ভারত সরকার নয় জন ব্যক্তিকে বেসরকারি কর্মক্ষেত্র হইতে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে নিয়োগ করিয়াছে। যুগ্ম সচিব পদে তাঁহারা কাজ করিবেন। ইহাতে কিঞ্চিৎ শোরগোল পড়িয়াছে। ইহার পূর্বেও প্রশাসনের নানা পদে বাহির হইতে নিয়োগ হইয়াছে। মনমোহন সিংহ, মন্টেক সিংহ অহলুওয়ালিয়া প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা অন্যান্য পেশা হইতে সরকারি পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু এই প্রথম বিজ্ঞাপন দিয়া, ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে এত জন একসঙ্গে নিয়োগ হইল। এত দিন ‘আইএএস’ আধিকারিক হইবার একটিই প্রক্রিয়া ছিল, তাহা প্রবেশিকা পরীক্ষার নানা স্তর অতিক্রম করিবার কঠিন পদ্ধতি। নির্বাচনের পর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, অতঃপর সরকারি কোনও পদের দায়িত্ব প্রাপ্তি। জেলা প্রশাসনের নিম্নস্তর হইতে ক্রমিক উত্তরণই প্রথা। ইহার ফলে নাগরিকের সহিত সরকারের বিচিত্র সম্পর্কের সহিত পরিচয় জন্মে প্রশাসকের। বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সংঘাত সামলাইয়া, সরকারি প্রকল্পের শর্ত মানিয়া কাজ করিবার দক্ষতা লাভ করেন তিনি। এই প্রক্রিয়ায় যুগ্ম সচিব পদে পৌঁছাইতে এক দশক বা তাহার অধিক লাগিতে পারে। বেসরকারি ক্ষেত্র হইতে সরাসরি সচিব নিয়োগ করিলে এই প্রচলিত ধারণাটি ধাক্কা খাইতে বাধ্য। তবে কি তৃণমূল স্তরে কাজের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নাই? অপর পক্ষের যুক্তি, বেসরকারি ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতা, কর্মকুশলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা চাই, সরকারি ক্ষেত্রেও তাহা প্রয়োজন। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সরকারি জন পরিষেবা ব্যবস্থায় যে সংস্কার প্রয়োজন, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। জনমুখী, স্বচ্ছ ও তৎপর প্রশাসন প্রত্যাশা করিতেছে নাগরিক। কিন্তু সরকারি বাবুতন্ত্রের যথেষ্ট পরিবর্তন হয় নাই। সমস্যার সমাধান করিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত লইয়া তাহা নিপুণ ভাবে কার্যকর করিবার অভ্যাস আজও অধিকাংশ প্রশাসকের অধরা রহিয়াছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে যে কোনও সমস্যার যথাযথ সমাধানের ক্ষমতার দ্বারাই কর্মীর মূল্যায়ন হয়। কিন্তু সরকারি ক্ষেত্রে কর্মজীবনে অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হইয়া ওঠে বিধির পালন। লক্ষ্যপূরণ না হইলেও হইবে, নিয়ম মানিতে হইবে। এই কারণে প্রশাসনে সংস্কারের উপায় খুঁজিতে গিয়া নানা কমিটি বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি আধিকারিকদের নিয়োগের সুপারিশ করিয়াছেন। তাহাতে সরকারি কাজে গতি আসিবে, দায়বদ্ধতা বাড়িবে, নূতন নূতন কৌশলের প্রয়োগ হইবে, এমনই প্রত্যাশা। 

প্রশ্ন উঠিয়াছে, সমস্যার সহিত সমাধানের সাযুজ্য হইল কি? মাত্র নয় জন কী করিয়া কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনিয়া প্রশাসনে গতি আনিবে? প্রাক্তন আমলারা সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন, ওই ব্যক্তিরা ‘বহিরাগত’ হইয়াই থাকিবেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাবে, এবং বাবুতন্ত্রের বাধায় তাঁহারা কাজ করিতে পারিবেন না। এবং এই সুযোগে দুর্নীতির পথও প্রশস্ত হইতে পারে। আরও বৃহৎ প্রশ্ন, ইহাতে প্রশাসনিক সংস্কারের কাজ কতটুকু হইবে? আজ প্রায় সকল পরিষেবা ডিজিটাল হইয়াছে, ভোটের শর্ত হইয়াছে উন্নয়ন, সমাজ আন্দোলনের কেন্দ্রে আসিয়াছে নাগরিকের অধিকার। ঔপনিবেশিক ভারতে প্রশাসক ভূমিকা যাহা ছিল, আজ তাহা নাই। অতএব আজ কেমন হইবে প্রশাসকের প্রশিক্ষণ বা মূল্যায়ন, প্রতিটি প্রশ্নই নূতন উত্তর দাবি করিতেছে। উত্তর না মিলিলে অচলায়তন ভাঙিবে না।