বর্তমান লোকসভা নির্বাচনের প্রথম তিন পর্বে উত্তরবঙ্গে ভোটদান প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাপ্ত হয়েছে যেন এই কারণে যে, সংঘর্ষে মৃত্যুর কোনও সংবাদ নেই। অর্থাৎ, মৃত্যুই যেন গণতন্ত্রের মাপকাঠি! নির্বাচন বা নির্বাচন-পরবর্তী সংঘর্ষে এক সময় উত্তরবঙ্গে মৃত্যুমিছিল আমরা দেখেছি। তবে, উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের মিশ্র সংস্কৃতি, সকলকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার যে সামাজিক ব্যবস্থা, তা এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল করতে চায়। চা-বাগানের শ্রমিক, উদ্বাস্তু কৃষক, ছিন্নমূল মানুষ তাঁদের বাঁচার অধিকার ও ন্যূনতম শর্তের বিনিময়ে জীবন বাজি ধরেছেন। 

বেকারত্ব তথা কর্মসংস্থান রাজনৈতিক প্রচারের একটা বড় হাতিয়ার। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য যেখানে পর্ষদ রয়েছে, সেখানে নানা মাপকাঠিতে তাকে মেপে দেখার প্রয়াসও যে জনগণ চালাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তফসিলি জাতি-জনজাতির চাওয়া-পাওয়ার বিষয় থেকেই যায়। আত্মিক এবং আর্থিক উন্নয়নের প্রসঙ্গও রয়ে গিয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেল বা বাস কতটা পরিষেবা দিতে পারে, তারও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলেছে। মানুষের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব-সম্প্রীতি কী ভাবে বজায় থাকবে, তার কথা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক রং শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তখন পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন বিপ্রতীপ অবস্থানে চলে যায়। উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন, সম্প্রীতি, দেশের নিরাপত্তা এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থান ভোটে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ গণতন্ত্রকে ভালবেসে পুরনো দুঃখ ভুলে নতুন আশার সন্ধান করে ভোট দেন।            

কালি লেপা তর্জনীই এখন গণতন্ত্রের প্রতীক। কোনও কিছুর নির্দেশ বা চোখে আঙুল দেখিয়ে দেওয়ার তর্জনী এখন কালিমালিপ্ত। আশ্চর্য এই কালি, যা ক্রমশ প্রতীক হয়ে উঠছে! গণতন্ত্রের সব কিছুই যেন কালিমালিপ্ত হয়ে উঠতে চাইছে! কেউই বাদ যাচ্ছে না ক্ষমতালিপ্সুর কালিমা লেপনের প্রক্রিয়ায়! 

মূলত গ্রিক শব্দ দেমোস (জনগণ) এবং ক্রিতোস (ক্ষমতা) থেকে ইংরেজি ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দ, যার বাংলা অর্থ ‘গণতন্ত্র’। সমান ভোটাধিকারের মধ্য দিয়ে নাগরিকগণ তাঁদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে রাজনৈতিক ভাবে রাষ্ট্র বা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতে তথাগত বুদ্ধ যখন গোঁড়া ধর্মীয় ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র থেকে সকলের সমানাধিকারের জন্য সততার বাণী দিয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠা করছেন, তখন গ্রিক দেশের এথেন্সে রাজা ক্লিসথেনিস বিভিন্ন উপজাতির নেতাদের বেছে নেওয়ার সনাতনি প্রথা দূর করে মানুষের নতুন জোট তৈরি করে মানুষের মুক্ত মতকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন শহর-রাষ্ট্রের পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। জনগণই ক্রমশ হয়ে উঠতে লাগল ক্ষমতার উৎস। আব্রাহাম লিঙ্কন যেমন বলতে চেয়েছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।’ 

মাৎস্যন্যায়ের গৌড়বঙ্গে গোপালকে এক সময় জনগণই সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। মানুষের মর্যাদা যখন খর্বিত হয়, তখনই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হতে থাকে। আধুনিক বিশ্বে রাজতন্ত্র যত দুর্বল হয়েছে, জনগণের কণ্ঠ তত জোরালো হয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের পর বাস্তিল দুর্গের পতন, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা আধুনিক মানসিকতার কাছে পরিবর্তনের চিহ্ন বয়ে আনে। ব্যালট না বুলেট— কোনটি ক্ষমতার প্রকৃত উৎস, এ বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শেষ ছিল না। দু’টি বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের পরে ভারত আত্মপ্রকাশ করল ‘সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে। ব্যালটের সঙ্গে বুলেটের সন্ধির মতোই দেশের কাঠামো গড়ে উঠতে লাগল। প্রাচীনকালে কোনও দেশের সঙ্গে আক্রমণকারী দেশের যুদ্ধে সেনার মৃত্যু এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি হত। কিন্তু তা নিয়ে কতটা প্রচার হত, তা জানা নেই। ক্ষমতা ও দেশ দখলের যুদ্ধ আজও থেমে নেই। রাজনৈতিক দলগুলিই এখন সে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার কাজটা করে চলেছে। দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে সংঘাত ও সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা দুঃখের। সহনশীলতার মাত্রা যত কমবে, ততই সংঘাত তীব্র হবে। 

ক্ষমতার লোভই মানুষকে অধঃপাতে নিয়ে যায়। হিংসার বীজবোনা শুরু হয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। গ্রাম্য বিবাদ বা ব্যক্তি মানুষের ‘ইগো’ এই ভাবেই ক্রুরতার জটিল আবর্তে পাক খেতে থাকে। ঈর্ষার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করতে থাকে কুটিল মনস্তত্ত্ব। অহিংসার দেশ ভারত বুদ্ধের আদর্শকে আঁকড়ে ধরে। সেই পথে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী আসেন – ‘শহিদ’ আর ‘গাঁধী’ শব্দ দু’টি ক্রমশ বিদেশিদের কাছে প্রতিশব্দ হয়ে যায়। ‘বন্দুকের নল’কে অধিকাংশ মানুষ আর ক্ষমতার উৎস বলে মনে করেন না। তবে, গণতন্ত্রে ‘ঘুণ’বাহিনী যে নেই, তা নয়। উৎকোচ দিয়ে ভোট কেনা, অস্ত্র দেখিয়ে আর মস্তান বাহিনী ব্যবহার করে বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, সায়েন্টিফিক রিগিং সবই জনমতকে উপেক্ষা করার জন্য সক্রিয় ‘ঘুণপোকা’। 

পদলোভী ক্ষমতালিপ্সু নেতা দেশের অপেক্ষা ‘ব্যক্তিগত’ উন্নয়ন তথা বাড়ি, গাড়ি, জমি বৃদ্ধিতেই বেশি উৎসাহ পান। জনগণকে শোষণ করাই তাঁদের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। অশিক্ষা, নিরক্ষরতা, ধর্মান্ধতার পাশাপাশি খিচুড়ি-আলুরদম বা মাংস-ভাতের বিনিময়ে ভোট বিক্রি হয়ে যাওয়াটাও তো গণতন্ত্রে কালি লেপাই! ভোটদাতাকে হুমকি বা ভীতি প্রদর্শন এবং সংঘর্ষে বোমা-গুলি চালনার জীবন্ত চিত্র তো আমরা আকছার দেখতে পাই। 

এ সবের কারণ?  আসলে, ভোগসর্বস্ব জীবনযাত্রায় ‘একা খাব’ আর ‘একা ভোগ করব’ থেকেই এর সূত্রপাত। রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীরা তো সমাজেরই অংশ, তাঁদের মনের মধ্যে পাক খায় ক্ষমতাহীনতার শূন্যতা। ক্ষমতাহীন জীবনে ভোগবিলাসে ছেদ পড়বে। নেতা-মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য কর্মীদের অফুরান উৎসাহ আসলে একটা চাকরি বা ট্রেড লাইসেন্স কিংবা কোনও বিশেষ পদ বা ব্যবসার উন্নতি। রাজনৈতিক সম্মেলনে বা মিছিলে যাওয়ার মধ্যে এই লাভের অঙ্কটি সব চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে বলেই রাজনৈতিক নেতাদের আদর্শহীন রাজনৈতিক দলবদলও চোখে পড়ে। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া মানুষ আর মৃতদেহ প্রায় সমার্থক। প্রেমহীন ভালবাসার মতোই নীতিহীন রাজনীতির ধারক-বাহক হয়ে উঠতে চাইছি আমরা। আমাদের সিন্ডিকেট, মাফিয়া, বেআইনি ব্যবসা, কন্‌ট্রাক্টর, দালাল সকলেই মিথোজীবী হয়ে উঠতে চায় রাজনীতির সঙ্গে। 

দেশের তথা উত্তরবঙ্গের সঙ্কট নিয়ে নেতা থেকে অভিনেতা নিরন্তর হা-হুতাশ করে চলেছেন। অন্য দিকে, রফিক মিঞা আর পরান মণ্ডল নিজেদের জলখাবার ভাগ করে খেয়ে হাল চাষ করছেন এই ভেবে যে, দেরি হয়ে গেলে ফসল ভাল হবে না।

(লেখক গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)