বিশ্বজিৎ রায়ের ‘সবাই রাজা হওয়ার প্রস্তুতি’ (৯-৫) শীর্ষক নিবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের প্রতি এক প্রথাগত শ্রদ্ধাঞ্জলি বলে মনে হল। গত ৭৫ বছরে, বিশেষত উত্তর-আধুনিকতার উন্মেষ ও বিস্তারের ফলে, নানা চিন্তনের স্রোত-প্রতিস্রোতে অবগাহিত এই পৃথিবী বোধ হয় আর কোনও রবীন্দ্রনাথ বা গাঁধীকে মুশকিল-আসান ভাবার জায়গায় নেই। মহাপুরুষরা চিরকালই ছিলেন— ১৯৯৯ সালে ফরাসি পার্লামেন্টে টিনটিনকে নিয়ে এক বিতর্কের সময় যা বলা হয়েছিল, তা-ই— 'neither right nor left, but upright'. এই ‘upright’ থাকা একটি ইউটোপিয়ান  ধারণা, বিশেষত গণতন্ত্রের ভোট-রাজনীতিতে। প্রকৃত প্রস্তাবে, গণতন্ত্র জনগণ আর সরকারের মধ্যে একটা ক্ষমতার ভারসাম্যের খেলা। রবি ঠাকুরের কাছে না গিয়েও সাধারণ মানুষ উগ্রতার কুফল বুঝে যেতে পারেন। বিশ্বকবিকে সর্বরোগহর ভাবার ইতি হবে কবে?

চন্দন আশিস লাহা

ডিরেক্টর, দূরশিক্ষা বিভাগ, 

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়

 

কষ্টকল্পনা

‘সবাই রাজা হওয়ার প্রস্তুতি’ নিবন্ধে, লেখক রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখাকে উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে তিনি নেশনবাদ এবং সমাজবাদ, দুয়েরই বিপক্ষে ছিলেন। কারণ দুই মতবাদই মানুষের ব্যক্তিত্বকে একই  ছাঁচে গড়তে চায়। আজ রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে বোধ হয় এখনকার বাজার অর্থনীতিকেও, ওই একই কারণে, খুব একটা ভাল চোখে দেখতেন না। কারণ, যতই বাজার অর্থনীতি ‘চয়েস’ বা মানুষের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার কথা বলুক, আসলে এই চয়েস খুবই সীমিত। এবং কারা ওই বাজারের খরিদ্দার হবেন, তাও অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। তা হলে এর থেকে বেরোনোর উপায় কী? রবীন্দ্রনাথ যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বলে লেখক লিখেছেন, এবং তার জন্য যে প্রস্তুতির কথা বলেছেন, তা সত্যি কত জনের পক্ষে নেওয়া সম্ভব? কবে সমস্ত মানুষের ভিতর থেকে তার নিজস্বতাকে প্রকাশ করার বোধ জাগ্রত হবে, আদৌ হবে কি না, তা খুবই অনিশ্চিত। তাই মনে হয় রবীন্দ্রনাথের এই সমাজচিন্তা অভিপ্রেত হলেও, এক প্রকার কষ্টকল্পনা বা ইউটোপিয়া। 

সুকন্যা মিত্র

কলকাতা-৬

 

দল ও ব্যক্তি

প্রবন্ধটা পড়তে গিয়ে, রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে ধারণা নিয়ে একটু খটকা লাগল। উনি মনে করতেন, ব্যক্তি নিজেই উপলব্ধি করবেন তাঁর সামাজিক দায়িত্বের কথা। এটা আজকের নিরিখে একটু অবাস্তব বলে মনে হয়, যেখানে কৃত্রিম চাহিদা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা পুঁজিবাদের এক ফাঁদ— বিশ্ববাজারের জায়গা করে দেওয়ার জন্য। প্রয়োজন তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন ভাবে, বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য। সেখানে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব জন্মানোর আগেই সেটার মৃত্যু হচ্ছে। ফলে উপলব্ধি তো দূরের কথা, সামাজিকতা বোধটাই জন্মাচ্ছে না।

আজকের পৃথিবীতে, দলীয় নির্দেশে ছাঁচে-ঢালা মানুষ না হলেও, সমাজের স্বাভাবিক গতিতে জন্ম নিচ্ছে এক একাকী মানবশিশু, সে একাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে তার নানা ডিজিটাল গ্যাজেট পরিবৃত হয়ে। সমাজে থেকেও এরা সমাজ-বিচ্যুত থাকতে চায়, কারণ এরা সমাজের মানুষের সঙ্গে মিশে কোনও আনন্দ পায় না। এই অবস্থাটার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়নি, হওয়ার কথাও নয়, কারণ সমাজ পাল্টায় এবং নানান ভঙ্গিতে পাল্টায়। 

