Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ নভেম্বর ২০২১ ই-পেপার

নীরবতা দিয়েই দায়পালন?

বিরোধীরা ঠিকঠাক পা ফেললে পরিস্থিতি এত মন্দ হত না

সুমিত মিত্র
০৯ ডিসেম্বর ২০২০ ০২:৩১
লজ্জা: বাবরি মসজিদের ধ্বংস রোখা যায়নি, অযোধ্যা, ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২

লজ্জা: বাবরি মসজিদের ধ্বংস রোখা যায়নি, অযোধ্যা, ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২

দেশবাসীর এক অংশ অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, না হলে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়ান্স গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে ৪৫ শতাংশ ভোট পেল কেমন করে? তবে আর এক দল মানুষ মোদীকে শুধু অপছন্দই করেন না, তাঁরা দেশের অপ্রত্যাশিত চেহারা পরিবর্তন দেখে শিউরে উঠছেন। এই ছয় বছরে তাঁরা বিশ্বাস হারিয়েছেন অনেক সাংবিধানিক রক্ষাকবচে— যেমন, আইন ও নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা। সে সব নিয়ে কোনও প্রকাশ্য বিতর্কে অংশগ্রহণ না করে তাঁরা ভয়ে চুপ থাকছেন, কারণ কথা বললেই ‘দেশবিরোধী’ অভিযোগে বিনা প্রমাণে কারাবাসের সম্ভাবনা। সেই সঙ্গে জনমানসে এই ধারণার উৎপত্তি হচ্ছে যে, আমরা চলেছি এমন এক লোক-দেখানো গণতন্ত্রের দিকে, যা বাইরে বহুদলীয় কিন্তু আসলে একদলীয়, এবং যা সংবিধানের বৈষম্য-বর্জনের নীতির তোয়াক্কা করে না। এক কথায়, আমরা চলেছি এক ‘হিন্দু পাকিস্তান’-এর দিকে।

তবে তার জন্য আজকের ভারতশাসকদের যাঁরা একক ভাবে দোষী ঠাওরাচ্ছেন, তাঁদের আর যা-ই থাক, ইতিহাসবোধ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে সর্বত্র একটি ধারণার জন্ম হয় যে, এই অন্ধকার অধ্যায়ের জন্য দায়ী হল জার্মানির ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা অ্যাডল্‌ফ হিটলার। দিন যায়। ক্রমশ ইতিহাস এক সার্বিক চেহারা পেতে শুরু করে। ষাটের দশকে প্রকাশিত ইংরেজ ইতিহাসবিদ এ জে পি টেলর-এর বই দি অরিজিনস অব দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়র— সে যুগের একটি ব্যতিক্রমী রচনা। নানা তথ্য দিয়ে টেলর দেখান, মধ্য-ত্রিশ দশকের জার্মান ফুয়েরার কিন্তু ঠিক বিশ্বজয়ী আলেকজ়ান্ডার বা নেপোলিয়নের মতো বিশাল উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেননি। টেলরের মতে, একটা আবছায়া পরিকল্পনা তাঁর নিশ্চয়ই ছিল— তা হল, সোভিয়েট রাশিয়া থেকে মানুষ উৎখাত করে সেখানে বসতি স্থাপন হোক তাঁর ‘রাইখ’-এর মানুষজনের। তাঁর ধারণা ছিল, পরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সোভিয়েট খতম হলে পশ্চিমি শক্তি খুশিই হবে। মাথায় ছিল জার্মানির পরিচিত আবদার ‘লেবেন্স্রম’ (বাঁচবার জায়গা), যা মেটানো হবে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত পুব দিকে ঢুঁ মেরে।

তত দিনে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে হাজির হয়েছেন ‘তোষণকারী’রা। তাঁদের উদ্দেশ্য দু’টি। এক, জার্মানি সত্যিই প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতায় বিশ্বের অগ্রগণ্য শক্তি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তাকে যোগ্য উচ্চ টেবিল থেকে বঞ্চিত করলে উল্টো ফল হবে। দুই, মস্কো-বিরোধিতা। অতএব ১৯৩৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন হিটলারের জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি সই করে গদগদ হয়ে বললেন, শান্তি পাকা হল আমাদের সময়ে। কিন্তু সেই চুক্তি মোটেই পুব দিকে জার্মান অভিযান বন্ধের পরিকল্পনা ছিল না। আক্রান্ত হয় পোল্যান্ড। সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেয়।

Advertisement

এ বার ফিরে আসি ভারত প্রসঙ্গে। মনে হয়, বর্তমান ধরনের অনুদার সঙ্কীর্ণচেতা ‘গণতন্ত্র’-এর অভ্যুত্থান আসলে পাকা হয়ে গিয়েছিল সেই ১৯৯২ সালে, যখন অযোধ্যায় সম্রাট বাবরের আমলে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হল লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর জোশী, উমা ভারতী প্রমুখ বিজেপি নেতার উপস্থিতিতে; অভিযোগ, সঙ্ঘের পরিকল্পনাক্রমেও বটে। এই ধ্বংসযজ্ঞে শুধু যে মসজিদটিই চুরমার হল তা নয়, প্রথম বড় ধাক্কা এল এই প্রতিষ্ঠিত ধারণায় যে, ভারতে সর্বধর্মের মর্যাদা সমান। ঘটনার সময়ে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সরকার। মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংহ সুপ্রিম কোর্টে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাবরি মসজিদের কোনও ক্ষতি তিনি ঘটতে দেবেন না। কিন্তু তাঁর সরকারের বেতনভুক সেপাইসান্ত্রির চোখের উপর দিয়ে এক উগ্র সাম্প্রদায়িক বাহিনী এসে পাঁচ ছয় ঘণ্টা শাবল হাতুড়ি সহযোগে পুরো মসজিদটি ধ্বংস করল, কেউ শূন্যে দুটো গুলি চালিয়েও তাদের ছত্রভঙ্গ করল না?

অবশ্য, কেনই বা করবে? বিজেপি তো যা চাইছিল— হিন্দু-মুসলমান বিভাজন রেখাটি তীক্ষ্ণ করা— তা-ই ঘটল। কিন্তু কেন্দ্রে তখন সরকার কার? এক কংগ্রেস-অধীন জোটের, যার প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও। তিনি তো অনেক আগে থেকেই জানতেন বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শঙ্কররাও চহ্বাণ ও সচিব মাধব গোডবোলে নভেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বলে আসছেন এই ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা ষোলো আনা, সংবিধানের ৩৫৫ ধারা প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার অবিলম্বে মসজিদ রক্ষার ভার গ্রহণ করুক, এবং একই সঙ্গে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে রাজ্যে জারি হোক রাষ্ট্রপতির শাসন। কিন্তু রাও কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। সেই সঙ্কটমুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী কী রকম টালবাহানা করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ আছে গোডবোলের আনফিনিশড ইনিংস গ্রন্থে।

কেন নরসিংহ রাও সঙ্ঘ পরিবারকে আগেভাগে দমন করতে সচেষ্ট হননি? বাবরি বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করলে কংগ্রেসের ‘অদৃশ্য শক্তি’ সনিয়া গাঁধী তাকে কী ভাবে দেখবেন, হয়তো রাও তা বুঝে উঠতে পারেননি। রাও অতি বিচক্ষণ নেতা হলেও জনমত প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকারকে বরখাস্ত করলে দেশে যে প্রতিক্রিয়া হবে, তাকে সামলাতে দরকার ছিল দেশনেতাসুলভ ক্ষমতা, যা ইন্দিরা গাঁধীর প্রয়াণের পর কংগ্রেস থেকে অন্তর্হিত হয়ে যায়। সুতরাং, চাকরি বাঁচানো শ্রেয় বুঝে রাও কংগ্রেসের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। আর একটি কারণও থাকতে পারে। তত দিনে গাঁধী পরিবারের প্রতি কংগ্রেসের সামন্ত্রতান্ত্রিক আনুগত্য লক্ষ করে তিনি হয়তো বুঝেছিলেন, ভবিষ্যতের পাল্লা কংগ্রেসের বদলে বিজেপির দিকেই ঝুঁকবে। হয়তো নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই চুপ করে ছিলেন এই প্রাজ্ঞ নেতা।

বাবরি ধ্বংসের পর ঘটল ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসেই মুম্বই দাঙ্গা ও ১৯৯৩ মার্চে মুম্বই বোমা বিস্ফোরণ। এই সময় থেকেই বিজেপির এক বিশ্বস্ত সমর্থকের দল তৈরি হল, যারা ‘ধর্মের রক্ষক’ বলে দলটির পূজা শুরু করল। হোয়াটসঅ্যাপের যুগে প্রধানমন্ত্রী মোদীর যে বিশ্বস্ত নারায়ণী সেনার দল জন্মায়, তাদের পূর্বপুরুষ এই নব্বইয়ের ভক্তরাই।

কংগ্রেস ও অন্যান্য বিজেপি-বিরোধী দলের কাছে ভবিষ্যতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে কৌশলী নেতা মোদীর উত্থান রুখবার আর এক, সম্ভবত শেষ, সুযোগ এসেছিল ২০০২ সালে। মর্মান্তিক গণহত্যার পর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী মোদীকে পদচ্যুত করতে গিয়েও বিজেপি প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী অত সাহস পেলেন না। বাজপেয়ী ভেবেছিলেন, মোদীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না করলে কংগ্রেস রাস্তায় নেমে পড়বে, বাধবে হইচই। কিন্তু তা হয়নি। ইউপিএ আমলেও মোদী নিরাপদে থেকেছেন। অভিযোগ, ২০০২ থেকেই মোদীরা ‘জগৎ শেঠ’দের সমর্থন পেয়ে আসছেন।

ত্রিশের দশকের ইংরেজ নেতারা ভাবছিলেন, জার্মানির সঙ্গে আগে এক বার যুদ্ধ করে আবার কেন যুদ্ধ করব? তা ছাড়া ওদের দিয়ে স্তালিনদের দমাতে পারলে উপকার বেশি, কারণ ইউরোপে কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের ভয় থাকবে না। ভারতে কংগ্রেসের লড়াই আজ বহু কাল যাবৎ আদর্শের নয়, অস্তিত্বের। তাদের না আছে দায়, না দায়িত্ব। তা ছাড়া ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাহায্যের উপর দল সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীল। ফলে, সংবিধান কচু কাটা করুন মোদী, বয়েই গেল। শুধু চাই বিরোধী নেতার তকমাটি।

আরও পড়ুন

Advertisement