E-Paper

অকল্পনীয়

সমস্যাটি কেবল তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক জটিলতা নয়; তা সংবিধানপ্রদত্ত ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন। ভোটাধিকার কোনও শর্তসাপেক্ষ সুবিধা নয়, নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:১৭

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে যে, বিপুলসংখ্যক নাম ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)-দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, হেনস্থার অভিযোগ এবং নাগরিকদের বিভ্রান্তি— সব মিলিয়ে স্পষ্ট, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং কাঠামোগত ত্রুটি। কারও এই সংশয় হওয়াও বিচিত্র নয় যে, এর পিছনে কোনও বৃহত্তর নকশাও থাকতে পারে। কোথাও শুনানিতে জন্মের শংসাপত্র জমা দেওয়ার পরেও নিষ্পত্তি হয়নি; কোথাও আবার নথি থাকা সত্ত্বেও নাম ‘আনম্যাপড’ বা ‘বিবেচনাধীন’ থেকে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা রিচা ঘোষের নামও ‘বিবেচনাধীন’। এমনকি, বহু বিএলও-র নাম ওঠেনি চূড়ান্ত তালিকায়। প্রক্রিয়া চলাকালীন নিয়ম ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন, নির্দেশের অস্পষ্টতা এবং তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার অভাব— সব মিলিয়ে একটি অস্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই অব্যবস্থাকে নিছক ‘কারিগরি বিভ্রাট’ বলে চালানোর অবকাশ নেই। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে যে ভঙ্গিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) বা ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও)-এর উপরে দায় চাপানোর চেষ্টা হয়েছে, সেটিও চলতে পারে না।

সমস্যাটি কেবল তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক জটিলতা নয়; তা সংবিধানপ্রদত্ত ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন। ভোটাধিকার কোনও শর্তসাপেক্ষ সুবিধা নয়, নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ‘বিবেচনাধীন’ তকমা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঝুলিয়ে রাখার অর্থ, কার্যত তাঁদের ভোটাধিকার অনিশ্চিত করা। কমিশনের দাবি অনুযায়ী যাবতীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও নিষ্পত্তি না-হলে সে দায় নাগরিকের উপরে বর্তাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নির্বাচন কমিশন একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; তার দায়িত্ব কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়, ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখা। তদন্তমূলক প্রতিবেদনগুলিতে উঠে এসেছে, সংশোধন প্রক্রিয়ায় নিয়ম ও পদ্ধতি মাঝপথে বদলানো হয়েছে, সফটওয়্যারের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে, এমনকি স্থানীয় স্তরের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছে— অথচ সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট লিখিত নির্দেশ বা সর্বজনবিদিত মানদণ্ড ছিল না। ইআরও বা বিএলও-দের ভূমিকা সঙ্কুচিত করে নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত হয়েছে উচ্চতর স্তরে। যদি প্রক্রিয়ার নকশা, সফটওয়্যার-নির্ধারিত শ্রেণিবিভাগ এবং যাচাই-প্রক্রিয়াই অস্পষ্ট থাকে, তবে দায়ও কর্তৃপক্ষের।

প্রশ্ন হল, সম্ভাব্য তথ্যগত অসঙ্গতি মোকাবিলায় পূর্বনির্ধারিত স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট সময়-অনুসারী সংশোধন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি কেন? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি নামের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি বানানের রকমফের, মধ্যনাম ও পদবির বিচিত্রতা বাস্তব সত্য। কমিশন-নিযুক্ত মাইক্রো-অবজ়ার্ভারদের, বিশেষত অ-বাঙালি আধিকারিকদের কি এ নিয়ে আগে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন ছিল না? বৈধ নাগরিকের ক্ষেত্রেও সব তথ্য পাওয়া না-ও যেতে পারে, নানা কারণে অনেকে আনম্যাপড থেকে যেতে পারেন— কমিশনের পক্ষে কি তা অনুমান করা কঠিন ছিল? উপরন্তু, ভোটার ম্যাপিং থেকে শুরু করে তথ্যগত অসঙ্গতি, সব ক্ষেত্রেই এআই-এর ব্যবহার করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। সংশয় হয়, বাঙালি নাম-পদবি ইত্যাদির বহুরূপ নিয়ে এআই-কেও যথোপযুক্ত ডেটা, মডেল ইত্যাদির জোগান দিয়ে ভোটারের তথ্য ‘বিচার’-এর উপযুক্ত করে তোলা হয়নি; স্বয়ংক্রিয় পুনর্বিবেচনা ব্যবস্থা, আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং স্পষ্ট মানদণ্ডও আগে থেকে তৈরি রাখা হয়নি। ভোটার তালিকা যথাযথ ভাবে যাচাই করা কমিশনের অধিকার, কিন্তু তা প্রক্রিয়াগত অস্পষ্টতার বেনোজলে ভেসে গেলে নাগরিকের পক্ষে গোটা ব্যবস্থায় আস্থা বজায় রাখা অসম্ভব। নাগরিকের ভোটাধিকার নিয়ে এই ছেলেখেলা অকল্পনীয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Special Intensive Revision West Bengal SIR SIR hearing West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy