গণতন্ত্রের উপর আস্থাটা হারাতে দেবেন না
বাংলার যে ৮টা সংসদীয় আসনে সোমবার ভোটগ্রহণ হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই উত্তেজনাপ্রবণ। রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং নির্বাচনী হিংসার ইতিহাসে নাম রয়েছে ওই সব এলাকার।
clash

বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ছবি: টুইটার থেকে সংগৃহীত।

সাফল্য এল না। দেশের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে চতুর্থ দফার ভোটগ্রহণ যে পশ্চিমবঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে নির্বাচন কমিশনের কাছে, তা কারও অজানা ছিল না। কিন্তু যাবতীয় আশঙ্কা সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন উতরোতে পারল না চ্যালেঞ্জে। অশান্তি, হিংসা এবং ভোট লুঠের ভূরি ভূরি অভিযোগে নির্বাচন প্রক্রিয়া ফেল গভীর ভাবে কলঙ্কিত হয়ে গেল।

বাংলার যে ৮টা সংসদীয় আসনে সোমবার ভোটগ্রহণ হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই উত্তেজনাপ্রবণ। রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং নির্বাচনী হিংসার ইতিহাসে নাম রয়েছে ওই সব এলাকার। নির্বাচন কমিশনের সবই জানা ছিল। পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। কোন কোন পদ্ধতিতে ভোট লুঠ এবং কারচুপির চেষ্টা হতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশঙ্কাও জানা ছিল। কিন্তু কোনও লাভ হল না। ভোটগ্রহণ শুরুর কিছুক্ষণ পর থেকেই বহরমপুর, আসানসোল এবং কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিংসা ও কারচুপির অভিযোগ ও ছবি উঠে আসতে শুরু করল। বীরভূমে আরও মসৃণ ভাবে সন্ত্রাস দাপট দেখাচ্ছে বলে শোনা গেল। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরে গোটা বীরভূম জেলাতেই নতুন করে ভোটগ্রহণের দাবি তোলা হল বিরোধী দলের তরফে।

প্রথম দফার ভোটগ্রহণেই অশান্তির আগুন দেখেছিল বাংলা। পরবর্তী দুটো দফায় বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল পরিস্থিতি। মোটের উপরে অবাধ ও শান্তিপূর্ণই বলা গিয়েছিল ভোটগ্রহণকে। কিন্তু যে এলাকায় পৌঁছে ভোটগ্রহণ ফের প্রহসনে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল, সেই এলাকাতেই কমিশনকে অসহায় দেখাল। এই পরিস্থিতি একেবারেই কাম্য ছিল না। পরিস্থিতি কতটা প্রতিকূল হতে পারে, তা কি কমিশনের কর্তারা আঁচ করতে পারলেন না? নাকি প্রশ্নাতীত এক নির্বাচনের দৃষ্টান্ত তৈরি করার তাগিদটাই তাঁরা অনুভব করলেন না? উত্তরটা পাওয়া জরুরি।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

কোনও সুস্থ গণতন্ত্রেই নির্বাচনকে এ ভাবে প্রহসনে পরিণত করার চেষ্টা চলে না। ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এই রকম ছবি আজকাল তৈরি হতে দেখা যায় না। বাংলা যেন সব বন্ধনীর বাইরে। নির্বাচনের দিনে দুষ্কৃতীদের অবাধ দাপট যেন এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ রাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা গণতন্ত্রের উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে চায়, নাকি দুষ্কৃতীতন্ত্রের উপরে, তা নিয়ে ধন্দ জাগে এখন।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

দায় শুধু যে নির্বাচন কমিশনের, তা নয়। দায় রাজনৈতিক দলগুলোর তথা রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও। নির্বাচন মানেই পেশী প্রদর্শন, নির্বাচন মানেই জনমত যে কোনও উপায়ে নিজের দখলে নেওয়া— এই রকম এক সংস্কৃতিকে দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়েছে এ রাজ্যের রাজনীতি। আজ সেই সংস্কৃতি বা সেই অভ্যাস যেন অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে চাইছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে দুষ্কৃতীদের অবাধ হস্তক্ষেপকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না আর। অতএব এই পরিস্থিতির দায় রাজনৈতিক দলগুলোও এড়াতে পারবে না।

আরও পড়ুন: ভোটে দেদার ‘ছাপ্পা’, সংঘর্ষের ঘটনার পরেও নির্বাচন কমিশন বলছে চতুর্থ দফা ‘শান্তিপূর্ণ’ই

কিন্তু কাউকে দায়ী ঠাউরে নিলেই সমস্যা মিটে যায় না। গণতন্ত্র অত্যন্ত গভীর ও জটিল সঙ্কটের মুখে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই সঙ্কটের আশু অবসান অত্যন্ত জরুরি। না হলে গণতন্ত্রের উপর থেকে সাধারণ নাগরিক কিন্তু আস্থা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করবেন। সে পরিস্থিতি গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাটার জন্যই বিপজ্জনক হবে।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত