Advertisement
E-Paper

উপরতলার সৌজন্য নীচের তলায় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ?

সামাজিক মিলন নয়, সংকীর্ণ রাজনীতি মানুষকে মানুষের থেকে দূরেই সরিয়ে দেয়। দলের স্বার্থকেই নিজের স্বার্থ বলে ভাবতে শুরু করে মানুষ। লিখছেন কৌশিকরঞ্জন খাঁযাঁর যখন ক্ষমতা থাকে, তাঁর তখন ভরা জোয়ারের স্রোতও থাকে। ফলে, যাঁরা বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নীতি-আদর্শের খাতিরে, তাঁদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৯ ০৩:০৬

রাজনীতি মানুষকে কতটা মনুষ্যত্ব দেয়? মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দেয় না কি? এখন বলে নয়, বাঙালি দীর্ঘদিন ধরেই সব পরিচয়ের উর্ধ্বে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের নিশান ওড়ায়। বেশির ভাগ মানুষের পিছনেই কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের লেবেল সাঁটা রয়েছে। যে পেশারই লোক হোন না কেন, তাঁর পেশাগত পরিচয় ঢাকা পড়ে যায় তিনি কোন দল করেন, সেই পরিচয়ের কাছে। কোন দল করেন, সে প্রশ্নও অনেক সময় অবান্তর হয়ে যায়। কারণ, দীর্ঘদিন বাংলার মানুষ বিরোধী রাজনীতি করার মতো জোরই পান না। এখানে সবাই শাসকদলে নাম লেখাতে চান।

যাঁর যখন ক্ষমতা থাকে, তাঁর তখন ভরা জোয়ারের স্রোতও থাকে। ফলে, যাঁরা বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নীতি-আদর্শের খাতিরে, তাঁদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। শাসক ছাড়া বিরোধী রাজনীতি করা লোকেদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই যেন এই বাংলায়। এটা বাঙালির স্বনির্বাচন। বাঙালি শাসক হতে ভালবাসে। গলায় শাসকদলের স্বর উঠে না এলে নিজের গলাকেই মিনমিনে মনে করে। শাসকদলের গড্ডলিকা প্রবাহে মিশে যাওয়ার প্রবণতা থেকেই বাংলায় ক্ষমতাসীন দল চট করে ক্ষমতাচ্যুত হয় না। মানুষ নানা ভাবে শাসকদলের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ জড়িয়ে ফেলে। ফলে, রাজনৈতিক পরিবর্তন তার কাছে অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে ওঠে।

কিন্তু এক সময়ে তা ছিল না। বরং একই পরিবারের সদস্যেরা নিজ নিজ পছন্দের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। এতে সমস্যায় পড়েছেন সংসার সামলানো অরাজনৈতিক মানুষটি। সমরেশ বসুর ‘শহিদের মা’তেও দেখা গিয়েছিল বাবা এবং তিন ছেলে আলাদা আলাদা পার্টি করছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মত পারিবারিক সম্পর্কেও চির ধরায়। সবাই নিজের নিজের পার্টিকেই সেরা মনে করছে আর ভাবছে, অন্য মানুষটার পথ ভুল। কেউ কারও জায়গা ছাড়ছে না। একই পরিবারের লোক পাশাপাশি খেতে বসে কথা না বলে খেয়ে উঠে চলে যায়। যে ভাইয়েরা ছোট ভাইকে না দিয়ে ছেলেবেলায় কিছু খেত না, সেই ছোট ভাই খুন হলে ভাইয়ের দাবি নিয়ে কেউই তার লাশ কাঁধে তুলে নেয়নি। উঠোন থেকে ছোট ভাইয়ের লাশ বেরিয়ে যায় পার্টির ছেলেদের কাঁধে চেপে। লাশকেও তাড়া করে স্লোগান। শহিদবেদি বানানো হয়। বছর না ঘুরতেই সেই বেদির ইট সরে যায়। কেউ খোঁজ রাখে না। শুধু শহিদের মা আঠারো বছর আগের একদিন তাঁর জরায়ুতে অনুভব করেন জননী-যন্ত্রণার সুখের দিনগুলো। কষ্ট পান রাজনীতির দৌলতে বাবার কাছে সন্তান অন্য পার্টির ছেলে হয়ে যায় বলে। কষ্ট পান ‘খুব বার বেড়েছে’ বলে দাদারা চোখ রাঙালেও কেউই নিজের পার্টি ছেড়ে এসে ভাইকে পার্টি ছাড়ার কথা বোঝায়নি বলে।

আজও একাধিক দলের কাছ থেকে সুযোগ নিতে কিংবা যাতে বিপদে না পড়তে হয়, সেই জন্য কখনও একই পরিবারের মানুষকে আলাদা আলাদা পার্টি করতে দেখা যাচ্ছে। ‘শহিদের মা’-এর মতো পারিবারিক মতবিরোধ পরিবারে সঙ্কট আনে না। বরং পরিবারের সঙ্কটকেই মোচনই করে। এটাও সুবিধাবাদের ভিন্ন রূপ। এই সুবিধাবাদ মানুষ নেতাদের কাছ থেকে শিখেছে। রাজনৈতিক দলকেও নিজের মতো ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছে সাধারণ মানুষ. সমস্যা হয়, যখন অনুগতদের দীর্ঘ লাইন পড়ে। লাইনের প্রথমে আর কোনও ভাবেই পৌঁছনো যাবে না ধরে নিয়ে পিছনের লোকেরা আস্তে আস্তে জোট বাঁধে। অন্য একটি দলকে শক্তিশালী করার সাধনায় মেতে ওঠে। তখনই লাগে দ্বন্দ্ব। লাইনের শেষের দিকের লোকেরা নিজেদের হাতে ক্ষমতা চায়, সুযোগ চায়, শাসকের ভারী কণ্ঠ চায়। আর যারা আনুগত্যের প্রথম সারিতে থাকে, তারা ভাবে, এই বোধ হয় সব গেল! নেতা নয়, সাধারণ মানুষই তাদের ক্ষমতার ব্যবস্থাকে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শুরু হয় বনবাসী মানুষের মতো গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।

প্রাচীন গোষ্ঠীবিবাদেই মানুষ আজও পড়ে রয়েছে। এক চুলও এগোয়নি। পশুশিকারে দখলদারি নিয়ে যে বিবাদ, সেই বিবাদেই মানুষ আটকে আছে। মানুষ রাজনৈতিক দলের অনুগত হয়ে গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। সেই গোষ্ঠীই ধ্যানজ্ঞান। পাড়ার ধনাদা ভাল হলেও অন্য পার্টি করায় তার সঙ্গে কথা বলা যায় না। বা ছোট থেকে দেখে আসা কিনু ভোটের বাজারে বাগড়া দিলে চরম ‘শিক্ষা’ দিতে হাত কাঁপে না!

রাজনীতি মানুষের নৈতিক বোধকে চুরি করছে। পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানে বিপরীত রাজনৈতিক দলের মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতেও আজ দ্বিধা হয়। অথচ, রাজনীতির উপরতলায় দিব্বি মিল-মহব্বত চলে। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় স্তরের নেতার মেয়ের বিয়ে হলে সব দলের শীর্ষনেতারা আমন্ত্রিত। হাসি মুখের ছবি ওঠে। রাজনৈতিক সৌজন্যের পোস্টার হিসেবে ধন্য-ধন্য পড়ে যায়!

সৌজন্য যদি সব মানুষের মধ্যে ছড়ায়, তা হলে কিছু নেতার কাছে সংগঠন বজায় রাখাটাই মুশকিল হয়ে পড়বে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ভোট না দিতে আসার জন্য শাসানোর কেউ থাকবে না। সমস্যা হল, কর্মীরাও রাজনীতির আফিম খেয়ে ফেলে। তাই একই পাড়া বা একই গ্রামের প্রতিবেশীর উপর আধলা ইট তুলে ছুটে যাওয়ার সময় এক বারের জন্যও মনে পড়ে না যে, নিজের নেতার ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে অন্য পার্টির নেতা এসে হাসি হাসি মুখে প্রীতি উপহার দিয়ে খেয়ে গিয়েছেন। নিজের নেতাকে অন্য নেতার পাশে দাঁড়িয়ে আর দু’পিস মাংস নেওয়ার জন্য যারপরনাই জোর করতেও দেখা গিয়েছে। উপরতলার সৌজন্যের বিজ্ঞাপন নীচের তলায় ঘটলে তা দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ হয়ে ওঠে!

(লেখক দক্ষিণ দিনাজপুরের মহাদেববাটী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Politics West Bengal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy