দেশের বার্ষিক বাজেট বর্তমানে কেবল আর্থিক বিবরণী, করের হারের হেরফের, ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা এবং ছড়ানো-ছেটানো কিছু ভাবনা ঘোষণার একটি দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কার্যত উপেক্ষা করেছেন— যেমন আমেরিকার শুল্কনীতি, বাণিজ্য ঘাটতি, গ্রোস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন-এর নিম্ন হার, প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতির ধীর গতি, মূল্যস্ফীতির তথ্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে অসঙ্গতি, বেকারত্ব এবং নগর পরিকাঠামোর ক্রমাগত অবনতির কারণে নির্মাতা ও রফতানিকারকদের সম্মুখের সঙ্কট ইত্যাদি। এ সব বিষয়ে নির্মলা সীতারামনের বাজেটে কোনও দিশা নেই।
একটি মুক্ত বাজার-অর্থনীতি যখন ক্রমশ একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপান্তরিত হয়, তখন দেশ বা রাজ্যের সরকার প্রায়ই সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে বাজেটের মাধ্যমে চাহিদা সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগের উপযোগী বাজার-পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়। এই প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানব উন্নয়ন বা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নও প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সরকার ধারাবাহিক ভাবে কর্পোরেট ক্ষেত্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করায় এই ধরনের সমস্যার মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট জনসমষ্টির কাছে নগদ স্থানান্তরভিত্তিক প্রকল্প চালু করে নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের বাইরে আর কোনও দূরদর্শী ভাবনা দেখা যায় না। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে জনসাধারণের সমস্যার সমাধানের এক ধরনের ভ্রম তৈরি করা হয়। অনেক রাজ্যই সেই পথে হেঁটেছে। সেই অর্থে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন একটি হতাশাজনক বাজেট পেশ করেছেন, যা বড়জোর চলমান নীতির ধারাবাহিকতা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। অভূতপূর্ব বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এটি কোনও দৃঢ় সঙ্কল্পের পরিচয় বহন করে না। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার দৃঢ়তার পরিবর্তে সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে বলেই মনে হয়, এবং তার ফলস্বরূপ বিশেষত গ্রামীণ ক্ষেত্রে কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও মন্ত্রীর দূরদৃষ্টির অভাব। তরুণদের চাকরির উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে তিনি ‘কনটেন্ট’ তৈরির প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগকে ভরসা জুগিয়েছেন। অথচ অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের কর্মজীবনের সম্ভাবনার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে প্রস্তাবিত উদ্যোগের স্পষ্ট অসামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়।
অভিজিৎ রায়, জামশেদপুর
আতঙ্ক ছড়িয়ে…
তূর্য বাইনের ‘ডাক্তার আসার পরেও’ (৩-২) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই চিঠি।ভোটার তালিকার সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতি বছরই এতে নতুন নাম যুক্ত হয়, মৃতদের নাম বাদ যায়। অথচ এ বার নির্বাচন কমিশন এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি যেমন ব্যাপক দুর্নীতি, ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি, সীমাহীন বেকারত্ব, মহিলাদের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া ইত্যাদি সবই আড়ালে পড়ে গিয়েছে। বহু অনিশ্চয়তার ফলে অসংখ্য মানুষ আজ আতঙ্কিত। নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তাদের তাড়া করছে। অথচ এমন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির কোনও প্রয়োজন ছিল না। তা হলে এই পদক্ষেপ কেন?
আসলে এসআইআর-এর মাধ্যমে আদৌ কোনও অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হোক বা না হোক, রাজ্যে এই আতঙ্ক সৃষ্টিই ছিল মূল লক্ষ্য। সরকার তার অপদার্থতার দায় জনগণের ঘাড়ে চাপাতে পারে না। জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা, সংখ্যালঘু মানুষকে ‘বিদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার যে কেন্দ্রীয় প্রবণতা, এসআইআর-এর মাধ্যমে সেটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মানুষকে এসআইআর-এর নামে অস্তিত্বের সঙ্কটে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
স্পষ্টতই, এসআইআর-এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা তৈরি করা বা প্রকৃত নাগরিক চিহ্নিত করা নয়। জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি থেকে ক্ষুব্ধ মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়ে তাকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৃত্রিম ও জটিল আবর্তে ফেলে দেওয়া— এটাই মূল লক্ষ্য বলে প্রতিভাত। এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল, এক অংশের মানুষের ত্রাতা সেজে অন্য অংশকে সন্ত্রস্ত রেখে সেই ভয়কে পুঁজি করে ভোটব্যাঙ্ক শক্তিশালী করা।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
অনিশ্চিত আবহ
তূর্য বাইনের লেখা ‘ডাক্তার আসার পরেও’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে, এটাই সাধারণ নাগরিকের একমাত্র আশা। কিন্তু গত পনেরো বছর ধরে এ রাজ্যে যে কোনও নির্বাচন ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও রক্তক্ষয় দেখতে হয়েছে, তা অন্য কোনও রাজ্যে এত ঘন ঘন দেখা যায় না। এখানে সব সময়ই নির্বাচন করতেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রয়োজন হয়। তাই যখন ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কথা শোনা গেল, তখন অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন, নতুন দিনের আশায় বুক বেঁধেছিলেন।
কিন্তু শুরু থেকেই, ফর্ম পূরণের পর্যায়ে বলা হচ্ছিল যে কোনও ভুল চলবে না; ভুল হলে আবেদন বাতিল হতে পারে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে সীমাহীন উদ্বেগ তৈরি হয়। এর পর নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তহীনতা, বিশেষত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ‘আধার’ কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা এবং বয়সের প্রমাণ হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের দিশাহীনতার মূল্য চোকাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।
এসআইআর ঘিরে শাসক ও বিরোধী শিবিরের তুমুল তাণ্ডব রাজ্য জুড়ে শুরু হয়, যা অনভিপ্রেত বললেও কম বলা হয়। মুসলিম ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বিজেপি নেতাদের তর্জন-গর্জন যখন আকাশবিদারী, তখন ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও আগাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক ভাবেই, তা এক শ্রেণির মানুষের মনে গভীর আতঙ্কের সঞ্চার করে। অন্য দিকে, এসআইআরের বিরুদ্ধে শাসক দলের অবস্থান ছিল প্রথম থেকেই বিরোধিতার। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রতিবাদে তাদের রাস্তায় নামতেও দেখা গিয়েছে।
যে নির্বাচন কমিশন সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়েই এতটা পর্যুদস্ত, তারা কি হিংসা-কবলিত এই রাজ্যের আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভাবে পরিচালনা করতে পারবে, এই প্রশ্নই আজ সাধারণ মানুষের মনে উঠতে শুরু করেছে।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
ইতিবাচক দিক
‘গৃহকর্মীদের মজুরি বাঁধায় সায় নেই, ইউনিয়নে ভয়’ (৩০-১) শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহসহায়কদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের আর্জি শুনতে গিয়ে এক জায়গায় বিচারকের মন্তব্যে পড়লাম, বহু বনেদি শিল্প ঝান্ডাবাজ ইউনিয়নের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু কথা জানাতে চাই। মালিকদের মুনাফা নিশ্চিত করতে প্রশাসন শ্রম আইনগুলি ছেঁটে চারটি শ্রম কোডে রূপান্তর করেছে। এর ফলে শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বহু অধিকার কার্যত খর্ব হয়েছে। অন্য দিকে, মালিক পক্ষকে দেওয়া হয়েছে প্রায় একচ্ছত্র ক্ষমতা। আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা কাজের সময় আইনসিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অর্থাৎ ইউনিয়ন গঠন ও ধর্মঘটের অধিকারও নানা শর্তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই দেশ জুড়ে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিলেও, এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দাবির লক্ষ্য ছিল ইতিবাচক। ন্যায্য মজুরি, সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল দাবি।
ইন্দ্র মিত্র, কলকাতা-৩১
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)