নেশনবাদ যে ‘বলের বন্যায়’ ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, রবীন্দ্রনাথ তা বুঝেছিলেন। এটাও বুঝেছিলেন, ক্যাডার-নির্ভর বামপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলি ব্যক্তিস্বরের বিভিন্নতাকে খুবই ভয় করে, তাই দলীয় নিয়ন্ত্রণকেই সেখানে খাড়া করতে হয় সেই স্বর স্তব্ধ করার জন্য। কিন্তু সে ভাবে তো আজকে দলের প্রভাব ফলানো হয় না, কারণ সে দলীয় শৃঙ্খলা বা শাসন আজ কোনও দলেই নেই। আজ দলের ক্যাডারদের কাছে দলীয় আদর্শের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি নিজের স্বার্থকে চরিতার্থ করা। আর দলের কাছেও একমাত্র উদ্দেশ্য শাসনক্ষমতা দখল, নির্বাচনে সাফল্য। দল দেশ নিয়ে ভাবে না, কাজেই আদর্শের প্রয়োজন কোথায়, আর যেখানে আদর্শের প্রয়োজন নেই, সেখানে কী দরকার ক্যাডারদের নিজের আদর্শের ছাঁচে ঢালার? থাক না এই দলে কিছু দিনের জন্য, ওদের উদ্দেশ্য সফল হলেই চলে যাবে। তাই দেখি, ডান থেকে বাম, বাম থেকে ডান— অনবরত চলছে একই মানুষের আসা-যাওয়া। 

অম্লান রায়চৌধুরী

কলকাতা-৮৪

 

প্রেক্ষাপট

‘ইতিহাসের পরিহাস’ (১-৫) শীর্ষক চিঠির প্রেক্ষিতে কিছু কথা। জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ যখন নাইট খেতাব ত্যাগ করেন, তখন তাঁর পাশে কেউ ছিলেন না, আবার চিত্তরঞ্জন, গাঁধী প্রমুখ তেমন ভাবে সাড়াও দেননি— ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে ঠিক মনে হলেও, ইতিহাসের নিরিখে প্রেক্ষাপটটি কিন্তু বিচার্য।

মনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ যখন নাইট খেতাব ত্যাগ করার মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন, তখন কারও সঙ্গে পরামর্শ করেননি। এমনকি ঘনিষ্ঠ অনুরাগীদেরও এ বিষয়ে আগে কিছু জানাননি। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি নিজেই একাকিত্ব বরণ করে নিয়েছিলেন। এ-ও মনে হওয়া অসম্ভব নয়, ‘সাময়িক উত্তেজনার বশে’ তিনি নাইট উপাধি ফিরিয়ে দেন। ‘রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী’ গ্রন্থের লেখক সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত তেমনটাই দাবি করেছেন। মজার কথা, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এ বিষয়ে নিজেকে আর জড়াননি। সতীশবাবুও তাই না বলে পারেননি, ‘‘তারপরই (কবি) এমন অসম্পৃক্ত হইলেন যেন ঐ (প্রতিবাদ) পত্রের সহিত তাঁহার কোন সম্পর্ক নাই’’ (পৃ ১৮৩)। একটা জিনিস ভুললে চলবে না, ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নাইট উপাধি গ্রহণ করেন, স্বদেশি বিপ্লবীদের ওপর ইংরেজ সরকারের নির্মম অত্যাচারের মাত্রা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছিল। দেশের এই চরম দুর্দিনে তাঁর উপাধি গ্রহণ, তাই তখনকার অনেক জাতীয়তাবাদী নেতার কাছে খুব একটা মানানসই মনে হয়নি। অমল হোমকে লেখা শরৎচন্দ্রের একটা চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি, মনের দুঃখে চিত্তরঞ্জন তখন চোখের জল সামলাতে পারেননি। ফলে কবির এই উপাধি ত্যাগের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। অনেকের কাছে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে অনেকে আবার নির্লিপ্ত ভাবও দেখিয়েছেন।

স্মরণীয়, জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মহাত্মা গাঁধী প্রমুখ মৌনী হয়ে বসে থাকেননি। তীব্র সমালোচনায় তাঁরা ইংরেজকে এমনই বিদ্ধ করতে থাকেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সরকারও ‘হান্টার কমিটি’ তৈরি করতে বাধ্য হয়। চিত্তরঞ্জন এই কমিটির সদস্য হন।

১৯১৯ সালে ‘খিলাফত কনফারেন্স’-এ সভাপতির পদ থেকে মহাত্মা গাঁধী জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করার জন্য অহ্বান জানান। আর রবীন্দ্রনাথ এই সময় পাড়ি দেন ইউরোপে। দেশে সং‌গঠিত এই আন্দোলনটি সম্পর্কে তিনি এ-ও বলেন, ''It (আন্দোলনটি) is equal to turn moral force into a blind force.''

বাণীবরণ সেনগুপ্ত

শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

 

ভ্রম সংশোধন

‘এত ছুটি কিসের’ শীর্ষকে (সম্পাদক সমীপেষু, ১২-৫) লেখা হয়েছে, ‘‘এক দিকে বার্ষিক ১০০ ঘণ্টা শিক্ষণের নির্দেশ...’’। ওখানে হবে ১০০০ ঘণ্টা। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলটির জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।