপরতলার মানুষের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সুনিশ্চিত করে, নিচুতলার মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলার এক সূক্ষ্ম পরিকল্পনার বাস্তব রূপ কি আজকের ভারত? সামান্য ভোটারতালিকা সংশোধনের নাম করে যে গভীর অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, তার থেকে কবে মুক্তি মিলবে— সে প্রশ্নের উত্তর বোধ হয় স্বয়ং রাষ্ট্রের কর্তারাও দিতে পারবেন না।

রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি

অমানবিক

‘এই ভোগান্তি কেন, ক্ষোভ প্রথম দিনে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ে এবং সঙ্গে সুব্রত জানার তোলা অ্যাম্বুল্যান্সে শায়িত অসহায় বৃদ্ধের ছবিটি দেখে সর্বশরীরে রাগ ছড়িয়ে পড়ল। অসুস্থ শরীরেও তাঁকে শুনানিতে হাজিরায় বাধ্য করা হল!

নির্বাচন কমিশন কী ভাবে এতটা অমানবিক হতে পারে, তা এই ছবিটি না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। কমিশনের কেউ যদি সামান্য কষ্ট করে তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজটি করতেন, তবে কী সমস্যা হত? কমিশনের এই ধরনের আচরণকে সমর্থন করার অর্থ সরকারি স্বেচ্ছাচারিতাকে বাহবা দেওয়া। প্রবীণ নাগরিকদের এ ভাবে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই, কথাটি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

অরুণ গুপ্ত, কলকাতা-৮৪

প্রকৃত তাত্ত্বিক

শিশির রায়ের ‘শতবর্ষের স্বপ্নজাহাজ’ (রবিবাসরীয়, ২১-১২) প্রসঙ্গে ব্যাটলশিপ পোটেমকিন নিয়ে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। আমেরিকান চলচ্চিত্রকার জে লিডা সের্গেই আইজ়েনস্টাইনের ছাত্র, ভক্ত ও বন্ধু ছিলেন। তিনি লিখেছেন— ১৯২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর। পৃথিবীর বুকে প্রথম ব্যাটলশিপ পোটেমকিন প্রদর্শিত হয় মস্কোর বলশয় থিয়েটারে— শুধুমাত্র উচ্চস্তরের আমন্ত্রিত পার্টি বুরোক্র্যাট এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে কর্মরত কমরেডদের জন্য। সে দিন প্রায় শো-টি বানচাল হয়ে যাচ্ছিল, কারণ তখনও ছবির কিছু দৃশ্যের এডিটিং চলছিল। ছবির ক্যামেরাম্যান এডওয়ার্ড তিসে প্রথম কয়েকটি রিল নিয়ে হলে হাজির হয়েছিলেন। স্ক্রিনে যখন পোটেমকিন-এর প্রথম রিল ফুটে উঠছে, তখনও আইজ়েনস্টাইন এডিট রুমে বসে শেষ রিলটি কাটাকুটি করে চলেছেন। ...কিছু ক্ষণের মধ্যেই আইজ়েনস্টাইন আরও কয়েকটি রিল নিয়ে হলে পৌঁছে যান। আধ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সহকারী গ্রিগরি আলেকজ়ান্দ্রভ শেষ রিলটি ব্যাগে ভরে ঝড়ের গতিতে বাইক ছোটান। ছবি তৈরি করে গরম গরম পরিবেশন করা সাইলেন্ট যুগেই সম্ভব ছিল, কারণ ল্যাবে পাঠিয়ে ছবি ও শব্দের ম্যারেড প্রিন্ট বার করার দীর্ঘ ঝকমারি তখনও ছিল না। আলেকজ়ান্দ্রভ যখন বলশয় থিয়েটারের পাঁচ-ছয়টি সিঁড়ি এক লাফে পেরিয়ে প্রোজেকশন রুমের দিকে ছুটছেন, তখন হলের ভিতরে হর্ষধ্বনি, হাততালি আর রেড স্যালুট ফেটে পড়ছে।

অথচ প্রায় তিন সপ্তাহ পরে, ১৯২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি, মস্কোর দ্বিতীয় শ্রেণির হলগুলিতে কোনও ক্রমে ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটির বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়া হয়। পরে এক দল লেখক ও পার্টি কর্মীর চাপে কর্তৃপক্ষ ছবিটিকে বিদেশে প্রদর্শনের অনুমতি দিতে বাধ্য হন। প্রথম প্রদর্শনী হয় বার্লিনে, সেখানে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

রাশিয়ায় ছবিটি প্রাপ্য সমাদর পায়নি। প্রথমত, রাশিয়ার বামপন্থী মহলে ধারণা ছিল, বিপ্লব নিয়ে ছবির বিদেশে বিশেষ বাজার নেই। এই কূপমণ্ডূকতা ব্যাটলশিপ পোটেমকিন-এর সাফল্যের পর ভেঙে যায়। দ্বিতীয়ত, শভেদচিকভ ইহুদিবিদ্বেষ ও বুর্জোয়া হাবভাবের জন্য কুখ্যাত ছিলেন; আড়ালে তিনি আইজ়েনস্টাইনকে বিদ্রুপ করতেন। তৃতীয়ত, কমিউনিস্ট পার্টির একটি অংশ আইজ়েনস্টাইনকে মনে করত আঙ্গিকসর্বস্ব, থিয়োরি কপচানো, পণ্ডিতমন্য এক আঁতেল, যাঁর সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ নেই।

কিন্তু আমৃত্যু তিনি যে বিপুল লেখালিখি করে গিয়েছেন, তাতেই স্পষ্ট, আইজ়েনস্টাইন ছিলেন সিনেমার প্রকৃত তাত্ত্বিক।

সুগত সিংহ, কলকাতা-১৯

ধোঁয়াশার লক্ষণ

শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়ে দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়— এটাই কুয়াশা। কিন্তু ধোঁয়াশা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক বেশি উদ্বেগজনক। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলিকণা ও পোড়ানো বর্জ্য দূষকের সঙ্গে কুয়াশা মিশে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। ফলে বাতাসে সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বেড়ে যায়, শ্বাসযন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

শহর ও শহরতলিতে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কুয়াশায় এমন উপসর্গ দেখা যায় না। দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে তবেই ধোঁয়াশার লক্ষণ স্পষ্ট হয়। শীতের এই ধূসর আচ্ছাদন কুয়াশা না ধোঁয়াশা, জানা জরুরি। কারণ কুয়াশা এক সময় কেটে যায়, কিন্তু ধোঁয়াশা স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রবল ক্ষতিকর।

অক্ষয় বর্মণ, আসানসোল,পশ্চিম বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal SIR Election Commission of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy