E-Paper

বিলম্বের খেলা

জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের টাকা আটকে দেওয়ার কারণগুলি যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, এমন নয়।

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১২
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

মাত্র এক মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে পাঁচশো কোটি টাকা খরচ করে তার হিসাব দাখিল করতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের কাছে এমন অসম্ভব দাবি করল কেন্দ্র। গত ফেব্রুয়ারির শেষে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের জন্য বরাদ্দ (২০২৫-২৬) টাকার মধ্যে ৫০২ কোটি টাকা ছাড়া হল রাজ্যের জন্য, যার সঙ্গে রাজ্যের প্রদেয় ৩০০ কোটি টাকা যোগ করেছে তৃণমূল সরকার। ৩১ মার্চের মধ্যে ৮০০ কোটি টাকা খরচ করতে না পারলে কেন্দ্রের টাকা ফেরত চলে যাবে। তড়িঘড়ি দাখিল করা হিসাবে ভুলভ্রান্তি বেরোলে তা দেখিয়ে কেন্দ্র ফের ওই প্রকল্পের টাকা আটকে দেবে। নতুন কথা নয়— হিসাব মেলেনি, বিধি পালিত হয়নি, এমন নানা অছিলায় বিরোধী রাজ্যগুলিতে নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দেওয়া নরেন্দ্র মোদী সরকারের পরিচিত ‘খেলা’। কিন্তু আবাসন প্রকল্পের বাড়ি, নলবাহিত জল অথবা একশো দিনের কাজের প্রকল্পের মজুরি পেতে বিলম্ব হওয়ার ক্ষতি যদি বা সামাল দেওয়া যায়, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তা কি সম্ভব? রোগযন্ত্রণার তীব্রতা, সংক্রামক অসুখের বিস্তার, প্রসূতি ও শিশুর প্রাণের ঝুঁকি কি টাকার অপেক্ষা করবে? জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মধ্যে যে বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত তার মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে অত্যাবশ্যক ওষুধের সরবরাহ এবং মেডিক্যাল পরীক্ষা, প্রসূতি ও শিশুর পরিষেবা, টিকাকরণ, অ্যাম্বুল্যান্স এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পরিকাঠামোর উন্নয়ন। নাগরিকের জীবনের অধিকার রাষ্ট্র বাস্তবিক সুরক্ষিত করতে চাইলে এগুলির তৎক্ষণাৎ জোগান দিতে হবে। বিলম্বের পরিণাম চোকাতে হবে প্রাণের মূল্যে, অকারণে দীর্ঘায়িত যন্ত্রণার মূল্যে। যার প্রকৃত পরিমাপ কখনওই সম্ভব নয়।

অথচ, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের টাকা আটকে দেওয়ার কারণগুলি যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, এমন নয়। কেন্দ্রের দাবি, ভারতের সর্বত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিকে ‘আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির’ নাম দিতে হবে। কেরল ‘জনারোগ্য কেন্দ্রম্’, পঞ্জাব ‘আম আদমি ক্লিনিক’, পশ্চিমবঙ্গ ‘সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ রাখতে চাওয়ায় তাদের বরাদ্দ টাকা (২০২৩-২৪) আটকেছিল কেন্দ্র। স্পষ্টতই, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যের চাইতে কেন্দ্রগুলির ‘ব্র্যান্ডিং’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কেন্দ্রের কাছে। অথচ, স্বাস্থ্য যৌথ তালিকার বিষয়, এবং জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের খরচের ৪০ শতাংশ দেয় রাজ্য সরকার। প্রায় দু’তিন বছর নানা রাজ্যে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে। সর্বত্র বরাদ্দ টাকা আটকে দিয়ে রাজ্যগুলিকে ‘পথে এনেছে’ কেন্দ্র। দীর্ঘ সংঘাতের শেষে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে নামকরণ এবং লোগোর ব্যবহার নিয়ে বোঝাপড়া হয়েছে কেন্দ্রের। এই সমঝোতার পরে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য ৩৬১ কোটি টাকা তহবিল থেকে পাঠায় কেন্দ্র। বকেয়া ছিল আরও বড় অঙ্ক।

শেষ মুহূর্তে সেই বকেয়া টাকার একাংশ এসে পৌঁছেছে। ফলে বরাদ্দের ব্যবহারে বড়সড় ফাঁক থেকে যেতে বাধ্য। তাই প্রশ্ন ওঠে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ‘ব্র্যান্ডিং’ নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সমঝোতা হলেও, নাগরিকের স্বাস্থ্যসুরক্ষার চাহিদার সঙ্গে প্রকল্পের সমঝোতা হয়েছে কতটুকু? সংবাদে প্রকাশ, রাজ্যের বেশ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ ২০ মার্চের মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অতি সামান্য টাকাই খরচ করতে পেরেছে, কারও বা খরচের অঙ্ক শূন্য। একেই ভারতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ যথেষ্ট নয়, তার পর সেই বরাদ্দের সম্পূর্ণ খরচও সম্ভব হচ্ছে না। খুঁড়িয়ে চলা, কোনও মতে চলা— এই যেন জনকল্যাণের প্রকল্পগুলির ভবিতব্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাবি করেছে যে রাস্তা, আবাস, জল, মনরেগা-র মজুরি-সহ গ্রাম উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের খাতে কেন্দ্র দু’লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া রেখে দিয়েছে। এই বিশাল অঙ্ক কেবল রাজ্যের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। রাজ্যের ত্রুটি, দুর্নীতি অবশ্যই সংশোধন করা দরকার, কিন্তু জনকল্যাণের প্রকল্পগুলির গতি রুদ্ধ করলে নাগরিককে শাস্তি দেওয়া হয়, এ সত্যটা উপেক্ষা করা কেবল অবহেলা নয়, অপরাধ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy