• সুনীল তাম্বে
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

উদ্ধব বললেন, ‘সংবিধানের মূল্যবোধ তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’

নতুন মোড়ে মহারাষ্ট্র

Pawar and Uddhav
নব-নির্মাণ: শরদ পওয়ার, না উদ্ধব ঠাকরে— জোট সরকারে ক্ষমতার সুতো কার হাতে? মুম্বই, ২৬ নভেম্বর। এএফপি

মহারাষ্ট্রের উনিশতম মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে শপথগ্রহণের ঠিক পরই কোন ঘোষণাটি করলেন? এটাই যে, তাঁর নতুন সরকারের কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হবে কৃষকদের সঙ্কটমুক্তির উপর। বুঝিয়ে দিলেন যে, আগের (বিজেপি) সরকার কৃষিসঙ্কট নিয়ে একেবারেই সংবেদনশীলতা দেখায়নি। কৃষিঋণ মকুবই হোক, আর শস্যবিমাই হোক, কিংবা রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য কৃষি প্রকল্প হোক— কোনও বিষয়েই নয়! ক্যাবিনেট গঠনের পর সাংবাদিক বৈঠকে উদ্ধবের মন্তব্য, ‘‘আমি একটা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি, যাতে বোঝা যায় একটা সামগ্রিক ত্রাণ কর্মসূচি নিতে হলে কী কী করণীয়।’’  

এই বৈঠকেই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল— কংগ্রেস আর এনসিপির সঙ্গে শিবসেনার হাত মেলানোর মানে কি তারা এ বার ‘সেকুলার’ হতে চলেছে? প্রশ্নের সামনে বেশ বিরক্ত লাগল উদ্ধবকে, কিন্তু সতর্ক উত্তর দিলেন তিনি। ‘‘প্রথমে জানতে চাই, ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝেন আপনারা।’’ এবং তার পর, ‘‘(সেকুলার হল) আমাদের সংবিধানে যা আছে সেটাই ঠিকমতো মেনে চলা।’’

বস্তুত, মহা বিকাশ আঘাডি-র ‘ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি’র ভূমিকার দিকে তাকালে বোঝা যায়, শিবসেনা, এনসিপি, কংগ্রেসের সঙ্গে পেজ়ান্টস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিআই(এম) ইত্যাদির মতো অন্যান্য সেকুলার দল মিলে একত্র দাঁড়িয়ে যা বলছে, সেটা সত্যিই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকা বলছে, ‘‘জোটশরিকরা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধকে তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জাতীয় স্তরে ও রাজ্য স্তরে যেগুলি বিতর্কিত বিষয়, বিশেষত যে সমস্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের উপর একটা প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা, সেই সব ক্ষেত্রে শিবসেনা, এনসিপি ও কংগ্রেস একত্র আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানকে মান্যতা দেবে, এবং সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়াস করবে।’’ ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির বাকি অংশেও রয়েছে কৃষক, শ্রমিক ও মহিলাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার প্রতি আলাদা করে মনোযোগ দেওয়ার কথা, কিংবা বিভিন্ন সঙ্কটের মোকাবিলা করার কথা। ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’-এর উচ্চারণ নেই সেখানে— না আঞ্চলিক সত্তা-পরিচিতির রাজনীতি, না ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতি। 

শিবসেনার ৫৬ জন নির্বাচিত বিধায়ক বাঁধা ছিলেন প্রাক্-নির্বাচন পর্বে ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে বোঝাপড়ায়। কিন্তু বোঝাপড়ার ধরনটাই পাল্টে গেল ফলাফল বেরোলে। ১০৫ বিধায়ক নিয়ে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হলেও শিবসেনার প্রতি নির্ভর করা ছাড়া তাদের গতি রইল না। শিবসেনা স্থির করল বিজেপিকে চাপে রাখা হবে— আড়াই বছরের জন্য মুখ্যমন্ত্রিত্ব দাবি করে বসল তারা। মরাঠা ‘স্ট্রংম্যান’ শরদ পওয়ার এই পরিস্থিতিতে ‘মাঠ’-এ নামলেন, এবং আশ্চর্য তৎপরতায় পটভূমি পাল্টে ফেললেন। কংগ্রেসকে পাশে নিয়ে এলেন। একটা ক্ষমতার ভাগাভাগির ফর্মুলা তৈরি করে ফেললেন। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি তৈরিও প্রধানত তাঁরই হাতের কাজ। পুরোটারই লক্ষ্য একটা— যে ভাবে হোক বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে হবে। আবারও পরিচয় পাওয়া গেল, প্রয়োজনে শরদ পওয়ারের রাজনৈতিক বোধ কত ক্ষিপ্র ও চতুরতাপূর্ণ হতে পারে। সমস্যা অবশ্য নানাবিধ। শিবসেনার সরকারে যোগ দেওয়া নিয়ে স্বভাবতই অনিচ্ছুক ছিল কংগ্রেস। দ্বিতীয়ত, স্থিতিশীল সরকার গড়তে হলে যে শিবসেনার নেতার উপরেই প্রধান নেতৃত্বের ভার দিতে হবে, এতে শরদ পওয়ারের কোনও সংশয় না থাকলেও সমস্যা দাঁড়াল উদ্ধবকে নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রিত্বের ভার নিতে তিনি একেবারেই অরাজি ছিলেন। সংসদীয় দলনেতা হিসেবে শিবসেনার পক্ষ থেকে মনোনীত হলেন একনাথ গায়কোয়াড়। ভবি ভুলবার নয়। শরদ পওয়ার দৃঢ় নির্দেশ দিলেন— না, অন্য কেউ নয়, উদ্ধবকেই মুখ্যমন্ত্রী হতে হবে! প্রায় ধমক খেয়ে রাজি হলেন উদ্ধব।

বাইরের চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। দেশের সবচেয়ে সম্পদশালী রাজ্যের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সাংসদকে পকেটে পুরে ফেলা বিজেপিও কি সহজে খেলা ছেড়ে দেয়? সাফল্যের সঙ্গে অজিত পওয়ারকে দলে টানল তারা। কিন্তু নিজের দল ও জোটসঙ্গী দলগুলির যত জন সম্ভব বিধায়ককে ‘হাইজ্যাক’ করে ‘মরাঠা স্ট্রংম্যান’ শরদ ম্যাজিক দেখিয়ে দিলেন। প্রথমে সংবাদমাধ্যমের সামনে ১৬২ জন বিধায়ককে ‘প্যারেড’ করালেন, তার পর বিধানসভায় ‘ফ্লোর টেস্ট’-এ অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি করালেন তাঁদের দিয়ে। অজিতের সামনে আর কোনও পথ রইল না। যদিও আপাতত এনসিপি-র ক্ষমতালাভকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি, সংশয়-মেঘের আবরণ তাঁর ওপর থেকে সরে যাবে, এমন লক্ষণ নেই!

দেখেশুনে মনে হতেই পারে, ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস। ১৯৮৪ সালে অন্তত প্রকাশ্যত বিজেপি কথা বলত গাঁধীবাদী সমাজতন্ত্রের সুরে, আর শিবসেনা সুপ্রিমো ছিলেন ‘হিন্দুহৃদয়সম্রাট’। সেনা তখন বিজেপির সঙ্গে সন্ধি করার জন্য ছিল উদ্‌গ্রীব। সেই সময় মুম্বই, ঠাণে আর আওরঙ্গাবাদের মতো শহরে শিবসেনার জমি ছিল শক্তপোক্ত, পাশে বিজেপিকে মনে হত নেহাত শিশু। শিবসেনার পিঠে সওয়ার হয়েই বিজেপি তার পাখা মেলল। ২০১২ সালে শিবসেনা সুপ্রিমোর দেহান্তের পর বিজেপি এক ধাক্কায় শিশু থেকে সোজাসুজি ‘দাদা’ হয়ে উঠল। অন্তত মহারাষ্ট্রে, উনিশশো আশির দশকে, সেনার হিন্দু জাতীয়তাবাদ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের থেকে অনেক বেশি আগ্রাসী ছিল, সন্দেহ নেই। ১৯৯২-৯৩ সালের দাঙ্গায় শিবসেনা প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিল। বিচারক শ্রীকৃষ্ণের কমিশন মুম্বই দাঙ্গার জন্য বাল ঠাকরেকেই দায়ী করেছিল। আজ যখন সেই শিবসেনা বিজেপির সঙ্গে তার সম্পর্কসূত্র কেটে দিতে বসেছে এবং ‘সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা বলছে, এ রাজ্যের হিন্দুত্ব রাজনীতির অভিমুখ বিষয়ে নতুন ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়। না, বিজেপি স্বস্তিতে নেই, সঙ্ঘ পরিবারও নেই। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতার লোভে হিন্দুত্বের আদর্শের প্রতিই সেনা বিশ্বাসঘাতকতা করল! এই অভিযোগের মধ্যে রয়ে গেল একটা আশা যে— মহারাষ্ট্রে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পতাকাটি এ বার ওড়াবে কেবল বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবার। 

তবে কিনা, সেই যে উনিশ শতকের রেনেসাঁসের ঐতিহ্য— মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে থেকে বিশ শতকের বাবাসাহেব অম্বেডকর (উদ্ধবের পিতামহ প্রবোধঙ্কর ঠাকরে কিন্তু এই ঐতিহ্যেরই ধারক ও বাহক ছিলেন)— মহারাষ্ট্রের ঘটনাবহুল ইতিহাস মনে রাখলে কেউ অন্য রকম ভাবতেই পারেন। বলতেই পারেন যে, উত্তর ভারতে গোবলয়ে হিন্দুত্ববাদের যে রূপটি দেখা গিয়েছে, মহারাষ্ট্রে ঠিক সেটাই দেখা দেওয়ার কথা কোনও দিনই ছিল না। এমনকি যদি গত পাঁচ বছরে বিজেপির শাসনাধীন মহারাষ্ট্রের দিকেও তাকানো হয়, দেখা যাবে সংখ্যালঘু মানুষকে গণপ্রহারে নিধনের ঘটনা সেখানে একটিও ঘটেনি। বরং মহারাষ্ট্র জাতীয় খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে অন্য রকমের খবরের উপর নির্ভর করেই, যেমন কৃষক আন্দোলন। 

সুতরাং আজ যখন শিবসেনা তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, কে বলতে পারে— হয়তো এই নতুন পরিস্থিতিতে বিজেপিকে একটা নতুন প্রতিরোধের সামনে পড়তে হতে পারে। হয়তো একটা নতুন ‘ইনক্লুসিভ’ বা সমন্বয়ধর্মী রাজনীতির দরজা এ রাজ্যে খুলতে পারে, যেখানে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানটাকে ধরে রাখতেও বিজেপির সামনে এ বার একটা সংগ্রাম অপেক্ষা করবে!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন