Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

চাই সামগ্রিক কৃষি নীতি

কৃষিতে লগ্নি নেই, তাই দিনে দিনে অকুশলতার পাহাড় জমেছে

আমেরিকায় বা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কৃষির অনুপাত গত কয়েক দশকে অতি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

বিশ্বজিৎ ধর
১২ জানুয়ারি ২০২২ ০৮:৫০

কেন্দ্রীয় সরকার যে শেষ অবধি তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হল, তাকে ভারতীয় কৃষকদের এক বিপুল জয় হিসাবে না দেখার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা বহু চেষ্টা করেও কৃষকদের বোঝাতে পারেননি যে, ওই আইন তিনটি কৃষকদের হিতার্থেই তৈরি করা হয়েছিল! আইন প্রত্যাহার ঘটনাটিকে কেন্দ্রীয় শাসকরা নিছক একটি পরাজয় হিসাবে দেখবেন, না কি এর থেকে শিক্ষা নেবেন যে, কোনও আইন বা নীতি প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট নাগরিক সমাজের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন, সব পক্ষের স্বার্থের কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন— সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। ভারতে ‘নাগরিক কেন্দ্রিক’ উন্নয়নের গুরুত্ব নিয়ে দশকের পর দশক আলোচনা হয়েছে।

এই বার কি নীতিনির্ধারকরা আইন প্রণয়নের সময় এই ভাবনাকাঠামোকে নিজেদের চিন্তার কেন্দ্রে রাখবেন?

‘নাগরিক কেন্দ্রিক’ উন্নয়ন ভাবনার অভাবে দেশের যে ক্ষেত্রটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে কৃষি। ভারতে প্রায় সব ক’টি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের জন্যই সরকার একাধিক বার বিস্তারিত নীতি প্রণয়ন করেছে— ব্যতিক্রম শুধু কৃষি। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মধ্যেই, ১৯৪৮ সালে, প্রথম শিল্পনীতি প্রণীত হয়েছিল। সেটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। অথচ, কৃষি নীতি বলতে হাতে রয়েছে শুধু একুশ শতকের গোড়ায় এনডিএ সরকারের তৈরি করা খসড়া নীতি। কেউ যদি একে ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় কৃষির ক্রমহ্রাসমান গুরুত্বের প্রতিফলন হিসাবে দেখতে চান, সেটা ঠিক হবে না।

Advertisement

আমেরিকায় বা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কৃষির অনুপাত গত কয়েক দশকে অতি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। আমেরিকার জিডিপি’র মাত্র এক শতাংশ আসে কৃষি থেকে; ইউরোপীয় ইউনিয়নে চার শতাংশ। কিন্তু, আমেরিকায় বা ইউরোপের দেশগুলিতে নিয়মিত কৃষি নীতি প্রণীত হয়। আমেরিকায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কৃষি নীতি তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি প্রতি দশকে এক বার অভিন্ন কৃষি নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু ভারতে, যেখানে এখনও জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল, সেখানে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কৃষি নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করে উঠতে পারেনি।

একটা সামগ্রিক কৃষি নীতি না থাকায় ভারতের কৃষির বিভিন্ন রকম ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতির চরিত্র বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দিই— দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বহু ক্ষেত্রেই একটা চড়া বৃদ্ধির হারের সময় এসেছে। কৃষিতে কখনও আসেনি। কৃষিতে সবচেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধি ঘটেছিল ১৯৮০’র দশকে, যখন দশকওয়ারি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছিল সাড়ে তিন শতাংশে। অন্য দিকে, অ-কৃষি ক্ষেত্রে কিন্তু ১৯৮০ থেকে ২০০০-এর দশকে ধারাবাহিক বৃদ্ধি ঘটেছিল। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় কৃষি এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিল। ‘সবুজ বিপ্লব’-এর সূচনার মাধ্যমে তার থেকে উদ্ধার পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি ১৯৮০-র দশকের আগে ঘটেনি। এবং, পরবর্তী দশকগুলিতে এই বৃদ্ধি ধরে রাখাও যায়নি। আর্থিক সংস্কার যে ভারতীয় কৃষিকে পাশ কাটিয়েই চলে গিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

ভারতীয় কৃষির উৎপাদনশীলতা কেন কম? তার অন্যতম কারণ অপ্রতুল সেচ পরিকাঠামো। ২০১৫-১৬ সালেও, দেশের মোট যে কৃষিজমিতে ধান, গম, বার্লি, আখ, আলু, ফলের মতো প্রধান ফসল উৎপন্ন হয়েছিল, তার প্রায় অর্ধেক সেচের আওতার বাইরে ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, যে ২৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে ২১টি রাজ্যেই প্রধান ফসলের জন্য ব্যবহৃত জমির যত শতাংশ সেচের অধীন, সেই অনুপাতটি জাতীয় গড়ের তুলনায় কম।

এখনও এত জমি সেচের আওতার বাইরে থেকে গিয়েছে কেন? তার কারণ, কৃষি-সহায়ক পরিকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সেই অপ্রতুলতার কারণ হল, কৃষিতে বিনিয়োগের অভাব। ১৯৫০-এর দশকের বেশির ভাগ বছরেই কৃষিতে লগ্নির পরিমাণ দেশে মোট লগ্নির অন্তত ২০ শতাংশ ছিল। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-র দশকেও এই অনুপাতটি ১৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে থাকত। কিন্তু, ১৯৮০-র দশকের মধ্যভাগ থেকেই কৃষিতে লগ্নির পরিমাণ কমতে থাকে— বিশেষত, একবিংশ শতকের সূচনা থেকে এই অনুপাত অতি দ্রুত কমছে। সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৯-২০ সালে দেশে মোট লগ্নির মাত্র ছয় শতাংশ এসেছিল কৃষিক্ষেত্রে।

১৯৮০-র দশকের শেষ থেকেই ভারতে আর্থিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের কথা হল, কোনও সরকারেরই মনে হয়নি, যে ক্ষেত্রটিতে দেশের সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়, সেটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কিছু করা প্রয়োজন। কেউ বলতে পারেন, ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় কৃষির আপেক্ষিক গুরুত্ব কমেছে, এবং তারই প্রতিফলন ঘটেছে দেশের মোট লগ্নিতে কৃষিক্ষেত্রের অনুপাতে। সামান্য পাটিগণিতের হিসাব বলে দেবে যে, এই যুক্তিটি দাঁড়ায় না। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কৃষির অবদানের অনুপাত, এবং দেশের মোট লগ্নিতে কৃষিক্ষেত্রে লগ্নির অনুপাত হিসাব করলেই স্পষ্ট হবে যে, ১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে কৃষিতে লগ্নির পরিমাণ অনুপাতের চেয়ে বেশি হারে কমেছে। জিডিপিতে কৃষির যা অবদান, তার তুলনায় কৃষিতে লগ্নির পরিমাণ চিরকালই কম ছিল, কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে এই ব্যবধানটি আরও বেড়েছে।

এমনিতেই বিনিয়োগ কম, তার উপর যদি সেই বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান হয়, তা হলে ক্ষেত্রটিতে বৃদ্ধির হার যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা অনুমান করা যায়। অন্য একটি তথ্য থেকেও এই ক্ষতির আঁচ পাওয়া যেতে পারে। বিশ্বের সব প্রধান খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রেই ভারত সর্বাগ্রগণ্য উৎপাদক দেশগুলির অন্যতম। কিন্তু, রাষ্ট্রপুঞ্জের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজ়েশনের পরিসংখ্যান বলছে যে, সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতার বিচারে ভারত প্রথম সারির দেশগুলির চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যেমন, ২০১৯ সালে ভারতে এক হেক্টর জমিতে ২.৭ টন ধান উৎপন্ন হয়েছিল, যেখানে অস্ট্রেলিয়ায় উৎপন্ন হয়েছিল ৮.৮ টন ধান। গমের ক্ষেত্রেও ছবিটি একই রকম— ভারতে এক হেক্টর জমিতে উৎপন্ন হয়েছিল ৩.৫ টন গম, আয়ার্ল্যান্ডে হয়েছিল ৯.৪ টন।

এই নিম্নস্তরের উৎপাদনশীলতার কথা মাথায় রাখলে অনেকগুলি বিষয় স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়— কেন ১৯৮০-র দশক থেকে ২০০০-এর দশকের মধ্যভাগ অবধি কৃষির উপাদানের তুলনায় উৎপন্ন ফসলের দাম (যাকে বলা হয় টার্মস অব ট্রেড) কমেছে; কেনই বা ভারতের ৯৯.৪৩ শতাংশ কৃষিজমিতে চাষ করে নিম্ন আয় ও নিম্নবিত্ত সম্পন্ন কৃষক পরিবার। ভারতে কৃষি যে এখন নিতান্তই অ-লাভজনক একটি বৃত্তি, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে কি?

সরকারকে কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে কৃষকরা একটা লড়াই জিতেছেন ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তাঁরা এখনও হারছেন। গত কয়েক দশকে কৃষিক্ষেত্র যে অবহেলার শিকার হয়েছে, তা দূর করার জন্য যদি এখনই কেন্দ্রীয় সরকার একটি সার্বিক কৃষি নীতি প্রণয়নের জন্য রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু না করে, তা হলে বিপদ কাটার নয়। কৃষিক্ষেত্র যে দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার শিকার হয়েছে, তাতে ক্ষেত্রটি ক্রমেই অকুশলী হয়ে পড়েছে, যে বোঝা বহন করতে হচ্ছে কৃষকদের। এই কথাটা ভুলেও কেউ স্বীকার করেন না যে, কৃষিক্ষেত্রে জমে ওঠা অকুশলতার পাহাড়ের জন্য ভর্তুকির মূল্য গুনে দিতে হচ্ছে। যত দিন না যথাযথ নীতির মাধ্যমে এই অকুশলতা দূর করা যাচ্ছে, তত দিন অবধি জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে কৃষকের জয় নিশ্চিত হবে না।

অর্থনীতি বিভাগ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

Advertisement