E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: দুর্নীতির ঊর্ধ্বে

বস্তুত, বিধানসভা নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারের প্রথমেই এই সব কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত এবং পরবর্তী সময় নজর দিতে হবে সাধারণ মানুষের মানোন্নয়নের দিকে।

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ০৪:১১

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্যের ‘রাজ্যের ভিত এখনও দুর্বল’ (১৬-২) শীর্ষক প্রবন্ধের এই শিরোনাম সম্বন্ধে বলা যেতে পারে, সামগ্রিক পরিস্থিতির বিচারে এই ভিত মজবুত হওয়ার আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই। বাড়ির মালিক যদি পরবর্তী প্রজন্মের দিকে লক্ষ না দিয়ে, শুধুমাত্র তাঁর জীবনকালের মধ্যে বাড়ি ভেঙে না-পড়ার জন্য যতটুকু মেরামতি প্রয়োজন, ততটুকুই নজর দেন, তবে সেই বাড়ির কাঠামো দুর্বল হতে বাধ্য। তেমনই নির্বাচনে জয়ই যখন মুখ্য উদ্দেশ্য, তখন স্বল্পমেয়াদি অনুদানকেই পাখির চোখ হিসেবে দেখে মানুষকে অনুগত রাখাই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করে শাসক দল। বর্তমানে অন্য অনেক রাজ্যের মতোই আমাদের রাজ্যের শাসক দলও ভোট-কুশলী সংস্থার প্রতি নির্ভরশীল। সেই সমস্ত সংস্থা নির্বাচনী বৈতরণি পার করার জন্য এই ধরনের স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা মেনে চলার পরামর্শ দেন। অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল, প্রান্তিক মানুষজন বা বেকারদের ভাতা দেওয়া কোনও দোষের নয়। কিন্তু এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন, বিশেষত পুজোর অনুদানের ক্ষেত্রে।

বস্তুত, বিধানসভা নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারের প্রথমেই এই সব কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত এবং পরবর্তী সময় নজর দিতে হবে সাধারণ মানুষের মানোন্নয়নের দিকে। এর জন্য পরিকাঠামোর সঙ্গে সমগ্র রাজ্য জুড়েই ছোট বড় বা মাঝারি মাপের শিল্প স্থাপন খুবই জরুরি। এতে এক দিকে যেমন কোষাগারের উপর চাপ কমবে, তেমনই কোষাগারের স্বাস্থ্য বৃদ্ধিও হবে। বর্তমানে তৃণমূল সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য অর্থের বরাদ্দ যথেষ্ট এবং অনেক নতুন নির্মাণও চোখে পড়ে। কিন্তু দলের কয়েক জন দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্য ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে এই নির্মাণগুলির অধিকাংশের মান এতই খারাপ যে, কিছু দিন বাদেই এদের কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে পড়ে। একই ভাবে বিভিন্ন ঝাঁ-চকচকে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠলেও উপযুক্ত সংখ্যক চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকাঠামো না-থাকায় এই খাতে অর্থব্যয়ের কোনও লাভই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয় না। তা ছাড়া, কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম নিয়ে সংঘাতের জেরে রাজ্য নিজের খরচে সেই সমস্ত প্রকল্প চালু করার কারণে এবং কিছু প্রকল্পে বেনিয়মের জন্য কেন্দ্রের অর্থ না-পাওয়ার ফলে রাজ্যের কোষাগারে চাপ পড়ছে। এই বিষয়ে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সব শ্রেণির মানুষ যাতে নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচতে পারেন, সেটাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজ্য সরকারের।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

রাজনীতির খেলা

‘রাজ্যের ভিত এখনও দুর্বল’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা। প্রবন্ধকার ‘নগদ হস্তান্তরের প্রাবল্যে’ পরিকাঠামো খাতে উন্নয়নে বাধা সম্পর্কে যে মতামত জানিয়েছেন, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু পরিকাঠামো, সার্বিক উন্নয়নের একটি অংশমাত্র। পরিকাঠামো উন্নত হলে তার সুফল-স্বরূপ উন্নয়নের নানা দিক উন্মোচিত হয়। কিন্তু তার পরেও থেকে যায় এমন কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেগুলি ব্যতিরেকে প্রকৃত উন্নয়ন অধরা। সে বিষয়ে আলোকপাত করে উন্নয়ন-অর্থনীতিকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে ‘কেপেবিলিটি অ্যাপ্রোচ’।

প্রবন্ধের শেষ ভাগে প্রবন্ধকার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ভাবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর প্রাক্তন গভর্নর ডি সুব্বারাও-এর মন্তব্য তুলে ধরেছেন। ‘অনুদান রাজনীতি’ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘অনুদান বা তার প্রতিশ্রুতি কোনও রাজনৈতিক দলকে ভোটে জেতাতে পারে, কিন্তু তা দেশ গড়তে পারে না।’ তিনি আরও বলেছেন, রাজনৈতিক নেতারা নাগরিককে তবে বলতে চাইছেন— আমি তোমার মর্যাদা, উন্নত জীবিকা এবং স্থায়ী আয় নিশ্চিত করতে পারছি না। ফলে আপাতত সামান্য কিছু (অনুদান) দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও।

মর্যাদা ও উন্নত জীবিকা শব্দ দু’টির সূত্রে সুব্বারাও উন্নয়ন অর্থনীতির ‘কেপেবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ বিষয়টির কথাই বলেছেন। মানব উন্নয়নের বিতর্কে ‘কেপেবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ আজ একটি অপরিহার্য তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে উন্নয়ন বলতে বোঝায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সক্ষমতা সম্প্রসারণ। অর্থাৎ মানুষ যেমন জীবন প্রত্যাশা করে, সেটি উপলব্ধ হতে গেলে বাস্তবে যে সব অধিকার থাকা প্রয়োজন, সেগুলি নিশ্চিত করতে পারে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সক্ষমতা। এটি মানুষের সার্বিক উন্নয়নের পথরেখা আলোচনায় তাদের ‘সক্ষমতা’-র সুযোগ এবং ‘কার্যকারিতা’ অর্জনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। উন্নয়নের মানদণ্ড নির্ধারণ করার জন্যে শুধুমাত্র মাথাপিছু আয় এবং জিডিপি নির্ধারণের গতানুগতিক পদ্ধতিকে গুরুত্ব না-দিয়ে, মানুষের সার্বিক সমৃদ্ধি এবং ক্ষমতায়নের দিকে চোখ ফেরাতে বলে। এটি মানবজীবনের সার্বিক সুস্থতা ও শিক্ষা নিশ্চিত করে মানুষকে তাদের নিজস্ব জীবন গঠনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, সমাজকে বৈষম্যমুক্ত করার দিকে মনোনিবেশ করে ।

ডি সুব্বারাও-এর মন্তব্য প্রসঙ্গে ফিরে গেলে বলা যেতে পারে যে, ‘কেপেবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ অনুসারে মানুষকে কর্মহীন করে রেখে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা মানবিক সক্ষমতার অপচয় ও অবমূল্যায়ন। এই পরিকল্পনা কোনও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন তো করেই না, বিপরীতে মানুষকে সরকারি অনুদান-নির্ভর করে তুলে মানবিক সক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, অনুদান দেওয়াকেই উন্নয়ন বলে চালিয়ে দেওয়ার ক্রীড়নকরা ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতাসীন থাকার নেশায় সার্বিক ভাবে ধ্বংস করেন উন্নয়নের পথরেখা। জনমোহিনী রাজনীতি যে ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক রাজনীতির একটি প্রকরণ, এ কথা স্বতঃসিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতির নেতৃবর্গও অনুদান-রাজনীতির সাফল্য দেখে, নিজেদের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ন্যুব্জ করে ফেলেছেন। ফলে ভাবতেই হয় যে, স্বাধীন ভাবে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে কেমন করে চলা যাবে?

অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০

উন্নয়নমুখী

‘রাজ্যের ভিত এখনও দুর্বল’ শীর্ষক উত্তর-সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে কিছু কথা। প্রবন্ধকার যথার্থই প্রশ্ন করেছেন, খয়রাতি রাজনীতিতে বিপুল সংখ্যক উপভোক্তা তৈরি এবং নানাবিধ সরকারি প্রকল্পের উপর তাঁদের নির্ভরশীল করে ফেলা কি ভবিষ্যতের পক্ষে শুভ! এ প্রসঙ্গে উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক ২০২৬-২৭ বাজেট শুধুমাত্র এই রাজ্যের জন্যই নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কাছেও তা অনুকরণযোগ্য বলে মনে হয়।

উত্তরপ্রদেশের এ বারের বাজেট ৯.১২ লক্ষ কোটি টাকার, যা গত বছরের তুলনায় ১২.৯% বেশি। অথচ, তা পরিকাঠামোগত উন্নয়ন তথা কর্মসংস্থান ও নারী স্বনির্ভরতার উপর মূলত কেন্দ্রীভূত। এতে প্রায় দশ লক্ষ যুবকের কর্মসংস্থান ও সুদবিহীন ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিকাঠামোগত খাতে ব্যয় রাজ্যে উন্নয়নের নতুন জোয়ার বয়ে আনবে বলেই সরকারের আশা। এতে ভোটে জনপ্রিয়তা খানিকটা ঘাটতির সম্মুখীন হলেও আখেরে রাষ্ট্র নির্মাণ থমকে থাকার ভয় নেই।

নবারুণ দে, গঙ্গানগর, উত্তর ২৪ পরগনা

অপরিষ্কার

আমাদের পাড়ায় প্রতি দিন একটি ময়লা তোলার গাড়ি আসে আবর্জনা সংগ্রহ করতে। কিন্তু তারা যত না আবর্জনা সংগ্রহ করে, তার চেয়ে বেশি রাস্তা নোংরা করে। গাড়ি থেকে আবর্জনা ছড়িয়ে থাকে রাস্তায়। বহু বার বলেও কাজ হয়নি।

সন্দীপ ধর, কলকাতা-৩৭

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mamata Banerjee

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy