পশ্চিমবঙ্গ এক এমন রাজ্য, যেখানে শিশুর পাতের খাবারের পদও স্থির করে দেয় নির্বাচনী রাজনীতি। বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে মিড-ডে মিলে বাড়তি খাবার দেওয়ার নির্দেশ জারি করল স্কুল শিক্ষা দফতর। এ যেন স্কুলে স্কুলে ‘ভোটের ভোজ’— আস্ত ডিম, ফলের টুকরো দিয়ে। এই নির্লজ্জ প্রহসন যে বছরের পর বছর চলতে পারে, তা অকল্পনীয়। কিন্তু ‘অবিশ্বাস্য’-কে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলাই হয়ে উঠেছে আজকের দলীয় রাজনীতির প্রধান খেলা। পর পর তিন বার ভোটের আগেই বাড়ল স্কুলপড়ুয়াদের খাবারের বরাদ্দ— ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন, এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। মনে হতে পারে, এ তবু মন্দের ভাল। ভোট আসছে বলে দু’টুকরো ফল, একটা ডিম জুটছে, নইলে তা-ও জুটত না। মিড-ডে মিলের খাবারে প্রাথমিকের পড়ুয়াদের পাতে থাকবে দৈনিক অন্তত ৩০০ ক্যালরি, যার মধ্যে আট-বারো গ্রাম প্রোটিন রাখতে হবে, এমনই নির্দেশ দিয়েছিল বটে শীর্ষ আদালত (২০০১), কিন্তু সে কথা কে-ই বা মনে রেখেছে? ভাতের পাতে জলবৎ ডাল, আনাজ-বিরল ঝোলই জোটে শিশুদের। সংসদ পাশ করেছিল খাদ্যের নিরাপত্তা আইন (২০১৩), কিন্তু ‘নিরাপত্তা’ কথাটাকেই তামাদি করে দিয়েছে রাজনীতি। যা কিছু মেলে নাগরিকের, তা সবই শাসকের বদান্যতায়— এই হল আজ রাজনীতির দাবি। হায়, সেই বদান্যতাতেও দেখা যাচ্ছে ভাটার টান। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে চার মাস (জানুয়ারি-এপ্রিল, ২০২৩) মুরগির মাংস আর ফলের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৩৭১ কোটি টাকা। বিধানসভা ভোটের আগে মাত্র বারো দিন বারোটি বাড়তি ডিম আর মরসুমি ফল দেওয়ার নির্দেশ এসেছে, বরাদ্দ ৭৭.৯৪ কোটি টাকা। সে টাকাও বাড়তি বরাদ্দ নয়, মিড-ডে মিলের বরাদ্দ থেকে বেঁচে যাওয়া টাকা। মাছের তেলে মাছ ভাজার যথার্থ উদাহরণ।
কিন্তু মাছ আর তেল— অর্থাৎ শিশুর সংখ্যা আর বরাদ্দ টাকা— দুটো নিয়েই বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এক কোটি ১১ লক্ষ ছাত্রছাত্রী নথিভুক্ত, অথচ সরকারি নির্দেশে অতিরিক্ত ডিম ও ফলের বরাদ্দ ধরা হয়েছে মোট ৮১ লক্ষ ১৯ হাজার ছাত্রছাত্রীর জন্য। শিক্ষা দফতরের এক কর্তার ব্যাখ্যা, তাঁদের নথি অনুসারে ৩০ লক্ষ ছাত্রছাত্রী মিড-ডে মিল খায় না, তাই তাদের বরাদ্দ ধরা হয়নি। এই স্বীকারোক্তি রাজ্যের শিশুশিক্ষার ভয়ানক চেহারাটি সামনে নিয়ে এল। নিয়মিত মিড-ডে মিল না-খাওয়ার একটাই অর্থ হতে পারে— ওই ছেলেমেয়েরা নিয়মিত স্কুলে আসে না। এই ঘাটতির কথা ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিদর্শনেও ধরা পড়েছে। পিএম-পোষণ প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যের ১৫টি জেলায় ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি ছাত্রছাত্রী মিড-ডে মিল খাচ্ছে না। এই হার সবচেয়ে কম কোচবিহারে— মাত্র ৪৬ শতাংশ। এই সব পরিসংখ্যান স্কুলছুটের ব্যাপকতার ইঙ্গিত দেয়। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজ্য সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল কেন্দ্রের স্কুলশিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগ। রাজ্য উত্তর দিয়েছে কি না, দিয়ে থাকলে কী সেই উত্তর, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
এখন রাজ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করল যে, ৩০ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর শিক্ষার অধিকার, খাদ্যের অধিকার ধূলিসাৎ হয়েছে। সরকার যাকে ‘বাড়তি’ বরাদ্দ দেখাতে চায়, তা আসলে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় ভয়ানক ঘাটতির পরিণাম। অথচ, বাস্তবিক বাড়তি বরাদ্দ দিচ্ছে অনেক রাজ্য। যেমন, তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যের টাকায় স্কুলগুলিতে প্রাতরাশ দিচ্ছে। কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা রাজ্যের তহবিল থেকে মিড-ডে মিলে বাড়তি ডিম দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের ‘বদান্যতা’ কেন এমন অর্থপূর্ণ, সুপরিণামী পথ গ্রহণ করে না? যেখানে জ্বালানি, ভোজ্য তেল, মশলা— সবের দাম ঊর্ধ্বগামী, সেখানে মিড-ডে মিলে বরাদ্দ কেন বাড়ে না? বিধানসভা ভোটের আগে বারো দিনে বারোটি ডিম, কয়েক টুকরো ফল— এই কি এই রাজ্যের শিশুদের প্রাপ্য?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)