শ্রীহট্টের মধ্য চল্লিশের যুবক রামনাথ বিশ্বাস ১৯৪১ সালে সাইকেলে করে পাড়ি দিয়েছিলেন তুরস্কে। ঐতিহাসিক শহর কনস্ট্যান্টিনোপল বা ইস্তানবুলে গিয়ে রামনাথ নানাবিধ কারণে চমৎকৃত হয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি কারণ ছিল ধর্মকে তোল্লাই দিতে সরকারের প্রবল অনীহা— রাস্তাঘাটে, পাবলিক প্লেসে ধর্ম নিয়ে লোকের মাথা খেলে তৎকালীন আইন অনুযায়ী সাজা ছিল ছ’মাসের জেল। আবার ইস্তানবুল থেকে প্রায় নশো কিলোমিটার দূরের শহর আদানার পাশের এক গন্ডগ্রামে ঘুরতে গিয়ে দেখেছিলেন, সেখানে শুধু ঝাড়ুদাররাই আছে, মেথর নেই— তুলনামূলক ভাবে পাণ্ডববর্জিত জায়গাতেও বর্জ্য পদার্থ মাটির নীচের পাইপলাইনে করে গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল।
প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্ত্যের সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা তুরস্ক দেশটি প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। তবে, গোটা দুনিয়ার কাছে আধুনিক তুরস্ক বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল মূলত এর উদারপন্থী ও প্রগতিশীল ধ্যানধারণার জন্য। আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তাফা কেমাল আতাতুর্ক রাষ্ট্রের প্রায় জন্মলগ্ন থেকে ধর্মকে কখনও সরকারের কাজে নাক গলাতে দেননি। তুরস্কে শহরের পর শহরে একাধিক ‘ক্লক টাওয়ার’। মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজান-ই যাতে মানুষের সময় নির্ধারণের একমাত্র সহায় না হয়ে দাঁড়ায় সেটি দেখার জন্যই এই ঘড়ি-স্তম্ভের বন্দোবস্ত। আতাতুর্কের উদারপন্থী ধ্যানধারণা তুরস্কের অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে তুলেছিল, ১৯২৩-এ আধুনিক তুরস্কের জন্ম হওয়ার এক দশকের মধ্যে তুরস্কের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কুড়ির দশকের শুরুর তুলনায় পাঁচ গুণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঝকঝকে অতীত থেকে অবশ্য একবিংশ শতকের তুরস্কের ট্র্যাজেডির বিন্দুমাত্র আঁচ পাওয়া যাবে না। সেই আখ্যান শুধু পিছিয়ে যাওয়ার। মাস কয়েক আগে তুরস্কের সরকার কয়েক দিনের জন্য ফেসবুক ব্যান করেন। দূর থেকে দেখলে মনে হতেই পারে, তুরস্কে এখন কট্টরপন্থীদের সঙ্গে উদারপন্থীদের একটা লড়াই চলছে। লড়াইটায় সোশ্যাল মিডিয়া উদারপন্থীদের সঙ্গ দেওয়ায় বারেবারেই সরকার ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কথাটা ভুল নয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিজেপ তায়িপ এর্দোয়ান এবং তাঁর ইসলামপন্থী দল, ক্ষমতাসীন ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’কে হঠাতে সাম্প্রতিক অতীতে বিরোধীরা বারে বারেই সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নিয়েছেন, তাই সরকারের রাগ থাকতেই পারে।
কিন্তু ওই কট্টরপন্থী বনাম উদারপন্থী, ইসলামিস্ট বনাম ধর্মনিরপেক্ষ, ইস্তানবুল বনাম বাকি তুরস্ক ধাঁচের সংঘাতের দর্পণে একুশ শতকের তুরস্ককে বুঝতে গেলে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হারিয়ে যাবে— জাতীয়তাবাদ।
আতাতুর্কের মতন দূরদর্শী নেতা পাওয়া দুষ্কর। ওহেন মেগাস্টার সুলভ ইমেজের সঙ্গে পাল্লা দেওয়াও কঠিন। আতাতুর্কের মৃত্যুর পর তাঁর দল ‘রিপাবলিকান পিপল’স পার্টি’র নেতারা কর্তৃত্ব ধরে রাখতে বার বার ব্যর্থ হয়েছে। পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের মধ্যে একাধিক বার তুর্কি সেনাবাহিনী কেড়ে নিয়েছে দেশের দায়িত্বভার। এই প্রেক্ষাপটেই উত্থান ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’র। নেতৃত্বের অভাবে দিশেহারা তুর্কিরা নিজেদের উদারপন্থী মনোভাব সত্ত্বেও প্রশ্রয় দিয়েছেন এমন এক রাজনৈতিক দলকে, ধর্ম যাদের কাছে গোড়া থেকেই তুরুপের তাস।
নব্বইয়ের শুরুতে তুর্কিরা যে ভাবে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে বিপজ্জনক বাজি রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন, ভারতে আজ আমাদের অবস্থাও প্রায় সে রকমই। এর্দোয়ানের নিজস্ব উত্থান-ও কিন্তু মোদী ঘরানার। নব্বইয়ের দশকে তিনি ছিলেন ইস্তানবুলের মেয়র। বাকি তুরস্কের তুলনায় ইস্তানবুলের চোখ ধাঁধানো সাফল্য তাই নতুন সহস্রাব্দের শুরুতেই তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদটি উপহার দেয়। দীর্ঘ দিনের অপশাসন এবং দুর্নীতি দেখে দেখে তিতিবিরক্ত মানুষ ছুড়ে ফেলেন তথাকথিত উদারনীতিকে, ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে তাঁরা জোর গলায় চেয়ে নেন কাজের প্রতিশ্রুতি।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শুরু করার পর পরই এর্দোয়ান কাজও করেছিলেন বেশ ভাল, ফলত নতুন সহস্রাব্দেই ‘ইমারজিং ইকোনমি’ হিসাবে উঠে এসেছে তুরস্ক। তবে মনে রাখতে হবে, তখন ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার টোপ ঝুলছিল তুরস্কের সামনে। যত দিন গেছে, মূল ইয়োরোপের গোঁড়ামি চোখে পড়েছে। পরিষ্কার হয়েছে যে ইয়োরোপকে মধ্যপ্রাচ্য এবং ককেশাসের থেকে (আজেরবাইজান, আর্মেনিয়া ইত্যাদি) দূরে সরিয়ে রাখার জন্য একটা ‘বাফার স্টেট’ দরকার, আর তুরস্ককে টোপ দেখিয়ে দেখিয়ে সেই কাজটাই করিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্ম এবং ইয়োরোপীয় সত্ত্বাজনিত গোঁড়ামির কারণে তুরস্ককে স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া হয়নি। অদূর ভবিষ্যতেও হবে না। ব্রাসেলসের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অফিস যতই টেকনিক্যাল কারণ দেখাক, যতই বলুক যে ইউরোপের মানদণ্ডে তুরস্কের প্রগতি এখনও বাকি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের তালিকায় চোখ বোলালেই বোঝা যায়, শুধু সেটাই কারণ নয়— লাটভিয়া থেকে লিথুয়ানিয়া, বুলগেরিয়া থেকে মাল্টা যেখানে সদস্যপদ পেতে পারে, সেখানে তুরস্কের সদস্যপদ না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এর্দোয়ান যবে থেকে এই অঙ্কটা বুঝেছেন, তাঁর চোখ পড়েছে পূর্ব দিকে। ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ আনতে পারলে তুরস্কের ইতিহাসে তাঁর চির-উজ্জ্বল একটা স্থান থাকত। সেটা সম্ভব নয় জেনেই এর্দোয়ান মধ্য প্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছেন। যত দিন গেছে, নীতি নির্ধারণ হোক কি মৌখিক আলাপ-আলোচনা, তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামিকে বেশি করে আঁকড়ে ধরেছেন। সরকার এবং ক্ষমতাসীন শাসক দলের উৎসাহে হিজাব পরার চল বেড়েছে, মদ্যসামগ্রীর ওপর বসেছে অস্বাভাবিক বেশি কর, প্রেসিডেন্ট নিজে প্রকাশ্য সভায় উৎসাহ দিয়েছেন চার থেকে পাঁচটি করে সন্তান উৎপাদনে। পাগলের প্রলাপ নয়, এটা সুচতুর স্ট্র্যাটেজি। বিরোধীরাও বোকা নন, স্ট্র্যাটেজি তাঁরাও ভালই বোঝেন— জানেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে উদারপন্থা দিয়ে সমর্থন টেনে আনা যাবে না। অতএব তাঁরা চোখ ফেরালেন জাতীয়তাবাদের দিকে।
তুির্ক জাতীয়তাবাদ যে কত প্রবল, সেটা দিনকয়েকের জন্যে ঘুরতে এলেও টের পাওয়া যায়। কিন্তু ভাষা বা খাবার জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের বাইরেও কি এই জাতীয়তাবাদের কোনও বিরূপ প্রভাব আছে? অবশ্যই। দেশের সামান্যতম সমালোচনাতেও সাংবাদিকদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আগ্রাসী জনতার, আর্মেনিয়ান গণহত্যার ব্যাপারে আজও নীরব থেকে গেছে সমস্ত রাজনৈতিক দল। এমনকী, বিংশ শতকের শুরুতে এই নৃশংস হত্যাকান্ডে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা তুলে ধরার জন্য জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছে নোবেল জয়ী সাহিত্যিক অরহান পামুককে।
দেশকাল নির্বিশেষে যেহেতু ধর্মের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়ে গেছে, আজ তাই এক হিসাবে আতাতুর্কপন্থীদের সঙ্গে ইসলামপন্থীদের বিশেষ তফাত নেই। জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মের প্রবল প্রতিপত্তির জোরে এসে পড়েছে কর্তৃত্ববাদও— রাজনৈতিক নেতারা ভুলে যাচ্ছেন তুরস্কে গণতন্ত্র বহাল, আলোচনার বদলে তাঁদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘ডিকটাম’ বা আদেশবাণী। এই কর্তৃত্ববাদের জন্যই হয়তো সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মেয়েদের যতটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল তার কিছুই প্রায় দেখা যায়নি। যদিও, শুধু ইস্তানবুল দিয়ে তুরস্ককে বিচার করলে অন্ধের হস্তীদর্শন হবে।
এই যে অপশাসন নিয়ে হতাশার ফলে কট্টরপন্থীদের ওপর নির্ভর করা, একবিংশ শতকে এসেও ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য লক্ষ করা, কর্তৃত্ববাদের অনুপ্রবেশ, এই সব কিছুই কি বড় চেনা নয়? ভারতের কাছে ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের টোপ না থাকতে পারে, কিন্তু পশ্চিমি দুনিয়া যে ভাবে এশিয়ায় চিনের বিকল্প হিসাবে ভারতেকে দাঁড় করাচ্ছে, সার্বিক উন্নয়নের প্রশ্নে চোখে পড়ার মতন ব্যর্থতা থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যতের সুপারপাওয়ার বলে তোল্লাই দিচ্ছে, তাতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে বিলক্ষণ। জাতীয়তাবাদের প্রাবল্যে ভারতের বুদ্ধিজীবী মহল কাশ্মীর বা মণিপুরে সেনাসন্ত্রাস নিয়ে প্রশ্ন তুললেই যেমন জনসাধারণের রোষের শিকার হন, ঠিক তেমনই তুরস্কের দক্ষিণপূর্ব দিকে কুর্দ জনগোষ্ঠীর প্রতি তুর্কি সরকারের বৈমাতৃক মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলতে তুর্কি নাগরিক সমাজ ভয় পায়।
এই অন্তঃসারহীন উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্য শুধুমাত্র বিজেপি বা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে দোষী ঠাওরালে কিন্তু একটা বড় ভুল হবে। ভারত হোক বা তুরস্ক, মূলধারার সমস্ত রাজনৈতিক দলই এ দোষে অল্পবিস্তর দোষী। মনে রাখা ভাল, নিজের শাসনকালের সব থেকে দুর্বল মুহূর্তে এই জাতীয়তাবাদের ওপর ভরসা করেই নেহরু একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, যার জন্য দেশকে কম খেসারত দিতে হয়নি।
বলতেই পারেন, ঐতিহাসিক ভাবে ভারতে গণতন্ত্রের শিকড় তুরস্কের তুলনায় গভীরে গাঁথা। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না এই ভারতেই সত্তরের দশকে আমরা একুশ মাসের জন্য পেয়েছিলাম চরম স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। বিরোধীহীন রাজনৈতিক মঞ্চে একচ্ছত্র ক্ষমতা হাতে এলে তুরস্ক এবং ভারতে প্রকৃত গণতন্ত্রের সাধন একই রকম ভাবে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা। এহেন পরিস্থিতিতে হয়তো ভরসা জোগাতে পারে বাজার। মুম্বই বা ইস্তানবুলে স্টক মার্কেটের সূচক যখনই পড়বে, বিশ্বের বাজারে টাকা বা টার্কিশ লিরার অর্থনৈতিক গুরুত্ব যখনই কমে আসবে, ইমারজিং ইকোনমির তকমা সত্ত্বেও যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত বা তুরস্কে ঢুকতে ভয় পাবেন, দেখবেন দলের বিরোধিতা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদী রঘুরাম রাজনের পাশে দাঁড়াচ্ছেন বা অত্যন্ত অনিচ্ছায় হলেও টার্কিশ সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের কাজকর্মে প্রেসিডেন্ট এর্দোয়ান নাক গলাচ্ছেন না, ঠিক যেমনটি ঘটছে এখন।
মিল তো আরও একটা জায়গাতেও— ধনতন্ত্রের পথ থেকে এ মুহূর্তে বেরনোর ইচ্ছা বা উপায় কোনওটাই নেই এই দুই দেশের।
ইস্তানবুলের সাবাঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট-এ অর্থনীতির শিক্ষক।