বর্তমান ভারতে, বলিউড এবং ক্রিকেট, আমজনতার সর্বাধিক আগ্রহের দু’টি বিনোদনই এখন রাজনৈতিক। দেশের মূলস্রোতে প্রতিষ্ঠিত যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, তার সঙ্গে এগুলি সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশি খেলোয়াড় মুস্তাফিজ়ুর রহমানের আইপিএল-এ খেলা নিয়ে যে কুনাট্য অভিনীত হল, প্রকৃতপক্ষে তা রাজনীতির সর্বগ্রাসেরই এক মোক্ষম উদাহরণ। রাজনীতির এই গ্রাস বহুস্তরীয়। প্রথমত, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে কূটনৈতিক অস্থিরতা চলছে, তাকে পর্যবসিত করা হল দেশপ্রেমের প্রশ্নে। গত বছর থেকেই বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষী সুর ক্রমাগত চড়ছে, কিন্তু ভারতের ক্রিকেট-সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হয়তো তা নয়। প্রধান কারণ হল, বাংলাদেশে এখন হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা আগের থেকে অনেক বেশি বাড়ছে, প্রকাশ্য হচ্ছে। যে যে ঘটনা সেখানে ঘটছে, তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। প্রতিবেশী দেশের সমাজে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে তার প্রকাশ্য নিন্দা এবং প্রয়োজনে অন্য কোনও পদক্ষেপ করাই উচিত। কিন্তু সেই পদক্ষেপ হওয়া উচিত, আন্তর্জাতিক কূটনীতির স্তরে। অথচ দেখা গেল, এই প্রশ্নে উগ্র দেশপ্রেম জাগানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশয় হয়, হিন্দু রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরকে এখন জাতীয় সুর হিসাবে বিবেচনা করে সমাজে ও ঘরোয়া রাজনীতিতে তাকে কেন্দ্র করে তুফান তোলার উদ্দেশ্যেই ভারতের মুস্তাফিজ়ুর সিদ্ধান্ত। এর উত্তরে, বাংলাদেশ যে ভঙ্গিতে টি২০ বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে না-আসার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, তা-ও একই রকম বিদ্বেষপ্রসূত। প্রশ্ন হল, ভারত যদি বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের মতোই হতে চায়, তবে তাদের সমালোচনা করে কোন যুক্তিতে?
দ্বিতীয় স্তরে বলা যায়, ক্রিকেটের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘দেশপ্রেম’-এর গুরুভার। খেলার শেষে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত না-মেলানোর মতো অসৌজন্যে তার প্রকাশ। বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে আইপিএল থেকে বাদ দিতে বলা আর একটি। ‘খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তি’ নামক কথাটি এখন অতীত— ফলে, যে দ্বন্দ্বের সমাধান হওয়ার কথা কূটনীতির পরিসরে, প্রয়োজনে বহুজাতিক মধ্যস্থতার সাহায্যে, সেই ‘যুদ্ধ’ এখন ক্রিকেট মাঠেও ঢুকে পড়েছে। কেন ক্রিকেট বা বলিউডের সিনেমা এমন উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রদর্শনী হয়ে উঠল, সে কারণটি বোঝা কঠিন নয়— এই দু’টি মাধ্যমকে ব্যবহার করতে পারলে সবচেয়ে সহজে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় বিদ্বেষের বার্তা। দুর্ভাগ্যজনক, বহু অভিনেতা/নির্দেশক বা খেলোয়াড়ই এই বিদ্বেষের স্বেচ্ছা-বাহক। নিজেদের পেশায় তাঁরা যে জনপ্রিয়তা ও প্রভাব অর্জন করেছেন, তাকে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহৃত হতে দিতে তাঁদের আপত্তি নেই, বরং বিশেষ আগ্রহ আছে।
তৃতীয় স্তরে দেখা সম্ভব, রাষ্ট্রীয় মদতপ্রাপ্ত এই বিদ্বেষের রাজনীতি কী ভাবে দখল করে নিচ্ছে বাজারকেও। আইপিএল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিসিসিআই কোনও সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, তা এক ক্রীড়া প্রশাসক সংস্থামাত্র। তার পরিচালিত হওয়ার কথা ক্রিকেটের বাজারের ধর্ম অনুসারে। অবশ্য, সে সংস্থা কী ভাবে চলে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই। বিসিসিআই আইপিএল-এর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি কেকেআর-কে বলল, মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে ছেড়ে দিতে। কেকেআর টুঁ শব্দটি না-করে নির্দেশ পালন করল। খেলোয়াড় হিসাবে মুস্তাফিজ়ুরের মূল্য কতখানি, সে প্রশ্ন বিবেচনায় আসেনি বলেই অনুমান করা যায়। তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করল না, তার একটি কারণ রাজনৈতিক চাপ; কিন্তু অন্য কারণ বাজার। রাজনৈতিক বিদ্বেষের বার্তা এমন ভাবে দর্শকদের মনে ঠাঁই পেয়েছে যে, বোর্ডের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে মুস্তাফিজ়ুরকে খেলালে তার তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এক রকম অনিবার্য ছিল। সযত্নে রোপণ করা ও লালন করা বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়ছে। সেই ফল আস্বাদন করাই এখন ভবিতব্য।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)