Advertisement
E-Paper

তোমার টুইট আমার কুইট

ভারতীয় ধারাভাষ্যকারকে ভারতীয় খেলোয়াড় নিয়েই বেশি কথা বলতে হবে! কেন? ধারাভাষ্য কি দেশভক্তির প্যারেড গযখন প্রথম টিভিতে কমেন্ট্রি করতে এলাম, কী অশান্তি! এ লোকটা ক্রিকেট খেলেনি, ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে কেন? আরে মুশকিল! কমেন্টেটরকে প্রাক্তন খেলোয়াড় হতেই হবে, এ ফতোয়াই বা কে দিলে? খেলা এক জিনিস, খেলার ধারাভাষ্য দেওয়া আর এক। নেভিল কার্ডাস কি সেঞ্চুরি হাঁকাতেন? সিনেমা সমালোচকরা সবাই নিজেরা বিরাট পরিচালক?

প্রবন্ধ ২

শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৬ ০০:০২

যখন প্রথম টিভিতে কমেন্ট্রি করতে এলাম, কী অশান্তি! এ লোকটা ক্রিকেট খেলেনি, ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে কেন? আরে মুশকিল! কমেন্টেটরকে প্রাক্তন খেলোয়াড় হতেই হবে, এ ফতোয়াই বা কে দিলে? খেলা এক জিনিস, খেলার ধারাভাষ্য দেওয়া আর এক। নেভিল কার্ডাস কি সেঞ্চুরি হাঁকাতেন? সিনেমা সমালোচকরা সবাই নিজেরা বিরাট পরিচালক? গানের সমঝদাররা প্রত্যেকে দারুণ সা লাগাতে পারেন? নিশ্চয়ই, খেলার অভিজ্ঞতার একটা দাম আছে, বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রাক্তন খেলোয়াড়রা কথা বললে, শুনতে ভাল লাগে, মস্তকও অটোমেটিক শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে। কিন্তু একটা লোক খেলছে মানেই খেলাটা দারুণ বুঝছে, না-ই হতে পারে। যে সাহিত্য করে, সে-ই যে সেরা সাহিত্য বোঝে, ঠিক নয়। তার প্রতিভাটা অনেক দূর যায়, কিন্তু সেই প্রতিভাটাকেই বিশ্লেষণ করতে বললে— তার বুদ্ধি, ব্যবচ্ছেদ করার শক্তি, এমনকী সাহিত্যজ্ঞানও হয়তো তদ্দূর যাবে না। সিধে কথা, খেলার প্রতিভা আলাদা, খেলা বোঝার প্রতিভা আলাদা। কারও কারও মধ্যে দুটোই থাকে, কারও মধ্যে একটা।

এখন আবার নতুন অশান্তি শুরু। শয়ে শয়ে ম্যাচ কমেন্ট্রি করার পর, আমি এই আইপিএল-এর কমেন্ট্রি টিম থেকে বাদ পড়ে গেলাম। আচমকা। অপরাধটা কী, তা নিয়েও কেউ কিচ্ছু জানাল না। তবে হ্যাঁ, ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের পর, অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছিলেন এই গোছের: ‘এক জন ভারতীয় ধারাভাষ্যকার, সারা ক্ষণ অন্য দেশের খেলোয়াড়দের নিয়ে কথা না বলে, বরং আমাদের খেলোয়াড়দের নিয়ে কথা বললেই মানায় ভাল।’ এটা তখনই ধোনি রি-টুইট করেন, ‘নাথিং টু অ্যাড’ লিখে। অর্থাৎ, ‘এর পর আর কী বলার আছে!’ বচ্চনবাবু নির্ঘাত বিশাল মানুষ, কিন্তু তিনি তাঁর প্রকাণ্ড খ্যাতিতে ভর করে ক্রিকেট কমেন্ট্রির ব্যাপারটাও নেড়েঘেঁটে দিতে চাইলে একটু খটকা লাগে। এ বার সচিন তেন্ডুলকর সিনেমার ক্রিটিসিজ্ম শুরু করলে এবং বচ্চনকে নিন্দে করে ধুইয়ে দিলে, বা সানিয়া মির্জা যাচ্ছেতাই বলে অরিজিৎ সিংহের প্লেব্যাক কেরিয়ার ডুবিয়ে দিলে, ভারত চমৎকার একটা হট্টমেলার দেশ হয়ে দাঁড়াবে। সিনেমা করলেই এক জন সিনেমা ছাড়া আর কিচ্ছুই বোঝেন না— সে কথা বলছি না, কিন্তু বচ্চনসায়েব যে ক্রিকেট ও তার কমেন্ট্রির শিল্পটা খুব ভাল বোঝেন, এমন প্রমাণও তো কখনও পাইনি।

কিন্তু তার চেয়েও লক্ষণীয়, ওঁর অভিযোগটা। এক জন ভারতীয় ধারাভাষ্যকারকে ভারতীয় খেলোয়াড় নিয়েই বেশি কথা বলতে হবে! কেন? ধারাভাষ্য কি দেশভক্তির প্যারেড গ্রাউন্ড? বিজেপি-র বীজতলা? যে কমেন্ট্রি করবে, তাকে ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে হবে। ভারত ভাল খেললে তা বলতে হবে, ভারত বাজে খেললে তা-ও বলতে হবে। ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী যদি ভাল খেলে, পঞ্চমুখে তা বলতে হবে। কোহালি ভাল খেললে তাঁর যতটা প্রশংসা করতে হবে, কোহালিকে ম্যাচের মোক্ষম সময়ে মুস্তাফিজুর দুর্দান্ত বলে আউট করে দিলে, সমান তীব্রতায় ও উচ্ছ্বাসে মুস্তাফিজুরের প্রশংসা করতে হবে। স্টিভ স্মিথ বাজে খেললে যত কর্কশ নিন্দে করতে হবে, ধোনি বাজে খেললেও সমান শাণিত নিন্দে করতে হবে। ক্রিকেট ন্যাকামির আখড়া না। আমার ছেলেটি নাচে যেন গোপালটি, ওদের ছেলেটা নাচে যেন বাঁদরটা— এই অশিক্ষিত স্নেহবাজির জায়গা এটা নয়। ধারাভাষ্যকারের একটা প্রধান কাজ: নিরপেক্ষ হওয়া। ভারতীয় কমেন্টেটর যদি ভারতের খেলোয়াড়দের নিয়ে নাচে, অস্ট্রেলিয়ার কমেন্টেটর অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের নিয়ে নাচে— তা হলে তো কমেন্ট্রি বক্সেও সমান্তরাল ম্যাচ চলবে! ধুন্ধুমার লেগে যাবে, এ-ওকে ডাউন দিয়ে জেতার চেষ্টা চালাবে! ভারতীয় কমেন্টেটর তো ভারতের হয়ে খেলতে যায়নি! ইংল্যান্ডের কমেন্টেটর মনে মনে চাইতেই পারে ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতুক, কিন্তু তার কমেন্ট্রিতে যদি পক্ষপাত চলে আসে, এতটুকুও, তা হলে তার কাজটাই ভন্ডুল! ধারাভাষ্যকার গেছে ম্যাচটা বোঝাতে, ম্যাচটা জেতাতে নয়। বচ্চনবাবু যদি মনে করেন, ধারাভাষ্যকার স্রেফ আর এক জন সাপোর্টার, যে গ্যালারির বদলে কমেন্ট্রি বক্সে সিট পেয়েছে, তা হলে তিনি কমেন্ট্রির সংজ্ঞাটা বোঝেনইনি। যদিও, যা বুঝি না, তা নিয়ে মন্তব্য করব না— এ সংযম লোকের থাকলে তো পৃথিবী হত সাইলেন্ট জোন। কিন্তু খুব বিখ্যাত মানুষ হলে, এগুলো জোর করে শিখে নিতে হয়। নইলে অন্য লোকের চাকরি যায়। তাতে মজা হলেও, ন্যায় ঘটে না।

এও মনে রাখতে হবে, একটা ম্যাচ সারা পৃথিবীতে প্রচারিত হয়। ভারতের ম্যাচ শুধু ভারতীয়রা দেখে-শোনে না। ধারাভাষ্যকারের দায়বদ্ধতা তাই গোটা পৃথিবীর সব দেশের সব শ্রোতার কাছে। সবচেয়ে বেশি, ক্রিকেটের কাছে। বাংলাদেশ মাত্র এক রানের জন্যে ম্যাচ হেরেছিল। অসামান্য এফর্ট। আমি ভারতের এক রানে জয় নিয়ে যত কথা বলেছিলাম, তার চেয়ে বেশি বলেছিলাম বাংলাদেশের জয়ের এত কাছে আসতে পারার কৃতিত্ব নিয়ে। আমার কাছে ওটা অনেক জরুরি মনে হয়েছিল। ধোনির হয়তো তা খারাপ লেগেছিল, বা অন্য ভারতীয় প্লেয়ারদেরও। খেলোয়াড়দের তুষ্ট রাখা, বা তাঁদের মনখারাপে মলম বোলানো কিন্তু আমার কাজ নয়। আমার কাজ খেলাটা বোঝা ও বোঝানো। তাঁরা ভাল খেললে আমি ভাল বলতে বাধ্য। তাঁরা বরং নিজেদের খেলাটার দিকে নজর দিন। ‘আমি যতই করি কেলো, আমায় ভাল বলে ফেলো’— এটা চাইতে পারে একমাত্র গামবাট স্বৈরাচারী, বা মসালা হিন্দি সিনেমার হিরো। নিজে অঙ্কে ধ্যাড়াব, আর রেগে যাব পরীক্ষকের ওপর: এ অক্ষমের সিগনেচার। অবশ্য লাল লাল আঁখে ফেড়ে বিশ্ব চমকানো অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের দৌড় হয়তো ওই অ্যাংগার অবধিই। তবে, পৃথিবীর সব যুক্তিবুদ্ধি এখনও হেলিকপ্টার শটে উড়ে যায়নি, এটুকুই ভরসা।

লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy