The accident is your training. Life is a choice. You can choose to be a victim or anything else you’d like to be.’—Peaceful Warrior   

‘ভুল আর খুব ভুলের মধ্যে যদি নির্বাচন করতে হয়, আপনি কোনটা নির্বাচন করবেন?’ আজ নবাবের জেলার তামাম লোকজনকে সেই চৌরাহায় এসে দাঁড় করিয়ে দিল লজ্জাকর একটি ঘটনা। এই ডায়ালগটি  হিন্দি সিনেমা ‘মম’-এর। দেবকী সাবারওয়াল এক জন মা। মেয়ের ধর্ষককে আইন শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়। হাত গুটিয়ে বসে না থেকে দেবকী ছুটে যান  প্রাইভেট  ডিটেকটিভ দয়া শঙ্করের কাছে। ‘ডিকে’র সামনেই তিনি এই প্রশ্নটা রাখেন। 

এ দিকে বাস্তবের কিশোরীকে নিয়ে এখন জেলা জুড়ে তোলপাড়। এ বারে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে। সামনে রেজাল্ট। সে তিন দিন  বাড়ি থেকে নিখোঁজ ছিল। ফিরে এসে জানায়, তাকে বাড়ি থেকে তুলে  নিয়ে গিয়ে ভিনগাঁয়ে অত্যাচার চালিয়েছে এক যুবক। ভোটে ব্যস্ত সকলে। দফতরে কর্মী নেই। থানায় এফআইআর নথিভুক্ত হল না। হল না মেডিক্যাল টেস্ট। ১৭ দিন পরে জানাজানি হতেই হইচই শুরু হল। রুজু হল মামলা। হল মেডিক্যাল টেস্ট! এফআইআর নিতে দেরি করায় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দিলেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ! 

কিন্তু মেয়েটির জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এল তার দায় কে নেবে? সারাজীবন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেলে ঘৃণা উগড়ে দেবে তার নাম গণতন্ত্র। প্রশ্ন করবে নিজেকেই— পুলিশ ও তাদের ভূমিকা নিয়ে বইয়ের পাতায় যা লেখা আছে  তা এত মিথ্যে কেন?           

২০১৯ সালের এই নির্বাচন ক্ষত হয়ে রইল এই কিশোরীর জীবনে। গণতান্ত্রিক উৎসবে অঘটন-মুহূর্তের মতো জেগে রইল ওই পরিবারে। এমন ঘটনা  আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিল মেয়েটির। যা গেল, তা আর ফিরবে না গোটা জীবনে। কিন্তু অপরাধীদের শাস্তির জন্য বিচারের দরজায় কড়া নাড়ার অধিকারটাও দুর্বল হয়ে পড়ল। প্রশ্ন একটাই, এই  গণতান্ত্রিক  অধিকার প্রয়োগ আসলে কার জন্য? জীবন সুনিশ্চিত নয়। অধিকার স্পষ্ট নয়। প্রশাসন, বিচার, আইন প্রকাশ্যে  ক্ষমতার গোলামি করছে। তবে মেয়েদের নিরাপত্তা দেবে কে? নাকি গণতন্ত্র শুধু এখন গদি দখলের লড়াই। মেয়েদের মর্যাদা রক্ষার অধিকার অপহরণ করলেও নির্বাচনে কোনও দলের কিচ্ছুটি হারানোর নেই। সমাজে একটি শ্রেণিকে নির্মম ভাবে পিছিয়ে রেখে গণতন্ত্রের ভুয়ো প্রদর্শন ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ আর কত দিন! 

‘মেয়ে অত্যাচারিত। পুলিশ নির্বিকার’। গণমাধ্যম প্রায় প্রতিদিনই এই বার্তা দিয়ে চলেছে। পরিবারে আত্মীয় বিয়োগের মতো হাহাকার। অপরাধীর প্রকাশ্য ‘আত্মগোপন’। জন্মসূত্রে মেয়েটির পাওয়া নাম তখন বাতিল। নতুন নামে ডাকা শুরু হয়। দামিনী, নির্ভয়া আরও কত কী! ঘটনা ঘটতে থাকে টানা বৃষ্টির মতো। অবিরাম, নিরবচ্ছিন্ন। পথঘাট ভেজে। আবার সোনালি রোদও ওঠে। লজ্জা ও হয়রানির সিরিজ চলতেই থাকে। কখনও মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলা, কখনও দশ বছরের মূক ও বধির কিশোরী, কখনও সত্তর বছরের প্রবীণা— নির্যাতনের তির চলছেই। বায়োস্কোপের ছবির মতো চোখের সামনে দিয়ে সরে সরে যায় কামদুনি, কাকদ্বীপ, পার্ক স্ট্রিট, শিমুলিয়া, রায়দীঘি, রামপুরহাট। কখনও অপেক্ষা, কখনও অপরাধীর মুক্তি, কখনও আবার দু’পক্ষের মিটিয়ে নেওয়ার প্রহসন। অপরাধীর শাস্তি নিয়ে বিভাগীয় তৎপরতা কম। দু’পক্ষের বিবাদ পুলিশি ও রাজনৈতিক  মধ্যস্থতায় মিটে যায়। ঘটনার ভয়াবহতা ও পুলিশি অপদার্থতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা— এই তিনের গল্পের সঙ্গে ধর্ষণের চিরাচরিত ঘর। এখন শিরোনামে রঘুনাথগঞ্জ। এ বারে নতুন সংযোজন গণতান্ত্রিক দোহাই। অপরাধীর সাহস বাড়ছে। মেয়েদের নিরাপত্তার ছাতায় শত ছিদ্রে  মেরামতির লোক কমছে।

‘হোয়াট ডু ইউ ডু হোয়েন জাস্টিস ফেল?’ এই প্রশ্নের উত্তর ‘আই ফর অ্যান আই’ উপন্যাস জুড়ে খোঁজা হয়েছে। সেখানে আইনি ব্যবস্থার ব্যর্থতার পর এক জন মা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক অসামরিক সংস্থায় যোগ দেন। ধর্ষকের শাস্তি দেন নিজের হাতে। ‘প্রমাণ কর আমি হন্তারক’— এক মায়ের এই স্বগতোক্তি দিয়ে শেষ হয় এই উপন্যাস অবলম্বনে হলিউড সিনেমা। প্রমাণের ফাঁসে আটকে থাকা বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণ মানুষকে অপরাধপ্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়। চোখের সামনে দেখা সত্যকে আইন ও আদালত মারফত  দ্বিতীয় বার প্রমাণ করতে ব্যর্থ মানুষ  সিস্টেমের প্রতি  আস্থা হারিয়ে ফেলে। আর সাধারণ পরিবারের মায়েরা তো রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যান। তাঁরা পুলিশের কাছে  যেতে বলেন। পুলিশ তাড়িয়ে দেয়। বেচারা মহিলা বাড়ি ফিরে কাঁদেন। তার পরে  কপালগুণে মেয়ে বেঁচে গেলে এক দিন মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। পরিবারও ভুলে যায় সব। অপরাধী আশ্রয় খুঁজে নেয় অন্যত্র। 

‘রেপ ইজ রেপ’-এ দেখা গিয়েছে, ধর্ষণে অভিযুক্তেরা কী ভাবে দায় অস্বীকার করে এবং রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক এজেন্ডা না হতে দেওয়ার জন্য ধর্ষণের ঘটনাকেই অস্বীকার করার এক ট্রেন্ড স্পষ্ট হয় পার্ক স্ট্রিটের ঘটনার সময় থেকেই। নির্যাতিতাকে দোষী সাব্যস্ত করার  রেওয়াজ চালু হয় তারও অনেক আগে। ‘ভাল মেয়ে রেপড হয় না’— এমন জিগির তুলে দেওয়া হয়। অপরাধ দমনের শিথিলতা ও অপরাধীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় ভিক্টিমের  চরিত্র নিয়ে মিথ্যা প্রচার। সেখানে সবথেকে বড় ভূমিকা নেয় রাজনীতি ও সামাজিক বিশ্বাস। সিভিল সোসাইটি অনেক ক্ষেত্রেই সত্যের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখতে ব্যর্থ হয়। এক জন মেয়ে তার প্রতি এমন অবিচার যা কখনও কোনও ভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়, তা ভুলে গিয়ে জীবনের মুলস্রোতে ফিরবে কী করে? প্রশ্ন একটাই—সংবিধান রক্ষার শপথ যদি সরকারি মান রক্ষার কাজে পরিবর্তিত হয় তবে কেন জনগণের   উপার্জিত অর্থে পুলিশদের চালানো হবে? 

শিক্ষিকা, রঘুনাথগঞ্জ হাইস্কুল